
আইনের খসড়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনে ‘স্বাধীন’ ঘোষণা করলেই কি সেটি স্বাধীন হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা।
পুলিশ, র্যাব, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য যদি একজন নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেন, সে ক্ষেত্রে ওই নাগরিক জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ জানাতে পারেন। তিনি নিশ্চয়ই আশা করবেন, অভিযোগটি স্বাধীনভাবে তদন্ত হবে। সাক্ষ্য নেওয়া হবে, নথিপত্র সংগ্রহ করা হবে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন হবে, প্রমাণ যাচাই হবে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হবে।
কিন্তু ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় এই সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, অভিযোগটি যদি কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে কমিশন নিজে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে না। প্রথমে তাকে অভিযুক্ত বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছেই ঘটনার প্রতিবেদন চাইতে হবে। এখানেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার কাছেই যদি প্রথমে তদন্তের প্রতিবেদন চাইতে হয়, তাহলে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের জায়গাটি কোথায়? ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া আইনের খসড়াটি পর্যালোচনা করলে এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। খসড়াটি এখন বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ার কথা।
খসড়াটি ২০০৯ সালের আইনের তুলনায় কিছুটা ভালো বলা হলেও প্রশ্নটি থেকেই যায় যে স্বাধীন তদন্তের শুরুতেই কমিশনকে কেন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন ও পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করতে হবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯ ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, আইনের অন্য বিধানে যা-ই থাকুক না কেন, শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে এই বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ফলে সাধারণ অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনকে যে দেওয়ানি আদালতের মতো সাক্ষী তলব, দলিল চাওয়া, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে সেই ক্ষমতা শুরু থেকেই প্রয়োগ করা যাবে কি না, তা নিয়েও গুরুতর আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়।
এখানেই নতুন আইনের সঙ্গে ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমিশনকে সরাসরি স্বাধীন অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) বলেছে, ওই অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা বহাল রাখা উচিত ছিল। অর্থাৎ ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ কমিশনের হাত খুলে দিয়েছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আবার হাত বেঁধে দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এ আইনে আমাদের প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি থেকে যাবে। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার না রাখায় মানবাধিকারের মৌলিক চেতনাই অগ্রাহ্য হবে।’ টিআইবিও সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ২০০৯ সালের আইনের বিতর্কিত বিধান বহাল রেখে কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।
তাহলে কি নতুন আইনে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ছে না? বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন ক্ষমতা বাড়ছে এবং কোন জায়গায় ক্ষমতা আটকে রাখা হচ্ছে? শৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া অন্য অভিযোগের ক্ষেত্রে খসড়ার ১৩ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা আগের তুলনায় বিস্তৃত হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে কমিশন। অভিযোগ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তা আমলে নেওয়া হবে কি না, সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তা সাধারণভাবে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করবেন।
তদন্তের প্রয়োজনে সাক্ষী তলব, দলিল ও প্রমাণ চাওয়া এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা যাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা বা তদন্ত প্রতিবেদন আদালত কিংবা উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো যাবে। বিভাগীয় বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে কমিশন। অনাদায়ি ক্ষতিপূরণ আদালত বা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতার আসল পরীক্ষা সাধারণ অভিযোগের ক্ষেত্রে নয়। রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী যখন অভিযুক্ত হয়, তখন কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে সত্য অনুসন্ধান করতে পারে—সেখানেই তার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা। আর সেই জায়গাতেই নতুন আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
খসড়ায় কমিশনকে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানকে আইনে ‘স্বাধীন’ ঘোষণা করলেই কি সেটি স্বাধীন হয়ে যায়? স্বাধীনতার প্রথম পরীক্ষা হলো নিয়োগে। খসড়া অনুযায়ী একজন চেয়ারপারসন ও চারজন সার্বক্ষণিক কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠিত হবে। পাঁচজনের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী রাখতে হবে। নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেলে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ওই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
চেয়ারপারসন ও কমিশনার বাছাইয়ের জন্য ৯ সদস্যের কমিটি থাকবে। এর সভাপতি হবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। সদস্য হিসেবে থাকবেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপক এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন নাগরিক প্রতিনিধি থাকবেন। তাঁদের একজন মানবাধিকার বিষয়ে এবং অন্যজন নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হবেন।
কমিটিতে মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ তিনজন রাখা হলেও ৯ সদস্যের মধ্যে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ অন্তত পাঁচজন সরাসরি রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য ও স্বাধীন সদস্যরা একমত হলেও তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারবেন না। কোরাম হবে ৫ সদস্য নিয়ে। সিদ্ধান্ত হবে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে। ভোট সমান হলে সভাপতির নির্ণায়ক ভোট থাকবে। ফলে স্বাধীন বা বিরোধী প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতেও নিয়োগের সুপারিশ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খসড়ায় গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন ও মনোনয়ন আহ্বান, তথ্য যাচাই এবং যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে হবে। কিন্তু আবেদনকারীদের নাম, সংক্ষিপ্ত তালিকা, সাক্ষাৎকার কিংবা চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বাছাই কমিটি নিজের কার্যপদ্ধতি নিজেই নির্ধারণ করতে পারবে।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটির নেতৃত্বে প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারককে রাখার বিধান ছিল। সেখানে সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিও ছিলেন। নতুন খসড়ায় বিচারকের নেতৃত্ব বাদ দিয়ে আবার স্পিকার, দুই মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্রভাব বাড়ানো হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছেন, কমিশনের বাছাই কমিটিতে যাঁদের রাখা হয়েছে, একজন সদস্য বাদে বাকি প্রায় সবাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রপতি-সংশ্লিষ্ট। এভাবে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া যে সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও কার্যত তাদেরই হাতে ন্যস্ত থাকছে। ধারা ও বিধানগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা পায়। মৌলিক দিক থেকে ২০০৯ সালের আইনের সঙ্গে এর তেমন পার্থক্য নেই।
এই বক্তব্যের সঙ্গে নিয়োগকাঠামোর তুলনা করলে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়—কমিশন যাদের বিরুদ্ধে কাজ করবে, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রভাব যদি কমিশনের নিয়োগেই থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীনভাবে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে?
খসড়ার ৩৫ ধারার শিরোনাম ‘কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা’। শিরোনামটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ভেতরের বিধান দেখলে প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতা আসলে কতটা? সরকার প্রতি অর্থবছরে কমিশনের ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে। অনুমোদিত ও নির্ধারিত খাতের মধ্যে সেই অর্থ ব্যয়ের জন্য কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে হবে না। কিন্তু কমিশনের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী সরকার অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরাদ্দের পরিমাণ সরকারই ঠিক করবে। আবার কমিশনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকার সময়ে সময়ে যে বিধিবিধান জারি করবে, সেগুলোও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বরাদ্দ পাওয়ার পর নির্ধারিত খাতের মধ্যে ব্যয়ের স্বাধীনতা থাকলেও কমিশন কত অর্থ পাবে এবং কী কী খাতে তা ব্যয় করতে পারবে, তার নিয়ন্ত্রণ সরকারের কাছেই থাকছে।
দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের বাংলাদেশ ব্যুরোর প্রধান সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৯ সালের আইনে বিদেশি অর্থ ব্যবহারের কোনো সুযোগই ছিল না কমিশনের। সে ক্ষেত্রে এবার সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তারপরও সরকারের ওপর অর্থের জন্য নির্ভরতা থেকেই গেল।
অর্থের ওপর নির্ভরতা যে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়। কারণ, যার বিরুদ্ধে তদন্ত, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কাছ থেকেই যদি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক সক্ষমতার বড় অংশ নির্ধারিত হয়, সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে।
কমিশন অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুসারে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে। কিন্তু নির্বাহী পরিচালকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও চাকরির শর্ত প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হলেও প্রবিধান হওয়ার আগপর্যন্ত সেগুলো সরকার ঠিক করবে। কমিশনের মোট জনবলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ করা যাবে। কমিশনের নিজস্ব তদন্ত দলেও সরকারের কর্মকর্তাকে প্রেষণে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—যেসব সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে কমিশনকে তদন্ত করতে হতে পারে, সেই প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপরই যদি কমিশনের তদন্ত দলকে নির্ভর করতে হয়, তাহলে তদন্তের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব? কমিশন প্রবিধান প্রণয়ন করতে পারলেও সরকারি গেজেটে তা প্রকাশ করবে সরকার। কমিশনের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের ক্ষেত্রেও সরকারের জারি করা আর্থিক ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ আইনে স্বাধীনতার ঘোষণা আছে; কিন্তু নিয়োগে সরকারের প্রভাব, অর্থে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, জনবলে সরকারি কর্মকর্তার প্রেষণ এবং বিধি কার্যকরে সরকারের ভূমিকা—স্বাধীনতার চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতেই নির্বাহী বিভাগের উপস্থিতি থাকছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন এখন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস বা গ্যানরির ‘বি’ মর্যাদায় রয়েছে। অর্থাৎ কমিশন জাতিসংঘের স্বীকৃত প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে আংশিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কমিশনের ‘এ’ মর্যাদা না পাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের সীমাবদ্ধতা, নিয়োগে সরকারের প্রভাব এবং পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব চিহ্নিত হয়ে আসছে। তাহলে নতুন আইন যদি সেই পুরোনো সমস্যাগুলোর মূল জায়গাগুলোই বহাল রাখে, ‘এ’ মর্যাদার পথে অগ্রগতি হবে কীভাবে?
২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে তুলনা করলেও প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়। ওই অধ্যাদেশকে ঘিরে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন খসড়ায় পিছিয়ে যাচ্ছে। টিআইবিও বলেছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে যে পর্যাপ্ত এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল, সেটিই মূলত বজায় রাখা উচিত ছিল।
নতুন আইনে কমিশনের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, অন্তর্বর্তী সুরক্ষা এবং আটক রাখার স্থান পরিদর্শনের ক্ষমতা বাড়ছে। এগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠে, তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা থাকছে না। নিয়োগে ক্ষমতাসীনদের সংখ্যাগত প্রভাব, বাজেটে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, প্রেষণে সরকারি কর্মকর্তা নেওয়ার সুযোগ এবং বিধিবিধানে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা বহাল থাকছে। ফলে কমিশন কাগজে স্বাধীন হলেও কার্যক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
পার্থ শঙ্কর সাহা, সহকারী বার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো
মতামত লেখকের নিজস্ব