মানসিক স্বাস্থ্য
মানসিক স্বাস্থ্য

মতামত

বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন ও কীভাবে

শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও পরিপূর্ণ মানবজীবনের মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো উপেক্ষিত একটি বিষয়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এর ব্যতিক্রম নন। এই উপেক্ষার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রতিদিনের জীবনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে আমরা সাধারণত পাঠ্যসূচি, পরীক্ষা কিংবা গবেষণার অগ্রগতি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করতে করতে আমি বুঝেছি—শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় লড়াইটা অনেক সময় সিলেবাসের বাইরে ঘটে। ক্লাস শেষে কেউ যখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন করে, কিংবা পরীক্ষার খাতা জমা দেওয়ার সময় চোখ এড়িয়ে যায়—তখন বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু পড়াশোনার নয়, ভেতরের কোনো অদৃশ্য চাপের।

আমি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি। একই সঙ্গে শিক্ষকতা ও গবেষণার কাজে জাপানে দীর্ঘ সময় কাজ ও বসবাসের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এই দুই বাস্তবতা আমাকে একটি বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে—বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আমরা এখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিচ্ছি না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি আমাদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়েও ঘটে যাওয়া কিছু মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামনে নির্মমভাবে সেই অবহেলাকে তুলে ধরেছে। এসব ঘটনা শুধু সংবাদ শিরোনাম নয়; এগুলো আমাদের নীরবতা, দেরি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতি এক গভীর মানবিক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নীরবে মানসিক চাপ বহন করে। একাডেমিক চাপ, ফলাফল নিয়ে উৎকণ্ঠা, পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা, আর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভেতরে-ভেতরে ভেঙে পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভাঙনের লক্ষণ অনেক সময় প্রকাশ পায় না। বরং যাদের বাইরে থেকে শান্ত ও স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি একাকিত্বে ভোগে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্যে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে মোট শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কমে এলেও প্রায় ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ক্ষেত্রে মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেশি। ২০২৩ ও ২০২৪—উভয় বছরেই দেখা গেছে, মোট আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এই প্রবণতা দৃশ্যমান। সামাজিক চাপ, সম্পর্কজনিত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক সহায়তার অভাব—সব মিলিয়ে নারী শিক্ষার্থীরা বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জরুরি মানবিক প্রয়োজন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

এই বাস্তবতার সঙ্গে জাপানের অভিজ্ঞতার একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। জাপানে কাজ করার সময় দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আলাদা কাউন্সেলিং সেন্টার রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিনা সংকোচে মানসিক চাপ, হতাশা বা একাকিত্বের কথা বলতে পারে। সেখানে কাউন্সেলিং নেওয়াকে দুর্বলতা নয়, বরং আত্মযত্নের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জাপানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কীভাবে শিক্ষার্থীদের আচরণে মানসিক চাপের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা যায়, কীভাবে সহানুভূতিশীলভাবে কথা বলতে হয়, এবং কখন পেশাদার সহায়তার দিকে পাঠানো প্রয়োজন—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত জানে, সংকটে তারা একা নয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার তুলনা করলে বোঝা যায়, আমাদের এখানে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অনেকাংশে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই থেকে গেছে। শিক্ষক হিসেবে আমরা অনেক সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই। কিন্তু ব্যক্তিগত সহানুভূতি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া তা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হয় না। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দায়িত্ব শুধু পাঠদান বা ফলাফল মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে বোঝা, তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল হওয়াও শিক্ষকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেক ক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রশ্ন—‘তুমি কেমন আছ?’—একজন শিক্ষার্থীর জন্য বড় স্বস্তির কারণ হতে পারে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এখনই বাস্তবসম্মত ও কাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একজন পূর্ণকালীন চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী থাকা আবশ্যক। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্পেইন বা মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এতে মানসিক সমস্যাকে কুসংস্কার থেকে বের করে চিকিৎসা ও পেশাদার সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা সহায়তা নিতে আরও আগ্রহী হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য একটি কার্যকর মেন্টরিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও মানসিক অগ্রগতি দেখভালের দায়িত্ব যদি শিক্ষকদের দেওয়া হয়, তাহলে সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোকে শুধু থাকার জায়গা হিসেবে নয়, বরং মানসিকভাবে নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য হলের হাউস টিউটর বা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে আরও সক্রিয় ও সংখ্যায় বাড়ানো জরুরি।

চতুর্থত, শিক্ষকদের নিজেদেরও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হতে হবে। ক্লাসে পাঠদানের পাশাপাশি যদি শিক্ষকেরা মানসিক স্বাস্থ্য, চাপ মোকাবিলা ও সাহায্য নেওয়ার গুরুত্ব নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। ক্লাসরুমই হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা।

পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে অভিভাবকত্বের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও সন্তানের মানসিক অবস্থার প্রতি অসচেতনতা অনেক সময় তাদের সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং অভিভাবকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সহানুভূতিশীল অভিভাবকত্ব বিষয়ক দিকনির্দেশনা প্রদান জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জরুরি মানবিক প্রয়োজন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি তাদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কখনোই পূর্ণতা পাবে না। আমি আশাবাদী যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সরকার সম্মিলিতভাবে এই বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

  • ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির অধ্যাপক ও গবেষক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd