গত সপ্তাহে ঢাকা জেনারেল পোস্ট অফিসে (জিপিও) গেলাম। সেখানকার সেবা নিয়ে হতাশ না হয়ে পারা যায় না। আমার জন্য বিষয়টি আরও বেশি, কারণ পোস্ট অফিসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একদম ছেলেবেলার। আমার নানা ছিলেন তাঁর গ্রামের সাব পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। নানার সঙ্গে হাসপাতালের কক্ষের পোস্ট অফিসের দপ্তরে গেছি কয়েকবার। সেখান থেকে আসতে ইচ্ছা করত না আমার। তিনিই আমাকে আমার জীবনের প্রথম চিঠিটি লিখেছিলেন, পোস্টকার্ডে। জীবনের প্রথম মানি অর্ডারও পেলাম নানার কাছ থেকে! ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় মনে হয়।
ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি কলেজে। শুরু হলো আমার চিঠি লেখা। এরপর নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় অনেক চিঠি লিখেছি, ঢাবির শুরুর দিনগুলোতেও লিখেছি। এরপরে তো মোবাইল ফোন এল, ই–মেইল এল, ফেসবুক এল…। এখন মানুষ আর চিঠি লেখে না। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এসে ডাক বিভাগের অস্তিত্বই হুমকিতে ফেলে দিয়েছে।
এরপরও বছরে দু–একবার ডাক বিভাগের সেবা নেওয়া হয়। বিদেশে থাকা বোনের কাছে জামাকাপড় পাঠাতে ব্যবহার করি ডাক বিভাগের ইএমএস সেবা। সাধারণ ডাক সেবার তুলনায় ইএমএস অনেক বেশি গতিশীল এবং সাধারণত তিন থেকে সাত কার্যদিবসে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং প্রতিটি পার্সেল নিবন্ধিত থাকে। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের তুলনায় খরচ কিছুটা কম হয়, তবে সাধারণ ডাকের চেয়ে বেশি। আপনার পার্সেলটি বর্তমানে কোথায় আছে বা কোন অবস্থায় আছে, সেটা পার্সেলের ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহার করে সহজেই অনলাইনে দেখে নেওয়া যায়।
ডাক বিভাগের তেমন কোনো কার্যক্রম এখন নেই। তবে দেশের অনেক মানুষ বিদেশে তাঁদের প্রিয়জনদের জন্য উৎসবের উপহার পাঠান ইএমএস এবং পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে। বিদেশ থেকেও এই সার্ভিসের মাধ্যমে অনেক পার্সেল আসে। পবিত্র রোজার মাসে জিপিওতে গেলে আপনি বেশ ভিড় দেখতে পাবেন। এমনকি ইএমএসের পার্সেল বুকিংয়ের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতাও আছে আমার। গত সপ্তাহে গেলাম জিপিওতে। সেখানে যে সেবা পেলাম, সেটা নিয়ে আমার চারটি পর্যবেক্ষণ আছে:
১. জিপিওতে পার্সেল প্যাকিং করার জন্য কিছু বহিরাগত মানুষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জিপিওর বাইরে মেইন গেটের পশ্চিম দিকে একটা শেডের নিচে তারা আস্তানা গেড়েছে। তারা আপনার পার্সেল প্যাকিং করে দেবে, বিনিময়ে ৩০০/৪০০/৫০০ টাকা নেবে। এর বাইরে আছে জিপিওর সঙ্গে চুক্তিভুক্ত কিছু ‘লেটার রাইটার’। তারা আপনার পার্সেলের ঠিকানা লিখে তাদের প্রিন্টারে প্রিন্ট করে দেবে। আপনি নিজে লিখে নিয়ে গেলে হবে না! গত বছর তারা এই ঠিকানা লিখে দেওয়ার জন্য ১০০ টাকা নিয়েছিল, এবার অবশ্য পার্সেল প্যাকিং করার টাকা আর এটা মিলিয়ে ৪০০ টাকা নিল। এই ৪০০ টাকার জন্য আমি কিন্তু কোনো রসিদ পাইনি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যারা আমার পার্সেল চেক করল, তারা আদৌ সেটি করতে পারে কি না? লেটার রাইটার পোস্ট নিশ্চয়ই প্রাগৈতিহাসিক আমলের কোনো কনসেপ্ট। আজকের দিনে মানুষকে ‘চিঠি লিখে দেওয়ার’ জন্য কোনো চুক্তিভিত্তিক কর্মীর প্রয়োজন নেই।
২. প্যাকিং করার পরে তারা আমার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি চাইল। আমি বললাম, ‘আমার কাছে কপি নাই, কিন্তু আমার ফোনে জাতীয় পরিচয়পত্রের সফটকপি আছে। আপনারা প্রিন্ট করে নেন।’ এবার আমি অবাক হলাম। লোকটা ঝাড়া জবাব দিল, ‘আইডি কার্ড প্রিন্ট করা যাবে না।’ আমি বললাম, ‘কেন ভাই, আপনার কম্পিউটার আছে, প্রিন্টার আছে। লাগলে টাকা নেন। আর, আমি এখন প্রিন্ট কপি কোথায় পাব?’ উনি বললেন, ‘বাইরে থেকে প্রিন্ট করে আনেন।’ আমি বললাম, ‘ভাই, রোজার দিনে এত সকালে কোনো দোকান খোলেনি। আর আপনি প্রিন্ট করে দিলে অসুবিধা কী হবে, আমি তো বুঝতে পারছি না।’ এবার উনি শোনালেন এক ভয়ংকর কথা, ‘আমাদের এখান থেকে গত সপ্তাহে একটা পার্সেলে ৪,০০০ পিস ইয়াবা গেছে, এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হইছে। যেই ছেলে সেই পার্সেলে ঠিকানা প্রিন্ট করে দিয়েছিল, তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল।’
এরপরে আমি জিপিওর বাইরে ইম্পিরিয়াল হোটেলের গলিতে গিয়ে অনেক ঝামেলা করে আইডি কার্ড প্রিন্ট করে আনলাম। দোকান খোলা ছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। খুচরা ছিল না…। ভোগান্তি পোহালাম ভালোই।
পার্সেলে কোনো অননুমোদিত সামগ্রী আছে কি না, সেটা কঠোরভাবে পরীক্ষা করার কথা জিপিও কর্তৃপক্ষের। সেই দায়িত্বে তারা অবহেলা করেছে। গছিয়ে দিয়েছে কিছু অননুমোদিত মানুষের হাতে।
এই যে, জিপিওর পাঠানো পার্সেলে মাদক গেল আমাদের দেশ থেকে, এটা আমাদের দেশের সুনামের কতখানি হানি করেছে?
সর্বনাশ! ঈদের উপহারের জামাকাপড় ঈদের পরে পৌঁছালে কী লাভ? আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘পার্সেল বুকিং ক্যানসেল করা যাবে না?’ উনি ততোধিক নির্লিপ্তভাবে বললেন, ‘না।’ ‘যুদ্ধের কারণে সব ফ্লাইট বন্ধ, এখন পার্সেল পাঠালে সেটা কবে পৌঁছাবে; নিশ্চিত না’—এই মর্মে একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া কি খুব কঠিন কাজ ছিল?
৩. প্যাকিং শেষে আমার পার্সেল নিয়ে সেই প্যাকিং করা লোক গেল কাউন্টারে। আমার মোট চার্জ হয়েছিল ৪,৯৩৬ টাকা। আমি ৫,০০০ টাকা দিলাম। কাউন্টারের সরকারি বেতনভোগী ভদ্রলোক আমাকে ভাংতি টাকা দেওয়ার কোনো গরজ দেখালেন না।
৬৪ টাকা বেশি পরিমাণের টাকা না। কিন্তু এটা আমার ন্যায্য পাওনা। এই টাকা আমার অনুমতি ব্যতিরেকে রেখে দেওয়ার অধিকার একজন সরকারি কর্মকর্তা রাখেন না।
অতীতেও জিপিওর কাউন্টারে গিয়ে দেখেছি, এ রকম খুচরা টাকা ফেরত না দেওয়ার বদভ্যাস আছে জিপিওর লোকেদের। আমি তো খুচরা টাকা ফেরত চাইনি, কেউ যখন চেয়েছেন, তখন তাঁরা সব টাকা ফেরত দিয়ে বলেন, ‘খুচরা দেন।’ ৯৩৬ টাকা খুচরা দেওয়ার চেয়ে ৬৪ টাকার দাবি ছেড়ে দেওয়া সহজ।
শুধু ক্যাশ টাকা ছাড়া অন্য কোনোভাবে পেমেন্ট দেওয়া যায় না জিপিওর কাউন্টারে। আজকের ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে কার্ড, পজ মেশিন, এমএফএস ইত্যাদি নানা রকম অ্যাভেইলেবল পেমেন্ট মেথডের অন্তর্ভুক্তি সময়ের দাবি।
৪. সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হলাম বুকিং শেষ হওয়ার পর। কাউন্টারের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঈদের আগে পার্সেল পৌঁছাবে না?’ উনি নির্বিকারে বললেন, ‘যুদ্ধের কারণে সব ফ্লাইট বন্ধ। ফ্লাইট চালু হলে বলা যাবে।’ সর্বনাশ! ঈদের উপহারের জামাকাপড় ঈদের পরে পৌঁছালে কী লাভ? আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘পার্সেল বুকিং ক্যানসেল করা যাবে না?’ উনি ততোধিক নির্লিপ্তভাবে বললেন, ‘না।’
‘যুদ্ধের কারণে সব ফ্লাইট বন্ধ, এখন পার্সেল পাঠালে সেটা কবে পৌঁছাবে; নিশ্চিত না’—এই মর্মে একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া কি খুব কঠিন কাজ ছিল?
জনগণের সেবা প্রদান করতে বসে এতটুকু দায়িত্ববোধ দেখাবেন সরকারি চাকুরেরা—এইটুকু আশা করতে পারি না আমরা?
এরপর, আমি যখন ফেসবুকে আমার ভোগান্তির কথা শেয়ার করলাম, সেখানে দেখলাম অনেকেই কমেন্ট করেছেন—আমার চেয়ে অনেক বেশি ভোগান্তির অভিজ্ঞতাও অনেকের হয়েছে।
অনেকে পার্সেল পাঠাতে গিয়ে তো ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, বিদেশ থেকে পার্সেল আসার পর নাকি ভোগান্তি অনেক বেশি। অযৌক্তিক শুল্ক আরোপ, ডেলিভারি পেতে দেরি, অর্থ দাবি, কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার ইত্যাদি অনেক অভিযোগ।
আমাদের ডাক বিভাগ এমনিতেই মৃতপ্রায়। চিঠি চালাচালি প্রায় বন্ধ। একরকম মুফতেই বেতন-ভাতা নেন ডাক বিভাগের অনেক লোকজন। যে কয়েকটি সেবা চালু আছে, এগুলোতে একটু ভালো সেবা দিয়ে জনমনে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ ছিল ডাক বিভাগের লোকজনের। সে ব্যাপারে তাঁরা উদাসীন বলেই বোধ হচ্ছে। এইআই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার কত অগ্রগতি হচ্ছে, আর আমাদের ডাক বিভাগ পড়ে আছে, এখনো প্রাগৌতিহাসিক যুগে!
পাশাপাশি, পার্সেল প্যাকিং ও চেকিংয়ের ব্যাপারে অননুমোদিত বহিরাগত লোকজনের ওপর নির্ভর করে ডাক বিভাগের লোকজন দেশের সুনামকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছেন।
আমার শৈশব-কৈশোরের ভালোবাসা ডাক বিভাগ মানুষের মনে ভালো জায়গা পাক—এ আমার একান্ত কামনা। সেই শুভাশীষ থেকেই এই লেখা। এই যৌক্তিক সমালোচনা যদি ডাক বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের কর্ণকুহরে পৌঁছে, তাঁরা এগুলো থেকে পরিত্রাণের জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেবেন—এই আশাবাদ রাখছি।
চন্দন আজিজ ব্যাংক কর্মকর্তা। ব্যাংক খাত নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
মতামত লেখকের নিজস্ব