বাংলাদেশের সকাল খুব সুন্দর। রোদ ওঠে ধীরে ধীরে, যেন নদীর জলে সোনালি রং মিশে যায়। পাখিরা ডাকে, বাতাসে ভেসে আসে কচি পাতার গন্ধ। কিন্তু এই সুন্দর সকালের মাঝেও কোথাও এক অদৃশ্য অন্ধকার লুকিয়ে থাকে—যেন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কোনো পুরোনো ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধুলা। সেই অন্ধকারের নাম দুর্নীতি।
দুর্নীতি কোনো এক দিনে জন্ম নেয় না। এটি জন্মায় মানুষের লোভে, ভয়ভীতিতে, ক্ষমতার মোহে আর সমাজের দীর্ঘদিনের অভ্যাসে। বাংলাদেশের সরকারি অফিস-আদালত যেন সেই অন্ধকারের পুরোনো মঞ্চ, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন নাটক মঞ্চস্থ হয়, কিন্তু গল্পের শেষ কখনো বদলায় না।
সকালে অফিস খুলতেই দরজার সামনে লাইন পড়ে যায়। কেউ এসেছে জন্মনিবন্ধন করতে, কেউ জমির কাগজ ঠিক করতে, কেউ আবার এসেছে মামলার নথি জমা দিতে। তাদের চোখে থাকে আশা, আজ হয়তো কাজটা হয়ে যাবে। কিন্তু অফিসের ভেতরে ঢুকতেই তারা বুঝতে পারে, কাজের গতি রোদ ওঠার মতো নয়—বরং কুয়াশার মতো ধীর, অস্পষ্ট, অনিশ্চিত।
একজন কর্মকর্তা ফাইল উল্টেপাল্টে দেখেন, তারপর বলেন, ‘আচ্ছা, পরে আসেন।’ এই ‘পরে’ শব্দটি যেন এক অদৃশ্য দেয়াল, যার ওপারে কাজের গতি থেমে থাকে। আর সেই দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে আরেকজন, যাকে সবাই চেনে ‘দালাল’ নামে। সে হাসিমুখে বলে, ‘ভাই, আমার মাধ্যমে দিলে কাজটা আজকেই হয়ে যাবে।’ এই হাসি যেন বিষাক্ত ফুলের গন্ধ, দেখতে সুন্দর কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্ধকার।
আদালত ভবনের করিডরে সময় থেমে থাকে। দীর্ঘশ্বাসের মতো ধীরে ধীরে হাঁটে মানুষ। একটি মামলার ফাইল যেন মানুষের জীবনের চেয়ে বেশি বয়সী হয়ে ওঠে। বিচারক আসেন, কোর্ট বসে, আইনজীবীরা যুক্তি দেন—কিন্তু মামলার গতি যেন নদীর স্রোত নয়, বরং শুকনো খালের মতো।
কখনো একটি তারিখ আসে, আবার আরেকটি তারিখ চলে যায়। তারিখের এই দীর্ঘ সারি মানুষের জীবনে তৈরি করে অনিশ্চয়তার দেয়াল। আর সেই দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে দুর্নীতির ছায়া, যা কখনো ফাইল এগিয়ে দিতে টাকা চায়, কখনো সাক্ষীকে বদলে দেয়, কখনো নথি হারিয়ে যায় অদৃশ্যভাবে। বিচারের পাল্লা কখনো ভারী হয় ক্ষমতাবানদের দিকে, আর সাধারণ মানুষের দিকে থাকে শুধু অপেক্ষা।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরে অফিসে গিয়ে একই অভিজ্ঞতা পায়—ফাইল আটকে থাকে, কাজ এগোয় না, দালাল ঘুরে বেড়ায়, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। স্পিকারের বক্তব্য যেন সেই জনতার দীর্ঘশ্বাসকে ভাষা দিয়েছে। এমন বক্তব্য কখনো সাহসের পরিচয় হতে পারে, আবার কখনো রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে। কোনটি সত্য, তা সময়ই বলে দেবে।
দুর্নীতি কোনো ব্যক্তি নয়, কোনো দল নয়, কোনো ভবন নয়। এটি একধরনের অভ্যাস, যা সমাজের রক্তে মিশে গেছে। একটি ফাইলের গতি নির্ভর করে কত টাকা দেওয়া হলো, একটি সেবার মান নির্ভর করে কত পরিচয় দেখানো হলো, একটি মামলার গতি নির্ভর করে কে কতটা প্রভাবশালী। দুর্নীতি যেন সেই অদৃশ্য জাল, যা অফিসের টেবিল, আদালতের বেঞ্চ, ফাইলের পাতায়, মানুষের কথায়, এমনকি নীরবতার মধ্যেও ছড়িয়ে থাকে।
সব অফিস দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। সব কর্মকর্তা খারাপ নন। সব বিচারক অন্যায় করেন না। বাংলাদেশে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা নিজের দায়িত্বকে ভালোবাসেন, যাঁরা মানুষের কষ্ট বুঝতে পারেন, যাঁরা নিজের সততাকে রক্ষা করতে জানেন। একজন সৎ কর্মকর্তা যখন ফাইল এগিয়ে দেন বিনা ঘুষে, একজন বিচারক যখন ন্যায়বিচার দেন নির্ভয়ে, একজন কর্মচারী যখন মানুষের কথা শোনেন মন দিয়ে, তখন মনে হয়, অন্ধকারের মাঝেও আলো আছে। এই আলোই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
দুর্নীতি কেন থাকে—এটি একটি গভীর প্রশ্ন। এর জন্ম দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতায়, অদক্ষ ব্যবস্থাপনায়, রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায়, সামাজিক বৈষম্যে, আইনের দুর্বল প্রয়োগে আর মানুষের অসহায়তায়। যখন একটি কাজ করতে মানুষকে দশটি ধাপ পার হতে হয়, যখন একটি মামলার রায় পেতে বছর কেটে যায়, যখন একটি সেবার জন্য মানুষকে বারবার অফিসে যেতে হয়—তখন দুর্নীতি সুযোগ পায়। দুর্নীতি যেন সেই আগাছা, যা জন্মায় যেখানে মাটি অনুর্বর, যেখানে নিয়ম দুর্বল, যেখানে মানুষ ক্লান্ত।
পরিবর্তন এক দিনে আসে না। কিন্তু পরিবর্তন আসে যখন প্রশাসন স্বচ্ছ হয়, প্রযুক্তির ব্যবহার হয়, সেবা প্রদান সহজ হয়, আইনের প্রয়োগ কঠোর হয়, মানুষ সচেতন হয় আর নৈতিকতা মূল্য পায়। যখন অফিসে ডিজিটাল সেবা বাড়ে, যখন আদালতে মামলার তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়, যখন ঘুষ নেওয়ার সুযোগ কমে যায়, তখন দুর্নীতির অন্ধকার একটু একটু করে কমে।
পরিবর্তন আসে মানুষের ভেতর থেকেও—যখন একজন মানুষ ঘুষ দিতে অস্বীকার করেন, যখন একজন কর্মকর্তা ঘুষ নিতে অস্বীকার করেন, যখন সমাজ অন্যায়কে সহ্য করে না। বাংলাদেশের অফিস-আদালতে দুর্নীতি আছে, এটি সত্য। কিন্তু এই সত্যের মাঝেও আরেকটি সত্য আছে—বাংলাদেশের মানুষ এখনো আশা হারায়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু বাক্য উচ্চারিত হয়, যা শুধু শব্দ নয়—একটি যুগের ক্লান্তি, ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সম্প্রতি এমনই একটি বাক্য ছুড়ে দিয়েছেন জনসমক্ষে, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের অধিকাংশই চোর।’ এই বাক্যটি যেন কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়; বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষতকে একঝটকায় উন্মুক্ত করে দেওয়া। এটি এমন একটি বাক্য, যা শুনলে মনে হয়—একটি দেশের প্রশাসনিক ভবনের দেয়ালগুলো হঠাৎ কেঁপে উঠেছে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য একমাত্রিক নয়। এটি যেন পেঁয়াজের মতো, একটি স্তর খুললে আরেকটি স্তর দেখা যায়।
যখন রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তি এমন কথা বলেন, তখন তা শুধু অভিযোগ নয়—একটি স্বীকারোক্তি। এটি বলে দেয় যে প্রশাসনের ভেতরে নৈতিকতার যে অবক্ষয় বহুদিন ধরে মানুষ অনুভব করছিল, তা এখন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকেও স্বীকৃতি পাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরে অফিসে গিয়ে একই অভিজ্ঞতা পায়—ফাইল আটকে থাকে, কাজ এগোয় না, দালাল ঘুরে বেড়ায়, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন। স্পিকারের বক্তব্য যেন সেই জনতার দীর্ঘশ্বাসকে ভাষা দিয়েছে। এমন বক্তব্য কখনো সাহসের পরিচয় হতে পারে, আবার কখনো রাজনৈতিক কৌশলও হতে পারে। কোনটি সত্য, তা সময়ই বলে দেবে।
একজন স্পিকারের মুখে এমন অভিযোগ প্রশাসনের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়। এটি যেন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘোষণা। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া নানা দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে, যেন পুকুরে পাথর ছুড়ে দিলে চারদিকে ঢেউ ওঠে।
সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এই বক্তব্যে আহত হতে পারেন। কারণ, ‘অধিকাংশই চোর’, এটি একটি সামগ্রিক অভিযোগ, যা সৎ কর্মকর্তাদেরও একই ছায়ায় ফেলে দেয়। অফিসের করিডরে হয়তো ফিসফাস শুরু হবে, ‘আমাদেরই দোষ দেওয়া হচ্ছে সবকিছুর!’
বিরোধী দল এই বক্তব্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বলবে, ‘আগে তো এরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল, আবারও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।’ সরকারপক্ষ হয়তো ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হবে, ‘এটি সাধারণীকরণ নয়, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।’ জনতা হয়তো ভাববে, অবশেষে কেউ সত্য কথা বলল। আবার কেউ কেউ ভাববে—যদি স্পিকারই এমন বলেন, তাহলে দেশের অবস্থা কতটা ভয়াবহ!
দুর্নীতি যেন রাতের অন্ধকার, যা খুব গভীর হলেও, ভোরের আলোকে ঠেকাতে পারে না। বাংলাদেশ সেই ভোরের অপেক্ষায় আছে, যেখানে অফিসে কাজ হবে সহজে, আদালতে বিচার হবে দ্রুত, মানুষের সম্মান থাকবে অটুট, আর দুর্নীতি হবে ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যা আমরা স্মরণ করব, কিন্তু আর কখনো ফিরে যেতে চাইব না। সেদিন কত দূরে?
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব