পশ্চিমা বিশ্বের কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবীর মধ্যে এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাঁরা প্রায় সব জায়গাতেই ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ খুঁজে পান। কিন্তু যেখানে এ বিষয়ে কথা বললে নিজের অবস্থান, সুবিধা বা নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, সেখানে তাঁদের ভাষা হঠাৎ নীরব হয়ে যায়।
এই বুদ্ধিজীবীরা সাধারণত প্যারিসে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করেন, দিল্লিতে গিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান, গাজা প্রসঙ্গে বজ্রকণ্ঠ হন আর ওয়াশিংটনে সাম্রাজ্যবাদ ব্যাখ্যায় খুব দক্ষ। কিন্তু পাকিস্তানে যখন মুসলিম রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করা হয়, যখন ইমরান খানকে কারাগারে রাখা হয়, যখন তাঁর লাখো সমর্থককে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তখন তাঁদের সেই উচ্চকণ্ঠ আর শোনা যায় না। আলোচনা থেমে যায়, মন্তব্য হারিয়ে যায় আর নৈতিক অবস্থানের কথা পিছিয়ে যায় সুবিধাজনক সময়ের জন্য।
ইমরান খানকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তোলা জরুরি নয়। তাঁর রাজনীতির অনেক দিক নিয়েই বিতর্ক আছে। চাইলে তাঁকে সমালোচনা করা যায়, তাঁর আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যানও করা যায়। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করা কঠিন যে তিনি ইসলামোফোবিয়ার প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলেছিলেন।
ইমরান মুসলমানদের মর্যাদাকে শুধু অভিযোগের বিষয় হিসেবে নয়, আত্মসম্মানের প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনতে চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে বহু মানুষের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হয়েছিল যে মুসলিমদের স্বাধীনতা সব সময় সেনাবাহিনী, উপসাগরীয় রাজতন্ত্র, পশ্চিমা দূতাবাস বা স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকার বাধ্যবাধকতা নয়।
কিন্তু আজ সেই মানুষই যখন সেসব শক্তির হাতে বন্দী, যাদের বিরুদ্ধে কথা বলার দাবি এই বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই করেন, তখন তাঁদের সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে নীরব থাকা। এই নীরবতা তাঁদের জন্য সুবিধাজনক ও ঝুঁকিহীন। একই সঙ্গে দেখা যায় আরও একটি দ্বৈত মানদণ্ড। যেসব ধারণা একসময় বাস্তবতা বোঝার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখন বেছে বেছে ব্যবহার করা হয়। ফ্রান্স, ভারত, ইসরায়েল, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এসব ধারণা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়।
কিন্তু যখন দমন-পীড়ন আসে নিজেদের ভেতর থেকেই (সেনাবাহিনীর ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা), তখন সেই বিশ্লেষণগুলো অনেক সময় আর ব্যবহার করা হয় না। তখন তার জায়গা নেয় ‘পরিস্থিতি জটিল’ ধরনের ব্যাখ্যা।
এভাবে ইসলামোফোবিয়ার ধারণাটিও দুমুখো হয়ে যায়। পশ্চিমা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটি হিজাব নিষেধাজ্ঞা, ধর্মীয় বৈষম্য, পুলিশি নির্যাতন বা যুদ্ধের প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানের মতো বাস্তবতায় যখন রাজনৈতিক বিরোধী শক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন শব্দটি অনেক সময় হারিয়ে যায়। এটি কোনো গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা নয়; বরং একধরনের নিরাপদ নীরবতা।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তত্ত্ব ও বাস্তবতার বিচ্ছেদ। কিছু তাত্ত্বিক দীর্ঘদিন ইমরান খানের রাজনীতিকে আগ্রহের সঙ্গে দেখেছেন। তাঁদের কাছে এটি ছিল একধরনের নতুন মুসলিম রাজনৈতিক ধারা, যেখানে পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে গিয়ে আত্মসম্মান, সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা এবং নৈতিক রাজনীতির কথা বলা হয়। কিন্তু যখন সেই রাজনৈতিক ধারা বাস্তব সমর্থনের দাবি নিয়ে সামনে এল, তখন অনেকেই দূরে সরে যান। তত্ত্ব রয়ে যায়, কিন্তু বাস্তব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জায়গা তৈরি হয় না।
এই বিচ্ছেদ সবচেয়ে স্পষ্ট হয় প্রবাসী পাকিস্তানি শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। ব্র্যাডফোর্ডসহ অনেক জায়গায় ইমরান খানের বড় সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। তারা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, সংগঠিত এবং স্পষ্ট অবস্থান নেয়।
কিন্তু যাঁরা বলেন ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সামাজিক আন্দোলন জরুরি, তাঁদের অনেকেই এ বাস্তব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হননি।
এখানেই শ্রেণিগত দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শ্রমজীবী মুসলমানরা তত্ত্বের ভাষায় ‘প্রবাসী’ বা ‘উপনিবেশ-পরবর্তী সমাজ’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখন তারা বাস্তব রাজনীতিতে সক্রিয় হয় এবং অভিজাত বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে না মেলে, তখন তাদের অনেক সময় অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা অগোছালো হিসেবে দেখা হয়। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে জায়গা পায় না। ফলে দেখা যায়, মুসলিম স্বায়ত্তশাসনের কথা যাঁরা বলেন, তাঁদেরই একাংশ বাস্তব মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে দূরে সরে যান।
তবে সবাই নীরব নয়। কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন এ পরিস্থিতিতে সাহস দেখিয়েছে। তারা সমালোচনা করেও মানুষকে পরিত্যাগ করেনি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ রাখার চেষ্টা করেছে।
এ ছাড়া কিছু সংগঠন এটাও স্পষ্টভাবে বোঝে যে ইসলামোফোবিয়া শুধু পশ্চিমা রাষ্ট্রের সমস্যা নয়। অনেক সময় মুসলিম রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামোও নিজেদের জনগণকে দমন করতে একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে। শুধু রূপ বদলায়, কাঠামো একই থাকে।
এ কারণেই ইমরান খানের বন্দিত্ব শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঘটনা নয়। অনেকেই তাঁর পরিস্থিতিকে মিসরের নির্বাচিত নেতা মোহাম্মদ মুরসির ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন হলেও কাঠামো এক—জনপ্রিয় নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, বিচ্ছিন্ন করা হয় আর বাইরে থেকে বলা হয়, এটি ‘জটিল বিষয়’।
কিন্তু ইতিহাস দেখায়, এ ধরনের ঘটনার পরিণতি আসলে খুব বেশি জটিল নয়। এটি শুরু হয় ভয় দিয়ে এবং শেষ হয় দমন-পীড়ন ও অনুশোচনায়।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—সমালোচনা কি কখনো এমন অজুহাতে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে কাউকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া যায়?
রাজনীতিতে কেউ নিখুঁত নয়। তাই সংহতি মানে অন্ধ সমর্থন নয়। কারও ওপর অন্যায় হলে তার পাশে দাঁড়ানো মানে তার সব অবস্থান মেনে নেওয়া নয়। এই পার্থক্যগুলো বোঝা কঠিন নয়। কঠিন তখনই হয়, যখন ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কারা সত্যি কথা বলেছিল। নিরাপদ নীরবতা বা সতর্ক ভাষা সেখানে জায়গা পায় না। টিকে থাকে শুধু সেই কণ্ঠ, যারা ঝুঁকি নিয়েও কথা বলেছিল।
সবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—এই বুদ্ধিজীবীরা কি সত্যিই মুক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন, নাকি কেবল তার ভাষা ব্যবহার করেন?
অধ্যাপক জুনাইদ এস আহমদ আইন, ধর্ম ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ে শিক্ষক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত