
বর্তমানে দেড় কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বা বসবাস করছেন। এ ছাড়া প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন ও অন্যান্য প্রয়োজনে বিদেশভ্রমণ করছেন। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, নাগরিক সেবা এবং বিশেষ করে পুলিশি কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।
বিদেশে গিয়ে মানুষ দেখছেন কীভাবে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে, কীভাবে নাগরিকের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত পরিচালিত হয় এবং কীভাবে জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা হয়।
দেশে ফিরে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের পুলিশি ব্যবস্থার সঙ্গে সেই অভিজ্ঞতার তুলনা করেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই অনালোচিত থেকে যায়—উন্নত দেশগুলোর মতো সেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের হাতে কি সেই পরিমাণ জনবল, প্রযুক্তি ও লজিস্টিক সক্ষমতা রয়েছে?
বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। তবে সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো অপরাধের শিকার হন, তখন তিনি প্রথমেই পুলিশকে স্মরণ করেন। তিনি চান, পুলিশ দ্রুত তাঁর পাশে দাঁড়াবে, অভিযোগ গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একজন নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রত্যাশা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমিত সম্পদ নিয়ে পুলিশকে প্রায়ই অসীম প্রত্যাশার ভার বহন করতে হয়।
দেশের অধিকাংশ থানার আওতাধীন এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করেন। একটি থানার অধীনে একাধিক ইউনিয়ন, পৌরসভা কিংবা বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চল থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র দুই বা তিনটি কার্যকর যানবাহন এবং সীমিতসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে একই সময়ে একাধিক স্থানে সহায়তার প্রয়োজন হলে দ্রুত সাড়া দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আমরা প্রায়ই শুনি, কোনো ঘটনায় পুলিশ সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই আমরা জানতে চাই, সেই মুহূর্তে থানার কতটি টহল টিম অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছিল, কতজন সদস্য আদালত, প্রটোকল বা নিরাপত্তা ডিউটিতে নিয়োজিত ছিলেন, কিংবা সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছাতে কত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ পুলিশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বহুমাত্রিক দায়িত্ব। বিশ্বের অনেক দেশে পুলিশ মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং তদন্ত কার্যক্রমে মনোনিবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশকে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ তদন্ত, আদালত সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম, ভিআইপি নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, নির্বাচন, জনসমাবেশ, বিশেষ অভিযান এবং বিভিন্ন প্রটোকল ডিউটি পালন করতে হয়। ফলে জনসেবামূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত হওয়ার জন্য কার্যকর জনবল আরও কমে যায়।
বিশেষ করে প্রটোকল ও নিরাপত্তা ডিউটির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়োজিত থাকেন। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ফলে থানাভিত্তিক সেবা প্রদানের সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আনুপাতিক হারে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
পুলিশ সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই জবাবদিহি, পেশাদারি এবং আচরণগত পরিবর্তনের কথা বলি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আশা করা যায় না।
বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, ডিজিটাল জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ, সংগঠিত অপরাধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরাধীরা যখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তখন পুলিশকে সেই অপরাধ মোকাবিলার জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাভিত্তিক সক্ষমতা প্রদান করা জরুরি।
শুধু জনবল বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থা। প্রতিটি থানায় পর্যাপ্তসংখ্যক টহল যান, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, জিপিএস ট্র্যাকিং, ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, উন্নত ফরেনসিক সহায়তা এবং রিয়েল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোতে পুলিশের কার্যকারিতার পেছনে এই প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের বড় ভূমিকা রয়েছে।
একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। আধুনিক অপরাধ মোকাবিলা, মানবাধিকার, কমিউনিটি পুলিশিং, সংঘাত ব্যবস্থাপনা, সাইবার তদন্ত এবং জনসেবাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়মিতভাবে প্রদান করতে হবে। একজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ পুলিশ সদস্য শুধু অপরাধ দমনই করেন না; তিনি জনগণের আস্থা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পুলিশ সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই জবাবদিহি, পেশাদারি এবং আচরণগত পরিবর্তনের কথা বলি। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সক্ষমতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আশা করা যায় না।
একটি হাসপাতালকে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ছাড়া যেমন উন্নত সেবা দিতে বলা যায় না, তেমনি পর্যাপ্ত জনবল, যানবাহন, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ ছাড়া পুলিশের কাছ থেকেও বিশ্বমানের সেবা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যাত্রায় একটি কার্যকর, দক্ষ এবং জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। কারণ, নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। বিনিয়োগ, ব্যবসা, শিল্পায়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা একটি মৌলিক পূর্বশর্ত।
আসন্ন জাতীয় বাজেট তাই এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে জনগণের আস্থাভাজন, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দ্রুত সেবাদানকারী পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে চাই, তাহলে পুলিশের জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন সরবরাহ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—জনগণের প্রত্যাশা এবং পুলিশের সক্ষমতার মধ্যে যদি বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়, তাহলে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়বে। কিন্তু সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পুলিশ আরও দ্রুত, আরও দক্ষ এবং আরও মানবিক সেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের মানুষ একটি আধুনিক, পেশাদার ও জনগণের পুলিশ চায়। পুলিশ সদস্যরাও জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে চান। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ, একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও জনমুখী পুলিশ বাহিনী শুধু পুলিশের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্র এবং জনগণের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশকে যদি আমরা একটি নিরাপদ, বিনিয়োগবান্ধব এবং উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে পুলিশকে ব্যয় নয়, বরং একটি অপরিহার্য জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। আসন্ন বাজেট ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হতে পারে—আমরা কি সত্যিই একটি আধুনিক, কার্যকর এবং জনগণের পুলিশ চাই, নাকি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ছাড়াই কেবল সেই পুলিশি সেবার প্রত্যাশা করে যেতে চাই?
মো. ইমরান আহম্মেদ লেখক ও গবেষক
ই–মেইল: emranahmmed1991@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব।