
তেহরানের আকাশে এখন যুদ্ধবিমানের গর্জন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের আনাচকানাচে কিছুক্ষণ পরপর শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি। কয়েক লাখ মানুষের ওপর ভর করে আছে এক অজানা আশঙ্কার ছায়া। মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের ডামাডোল বেজে উঠেছে, তা এখন আর শুধু রণক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; একটি সামরিক সংঘাত দ্রুতই একটি বিশাল ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। এর রেশ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।
যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ব্লুমবার্গের এক জরিপে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীলতার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির নতুন এক জোয়ার আসতে পারে। কৃষিবাজারেও এই চাপের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান এই সংকটের ফলে সারের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দামও বেড়ে যেতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় যে এই যুদ্ধ কেবল ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার লড়াই নয়; এটি এমন এক অর্থনৈতিক সংঘাত, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য, জ্বালানির বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী এক দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।
একই সঙ্গে এই যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বের সামরিক সমীকরণও বদলে দিচ্ছে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র কোরীয় উপদ্বীপ থেকে তাদের অত্যাধুনিক ‘সাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করেছে। ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নিরাপত্তা ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্য এখন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এটি তারই ইঙ্গিত।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিকাঠামোয় এই যুদ্ধের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে? দশকের পর দশক ধরে অনেক আরব দেশ এই বিশ্বাসের ওপর তাদের নিরাপত্তার কৌশল গড়ে তুলেছিল যে সংকটকালে আমেরিকাই হবে তাদের চূড়ান্ত ভরসা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এ ধারণার মূলে আঘাত করছে। জানা গেছে, বেশ কিছু আরব দেশ পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করেছে, যাতে তাদের রক্ষণাত্মক ব্যবস্থাগুলো কেবল ইসরায়েল নয়, বরং ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকেও সুরক্ষা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। এ অনুরোধ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বর্তমানের এই নিরাপত্তাকাঠামো আরব দেশগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়।
ইরান এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তি কোন পথে হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট নকশাও এখনো মেলেনি। তাই এ যুদ্ধ কেবল সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং তা মৈত্রী সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং দশকের পর দশক টিকে থাকা নিরাপত্তাকাঠামোর প্রতিও বড় চ্যালেঞ্জ।
এ যুদ্ধ অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ইরানের ড্রোন এবং স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যখন বহুগুণ বেশি দামের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হয়, তখন যুদ্ধের আর্থিক সমীকরণ বদলে যায়। এটি মার্কিন অর্থনীতির জন্য বিশাল কোনো বিপর্যয় না হলেও আধুনিক যুদ্ধের একটি বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তোলে। আর তা হলো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেকোনো শক্তিশালী দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত চাপের একটি বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এই যুদ্ধের বার্তা বেশ স্পষ্ট। ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা লাতিন আমেরিকার অস্থিরতা যেমন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, এ সংঘাত তাকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেক দেশই এখন বুঝতে পারছে যে শুধু একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা হয়তো দীর্ঘ মেয়াদে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। ফলে তারা এখন কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকার বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ওয়াশিংটন দীর্ঘকাল ধরে সামরিক ক্ষমতা ও মৈত্রীর মাধ্যমে তাদের প্রভাব ধরে রেখেছে। এর বিপরীতে চীন বেছে নিয়েছে অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরির পথ। চীনের জন্য এই সংকট বেশ বড় ধরনের দোলাচলের বিষয়। চীন তার জ্বালানির বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ফলে পারস্য উপসাগরের অস্থিতিশীলতা সরাসরি তাদের উৎপাদন খাতকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণেই চীনের পক্ষ থেকে বারবার ধৈর্য ধরার এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলা হচ্ছে।
দীর্ঘ মেয়াদে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমিয়ে দিতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলো হয়তো তখন তাদের নিরাপত্তার জন্য একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলবে। এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পতন না হলেও একটি বহুমেরুর বিশ্ব গড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
ইরান এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তি কোন পথে হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট নকশাও এখনো মেলেনি। তাই এ যুদ্ধ কেবল সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং তা মৈত্রী সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং দশকের পর দশক টিকে থাকা নিরাপত্তাকাঠামোর প্রতিও বড় চ্যালেঞ্জ।
শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধে কে জয়ী হবে, তা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, এ সংকট আমাদের বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মুখে নিয়ে যাচ্ছে, যা একটি অনিশ্চিত ও বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত দেয়।
● পেইমান সালেহি ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত