আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করছে এবং নির্বাচনী প্রচারে তা ব্যবহার করছে। স্বাভাবিক কারণেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং প্রতিশ্রুতি জনগণের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
বিএনপি কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি হলো সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন। ২০ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বনানী সোসাইটি আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান এ ঘোষণা দেন।
কেন খাল খনন করতে হবে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি মূলত জলাবদ্ধতা ও শহরাঞ্চলের পানিনিষ্কাশনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঢাকা শহরের বাসিন্দারাও এখন খাল খননের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন। কারণ, একের পর এক খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে সমগ্র বাংলাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটারের খাল খনন করবে।’ (সূত্র: bnpbd.org//all-news)
বাংলাদেশের প্রবহমান জলাধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাল। কোনো কোনো খাল আয়তন, প্রবাহের পরিমাণ ও ভূমিকার দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক নদীর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। তা সত্ত্বেও খাল ও নদীর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নদী সম্পূর্ণই প্রকৃতির সৃষ্টি, পক্ষান্তরে খাল সাধারণত মনুষ্যসৃষ্ট। সে জন্যই আমরা খাল নির্মাণের কথা বলি, কিন্তু নদী নির্মাণের কথা বলতে পারি না। খালের এই মনুষ্যসৃষ্ট বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করার জন্য অনেক স্থানের খালকে ‘কাটা খাল’ বলা হয়। অনেক স্থানে খাল এত সুদূর অতীতে কাটা হয়েছিল, যে সেগুলো এখন প্রকৃতির অংশ বলেই প্রতিভাত হয়। অনেক সময় প্রাকৃতিক নদীকেও খাল বলা হয়।
যা-ই হোক না কেন, নদী-নালার মতো খালগুলোও এ দেশের নদীব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সে জন্য খাল খননকে দেশের নদীব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবে ভাবা প্রয়োজন। বস্তুত নদ-নদীর সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপিত না হলে শুধু শহরের অভ্যন্তরে খাল খনন দ্বারা জলাবদ্ধতা ও পানিনিষ্কাশনের সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে না। কারণ, প্রশ্ন থেকেই যায়—খালের পানি যাবে কোথায়? (দ্রষ্টব্য আমার নিবন্ধ, ‘হয়ার উইল দ্য ক্যানেল ওয়াটার গো?’ ডেইলি স্টার, ১০ আগস্ট ২০০৯)
ঢাকা শহরের কথাই ধরা যাক। একসময় এই শহরের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫০টি খাল ছিল, যেগুলো শহরকে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল ও বালু নদের সঙ্গে যুক্ত রাখত। অবহেলা ও দখলের কারণে এসব খাল দীর্ঘদিন ধরেই অবক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর ‘বৃহত্তর ঢাকা পশ্চিম তীরবর্তী বাঁধ’ নির্মাণের কারণে ঢাকার খালগুলোর সঙ্গে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের সংযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
পরে পূর্ব দিকে বালু নদের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী প্রকল্পও গৃহীত হয়, যদিও পরিবেশবাদীরা নদীর সঙ্গে শহরের সংযোগ বজায় রাখতে সেটিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হিসেবে নির্মাণের সুপারিশ করেছিলেন। এসব বাঁধের কারণে ঢাকার খালের পানি নদীতে যাওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং জলাবদ্ধতা প্রকট রূপ ধারণ করে। এই বাস্তবতায় শুধু খাল খনন করে ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করা যাবে না; প্রয়োজন হবে চারপাশের নদ-নদীর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ পুনরুদ্ধার।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করতে হলে একদিকে এর কারিগরি ও পরিবেশগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে এবং অন্যদিকে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি দেশব্যাপী এক কর্মোদ্যোগের ইঙ্গিত দেয়। কারণ, শুধু শহরাঞ্চলের খাল পুনরুদ্ধারের জন্য এত পরিমাণ খননের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিও দেশব্যাপী বিস্তৃত ছিল। তিনি খাল খননের পাশাপাশি নদ-নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যেমন ব্রহ্মপুত্র নদ পুনঃখননের উদ্যোগ। প্রশ্ন হলো খাল খননের সামগ্রিক উদ্দেশ্য এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের নদ-নদীর দুটি মৌল বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দিতে হয়। একটি হলো প্রবাহের চরম ঋতুভেদ। বার্ষিক বৃষ্টির প্রায় ৮০ শতাংশ মাত্র চার মাসে সীমাবদ্ধ থাকে। উপরন্তু আমাদের নদ-নদীর পানি উৎস এলাকার প্রায় ৯৩ শতাংশ দেশের সীমান্তের বাইরে অবস্থিত। ফলে প্রবাহের ঋতুভেদ আরও বহুগুণিত হয়। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো বিপুল পরিমাণ পলি বালু। উজানে হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির কারণে কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে পৌঁছায়।
এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশের জন্য নদীব্যবস্থার প্রতি উপযোগী হলো ‘উন্মুক্ত পন্থা’। এতে বর্ষাকালে নদীর পানি কূল উপচে প্লাবনভূমিতে বিস্তৃত হতে পারে। সেখানে পলিপতন ঘটে, ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি পায় এবং ভূগর্ভস্থসহ সব জলাধার নবায়িত হয়। সঞ্চিত পানি শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ রক্ষায় ও সেচসহ বিভিন্ন কাজে সহায়ক হয়। একই সঙ্গে নদীখাদে কম পলিপতন ঘটে এবং নদীর গভীরতা বজায় থাকে।
এই বাস্তবতা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে অষ্টমাসি বাঁধের উদ্ভাবন করেছিল। বর্ষার চার মাস এসব বাঁধ খুলে দেওয়া হতো, যাতে পলিসম্পন্ন পানি প্লাবনভূমিতে প্রবেশ করতে পারে। বাকি আট মাস বাঁধ বন্ধ রেখে পানি সঞ্চিত রাখা হতো। কিন্তু বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে বিদেশি সংস্থা ও পরামর্শকেরা এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে তথাকথিত ‘পানি উন্নয়ন’ কর্মসূচির মাধ্যমে নদীর ওপর ‘বেষ্টনী পন্থা’ চাপিয়ে দেন। স্থায়ী বেড়িবাঁধের মাধ্যমে প্লাবনভূমিকে নদীখাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই পন্থা বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী প্রমাণিত হয়েছে। এই বেষ্টনী পন্থাই নদীব্যবস্থার অবক্ষয় এবং শহর ও গ্রামাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ক্রমবিস্তারের মূল কারণ।
ভারত কর্তৃক উজানে পানি প্রত্যাহার এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। কাজেই জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে এবং নদী ও প্লাবনভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বেষ্টনী পন্থা পরিত্যাগ করে উন্মুক্ত পন্থায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে। খাল খনন কর্মসূচিকে এই প্রত্যাবর্তনের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে না পারলে তা লক্ষ্যহীন হয়ে পড়বে।
খাল খননের সাফল্যের সঙ্গে আরেকটি বিষয় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তা হলো খননসৃষ্ট মাটির ব্যবহার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মাটি খালের পাড়ে ফেলে রাখা হয় এবং পরে তা আবার খালে গিয়ে পড়ে খননের সুফল নস্যাৎ করে দেয়। এই মাটিকে প্লাবন ও জোয়ারভূমিতে অবস্থিত গ্রামগুলোর পাটাতন উঁচু করার কাজে ব্যবহার করা গেলে তা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায়ও সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য গ্রামপর্যায়ে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ইউনিয়ন পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ফলে গ্রামে জন-জমি-জলের যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ উদ্যোগটি স্মরণযোগ্য। এই ব্যবস্থায় গ্রামের ভেতরে লভ্য শ্রম ও সম্পদের যৌথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮২ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর গ্রাম পর্যায়ে কার্যকর স্থানীয় সরকার আর গড়ে ওঠেনি।
এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার কারণে গ্রামগুলো অনেকটা আত্মশক্তিহীন হয়ে পড়েছে। যেকোনো যৌথ প্রয়াসের জন্য তাদের ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। খাল খনন কর্মসূচিকে সফল করতে হলে গ্রাম সরকারের পুনঃপ্রবর্তন নিয়েও ভাবতে হবে। তবে তা যেন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বিভক্তির আখড়ায় পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। সরকারি অর্থ নয়, বরং যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে গ্রামের অভ্যন্তরে লভ্য সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করতে হলে একদিকে এর কারিগরি ও পরিবেশগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে এবং অন্যদিকে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
ড. নজরুল ইসলাম অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান
(nislam13@yahoo.com)
মতামত লেখকের নিজস্ব