বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম

অভিমত–বিশ্লেষণ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: পুরোনো সমস্যা নিয়ে নতুন দরজা কীভাবে খুলবে

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর সে দেশের শ্রমবাজার নিয়ে লিখেছেন সেলিম রেজা

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকালে তাঁর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শ্রম অভিবাসন প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আলোচনায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে এসেছে। উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কম ব্যয়বহুল, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে এবং শ্রমিকেরা প্রকৃত সুবিধা পান।

একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে শোষণ, অস্বচ্ছতা ও মানবিক উদ্বেগের বিষয়গুলো বাস্তব এবং এগুলো মোকাবিলায় দুই দেশকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হলো বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজন এবং একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত। তবে এ অগ্রগতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো বাস্তবে শ্রমিকবান্ধব সংস্কারে রূপ নেয় কি না, তার ওপর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নতুন শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হব, নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই শ্রম অভিবাসনকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করব? কারণ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল সাফল্যের নয়; এটি অনিয়ম, শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্রভাবের ইতিহাসও।

অতিরঞ্জিত প্রত্যাশার আড়ালে অস্বস্তিকর বাস্তবতা

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের আগে দেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ (কিছু সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টাল) ধারণা তৈরি করেছিল যে এ সফরের মূল অর্জন হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত আবার উন্মুক্ত হওয়া। একাধিক প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

একই সময়ে কিছু দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যও সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যেখানে ইঙ্গিত ছিল যে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। ফলে শ্রমিক, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মহলে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে সফরের প্রধান ফল ছিল তাৎক্ষণিক বাজার উন্মুক্তকরণ নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও টেকসই করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য।

এখানেই গণমাধ্যম ও সরকারি যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রে বাজার খোলার সম্ভাবনা থাকলেও শ্রম অভিবাসনের কাঠামোগত সমস্যা, অর্থাৎ সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা ও উচ্চ ব্যয় প্রায় অনুপস্থিত ছিল। খুব কমই আলোচিত হয়েছে অতীতে কেন মালয়েশিয়া বারবার নিয়োগ স্থগিত করেছে বা কেন বহু শ্রমিক উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত কাজ ও সুরক্ষা পাননি। জনপরিসরে প্রশ্ন ছিল ‘বাজার খুলছে কি না’, অথচ গুরুত্বপূর্ণ ছিল—কী ধরনের বাজার, কোন শর্তে, কত ব্যয়ে এবং কতটা স্বচ্ছতায় তা খুলছে। এসব প্রশ্ন উপেক্ষা করে কেবল বাজার উন্মুক্তকরণকে সাফল্য হিসেবে দেখানো নীতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসনের ইতিহাস এক সফরে সমাধানযোগ্য নয়। গত এক দশকে এই বাজার বারবার বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে, আবার সীমিত এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট অভিযোগও উঠেছে। অনেক শ্রমিক কয়েক লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি, কম মজুরিতে কাজ করেছেন, অনিয়মিত হয়েছেন বা অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।

দুঃখজনকভাবে গণমাধ্যমের একটি অংশ বাস্তবতাকে আড়াল করে শিরোনামনির্ভর উচ্ছ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছে। একইভাবে কিছু সরকারি বক্তব্যও প্রত্যাশাকে বাস্তবতার চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ দায়িত্বশীল যোগাযোগের কাজ হলো সম্ভাবনার পাশাপাশি শর্ত ও ঝুঁকি স্পষ্ট করা। শ্রমবাজার খোলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যদি সংস্কার ও শ্রমিক সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা ‘প্রত্যাশার রাজনীতি’কেই শক্তিশালী করে।

এ কারণেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যখন শ্রমিক শোষণ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা কেবল কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং কাঠামোগত সমস্যার স্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বাজার খোলা নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও শ্রমিককেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—কী ধরনের শ্রমবাজার খোলা হচ্ছে এবং সেখানে শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে।

দালাল চক্রের লাভের হিসাব: শ্রমিকের ভাগ কোথায়

মালয়েশিয়ার শ্রম অভিবাসনে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো—এ ব্যবস্থার প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, শ্রমিক নাকি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী?

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’–বিতর্ক স্পষ্ট করেছে যে শ্রম অভিবাসন কেবল শ্রমবাজার নয়; বরং একটি উচ্চ মূল্যের নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা। নিয়োগ সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে প্রতিযোগিতা কমে, ব্যয় বেড়ে যায় এবং স্বচ্ছতার জায়গা সংকুচিত হয়। তখন বাজার পরিচালিত হয় নীতি বা স্বচ্ছতার বদলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, যেখানে শ্রমিকের স্বার্থ নয়, বাণিজ্যিক লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে।

এর ফলে শ্রমিক ক্রমে পণ্যসদৃশ হয়ে পড়েন, বিদেশে যেতে একজন শ্রমিককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়, অনেক সময় ঋণ নিতে হয়। সেই ঋণের চাপেই তাঁর প্রথম কয়েক বছর কেটে যায় কেবল ঋণ পরিশোধে; সঞ্চয় বা উন্নয়নের সুযোগ কমে যায় এবং অভিবাসনের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফলও হ্রাস পায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন এমওইউ বা সমঝোতা স্মারকের মূল পরীক্ষা হবে নিয়োগব্যবস্থাকে কতটা উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ডিজিটাল করা যায়, তার ওপর। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শ্রমবাজার খুললেও পুরোনো কাঠামোই ফিরে আসবে—সুফল শ্রমিকের কাছে না গিয়ে আবারও সীমিত কিছু মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হবে আর শোষণের চক্র অপরিবর্তিত থাকবে।

শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, শ্রমিক সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

বাংলাদেশে অভিবাসননীতির আলোচনায় শ্রমিকদের প্রায়ই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলা হয়। কিন্তু তাঁদের অধিকারের প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ আধুনিক শ্রম অভিবাসনের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘রাইটস-বেজড মাইগ্রেশন’, অর্থাৎ অধিকারভিত্তিক অভিবাসন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায়—কতজন শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, এসব সূচককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।

যেকোনো নতুন শ্রমচুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত শ্রমিকের অধিকার। চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট জব্দ নিষিদ্ধকরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা জোরদার করা জরুরি।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য রোধ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা বাস্তব সহায়তা পান।

অনিয়মিত শ্রমিক: সমস্যা নয়, নীতিগত ব্যর্থতার লক্ষণ

বৈঠকে অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টিকে শুধু মানবিক ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে বিদ্যমান শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। যখন একজন শ্রমিক বৈধ পথে বিদেশে গিয়ে পরবর্তী সময়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, তখন এর পেছনে প্রায়ই নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি, তথ্যের ঘাটতি, চুক্তি লঙ্ঘন বা কর্মসংস্থানের সংকট কাজ করে। ফলে অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ প্রয়োজনীয় হলেও এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।

মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থানে চলে গেছেন। কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে গেছেন, কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন।

এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাই বৈধকরণ কর্মসূচি শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিসংগত। বৈধ মর্যাদা পেলে শ্রমিকেরা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হতে পারবেন, কর দিতে পারবেন এবং শোষণের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও নিয়মিত রেমিট্যান্সপ্রবাহের সুবিধা পাবে। তবে বৈধকরণকে এককালীন সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না।

ভবিষ্যতে নতুন অনিয়মিত শ্রমিক তৈরি হওয়া ঠেকাতে নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি দূর করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকৃত সমাধান হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে শ্রমিকের কর্মপরিস্থিতি, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং নিয়োগকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। অন্যথায় বৈধকরণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর আবারও একই সমস্যা তৈরি হবে।

দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নেই

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ খাতে নিয়োজিত। এর ফলে তাঁদের আয় সীমিত থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অবস্থানও দুর্বল হয়। অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, নির্মাণ, সেবা ও আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদন ও বিশেষায়িত সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তি খুঁজছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে শ্রম অভিবাসনের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শুধু বেশি শ্রমিক পাঠানো নয়; বরং বেশি দক্ষ শ্রমিক পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সুতরাং নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগকে শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বাংলাদেশকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কর্মী শুধু বেশি আয় করেন না; তিনি কম ঝুঁকিতে থাকেন এবং দেশের জন্যও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হন। তাই দক্ষতা উন্নয়নকে অভিবাসননীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।

নতুন এমওইউ: কাগজের চুক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন এমওইউর আলোচনা ইতিবাচক হলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে চুক্তি থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, নিয়োগ ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থা এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, শ্রম অধিকার সংগঠন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

এমওইউকে কেবল প্রশাসনিক দলিল নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এর সাফল্য শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যায় নয়; বরং শ্রমিকের নিরাপত্তা, ব্যয় হ্রাস ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সক্ষমতায় নির্ধারিত হবে।

সবশেষে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যাভিত্তিক সাফল্যের ধারণা থেকে সরে শ্রমিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের আলোচনায় স্বচ্ছতা, বৈধকরণ ও শ্রমিক সুরক্ষার বিষয় উঠে আসা ইতিবাচক সংকেত হলেও এগুলো বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নিলে অগ্রগতি টেকসই হবে না।

নতুন এমওইউ যদি নিয়োগব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করে, দালালতন্ত্র কমায়, শ্রমিকের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, তবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে; অন্যথায় অতীতের ব্যর্থতাই নতুন রূপে ফিরে আসবে।

  • ড. সেলিম রেজা: সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

    মতামত লেখকের নিজস্ব