প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

মতামত

রোজায় এত দিন স্কুল বন্ধ করে এক ঢিলে কত পাখি মারল সরকার

ইংরেজিতে ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ বলে একটা কথা আছে। আপনারা জানেন, এটা এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে জড়িত সব পক্ষই সমানভাবে লাভবান হয়। সাধারণত যখন কোনো পদক্ষেপে সব পক্ষই তুষ্ট হয়, তখন আর তা বাস্তবায়নে কোনো দ্বিধাই থাকে না—‘এক ঢিলে সব পাখি কাত’।

পবিত্র রমজান মাসে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাসাধিককাল বন্ধ ঘোষণা করে নতুন সরকার দৃশ্যত সব পক্ষকেই কাত করেছে। কিন্তু শুরুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই ‘জনপ্রিয়’ সিদ্ধান্তে আসলেই কি সব পক্ষ ‘উইন’ বা জয়লাভ করেছে? নাকি কার্যত এটা ‘লস-লস সিচুয়েশন’ তৈরি করেছে? যাতে শেষমেশ সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? বা আরেকটু কর্কশ ভাষায় একে কি ‘নো উইন সিচুয়েশন’ বলা যায়, যাতে কোনো পক্ষেরই জেতার পথ খোলা নেই?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মোটাদাগে জড়িত পক্ষ তিনটি—শিক্ষার্থী-অভিভাবক, শিক্ষক এবং সরকার। দেখা যাক, এই সিদ্ধান্তে কার লাভ, কার ক্ষতি হলো।

রোজা রেখে বিশেষ করে শিশুশিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে অনেক ক্ষেত্রে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তির বাতাস বয়ে নিয়ে এসেছে, সন্দেহ নেই। তার ওপর আমাদের দেশের শিক্ষা যেখানে ‘শাস্তির’ই নামান্তর, সেখানে এক মাস এই শাস্তি থেকে স্বস্তি পেতে কে না চায়?

এ প্রসঙ্গে কয়েক দিন আগে এক শিশুশিক্ষার্থীর সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা মনে পড়ে গেল। শিশুটি প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, স্কুলেও নিয়মিত। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে কী?’ ও বলল, ‘ডিমভাজি দিয়ে ভাত।’ ‘স্কুল ভালো লাগে?’ পষ্ট জবাব, ‘না।’

শিক্ষাকে আমরা এখনো আনন্দদায়ক করে তুলতে পারিনি, সেটা ভিন্ন আলোচনা। এই আলাপচারিতা টানার উদ্দেশ্য, স্কুল বন্ধ তো ঐতিহাসিকভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছে শাস্তি থেকে সাময়িক মুক্তি। ফলে রোজায় স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের যারপরনাই আনন্দিত করেছে। কিন্তু তাদের শিখনঘাটতির কী হবে?

বছরের শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা প্রকাশ করে। এতে কোন কর্মদিবসে কতটুকু পড়ানো হবে, তা-ও নির্ধারিত থাকে। দেখা যায়, বছরজুড়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেকটাই হিমশিম খেতে হয়। সেখানে এবার ২০ রমজান পর্যন্ত স্কুল খোলা ধরে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাহলে এই ২০ দিনের শিখনঘাটতি পূরণ কীভাবে হবে?

বোঝাই যাচ্ছে, পরিকল্পনা আবার করতে হবে এবং সেটা করা হয়তো অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য কম্পিউটারে ফাইল খুলে আগের তালিকায় কয়েকটা নতুন ‘কলাম ও রো ইনসার্ট’ করার কমান্ডের মতো ডালভাত মাত্র। কিন্তু শিক্ষকদের জন্য তা বাস্তবায়ন? ধর তক্তা মার পেরেকের মতো হবে না তো? হলে এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে তো সেই শিশুদের ওপরই পড়বে।

সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব বন্ধ হলেও কিন্ডারগার্টেন ও কওমি মাদ্রাসা এখনো সচল। এমনিতেই সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী-খরায় ভুগছে বহুদিন। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নামেরও শিকার। তার ওপর মাসাধিককাল বন্ধের এই সুযোগ নিচ্ছে আবারও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

শিক্ষার্থীদের শহুরে অভিভাবকেরাও আমার ধারণা, স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেয়েছেন। রোজায় ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের মতো জনবহুল শহরে কী যে যানজট, তা তো সবাই জানেন। সেখানে ইফতারের আগে শিশুদের আনা-নেওয়া ঝক্কিরই বটে। সেখান থেকে সাময়িক মুক্তি তো মিলছে। কিন্তু তাঁদেরও বছর শেষে শিখনঘাটতির ওই আশঙ্কাই তাড়া করবে নিশ্চিতভাবেই।

এদিকে শিক্ষকদের কেউ কেউ হয়তো রোজা রেখে ক্লাস পরিচালনার মতো কঠিন এক কর্ম থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে স্বস্তি পাচ্ছেন। রোজা রেখে ক্লাস নেওয়া দুঃসাধ্য না হলেও দুঃসহ, সে নিয়ে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ক্লাস নেওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা এটা জানেন। কিন্তু সেই শিখনঘাটতি মেটানোর চাপ তো তাঁদের ওপরই পড়বে। অধিদপ্তর তো চিঠি ইস্যু করেই খালাস। কাজ তো করতে হবে শিক্ষকদেরই।

শিখনঘাটতি ছাড়াও যে বিষয়টা শেষমেশ সবাইকে ভোগাবে, তা হলো সরকারের নির্দেশ সবার না মানা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মেনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি আসলেই বন্ধ হয়েছে? আমরা তো দেখছি, হয়নি।

সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব বন্ধ হলেও কিন্ডারগার্টেন ও কওমি মাদ্রাসা এখনো সচল। এমনিতেই সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী-খরায় ভুগছে বহুদিন। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নামেরও শিকার। তার ওপর মাসাধিককাল বন্ধের এই সুযোগ নিচ্ছে আবারও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

এর আগে আমরা দেখেছি, করোনায় সব সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও এর সুযোগ নিয়েছিল এসব কিন্ডারগার্টেন ও কওমি মাদ্রাসা। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানেও গজিয়ে উঠেছিল মানহীন অনেক প্রতিষ্ঠান। মাসব্যাপী বন্ধও এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করে।

নিজের অভিজ্ঞতা বলি। স্কুল বন্ধের ঠিক দুই দিন আগে পাশের একটি কিন্ডারগার্টেন থেকে ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী এল সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি হতে। ভর্তি হওয়ার পরদিনই রাতারাতি স্কুল বন্ধের ঘোষণা। ওই শিক্ষার্থী এখন আগের কিন্ডারগার্টেনেই যাচ্ছে।

মানসম্মত হলে কিন্ডারগার্টেন বা কওমি—কোনোটিতেই আমাদের বিদ্বেষ নেই। কিন্তু মুশকিল হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়া মুখস্থ করানোর হার বেশি হলেও শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনি আশঙ্কা আছে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে।

অনেক অভিভাবক ভেতরের এই বাস্তবতা হয়তো অত জানেন না। তাঁরা দেখছেন, সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সব টো টো করে ঘুরছে। অন্যদিকে কওমি, কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা ঘাড়–মুখ গুঁজে পড়ছে—তাহলে ‘সচেতন’ অভিভাবক হিসেবে তিনি কোথায় বাচ্চাকে ভর্তি করাবেন?

তো সরকার যদি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে না-ই পারে, তবে সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থী ভর্তির অসম প্রতিযোগিতায় কেন ঠেলে দেয়? কেন এ কারণে শিক্ষকদের জবাবদিহিও করতে হয়?

মানছি, সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার আরও শত কারণ আছে। তবে তার দায়ও শিক্ষকদের পাশাপাশি সরকারের এমন নানা রাতারাতি সিদ্ধান্তেরও থাকে।

এখন বিষয় হচ্ছে, অবকাশ বিভাগের কর্মচারী হিসেবে শিক্ষকদের এসব ছুটি তো ন্যায্য পাওনা। তা হলে?

অনেকেই জানেন না, সরকারের শিক্ষা ও বিচার বিভাগের কর্মীরা অবকাশ বিভাগের অধীন। এ কারণে চাকরিজীবনের শেষে তাঁরা সরকারের আর্থিক সুবিধাও কম পান। অর্থাৎ অবকাশকালীন এসব ছুটি তাঁদের আক্ষরিক অর্থেই টাকায় কিনে নেওয়া। সরকার দয়াপরবশ হয়ে এসব ছুটি দেয় না। বিচার বিভাগের অবকাশের বেলায় বেশির ভাগ মানুষের তেমন কোনো সংস্রব না থাকায় হইচই নেই। আবার হাকিমের ‘বেতের বাড়ি’ বলেও কথা আছে। তাই সব ক্ষোভ গিয়ে উগরে পড়ে বেতহীন নিরীহ শিক্ষক সম্প্রদায়ের ওপর।

তো এমন ‘লস-লস’ বা ‘নো উইন সিচুয়েশনে’র সমাধানই–বা কী?

আমাদের মনে হয়, রোজার মাসেও ক্লাস চলতে পারে, তবে সীমিত পরিসরে। অন্য চাকরিজীবীদের জন্য যেমন অফিস সময় নতুন করে নির্ধারিত হয়, স্কুলের ক্ষেত্রেও তা-ই হতে পারে। এই সময় আরেকটু কমও হতে পারে, যেহেতু ‘ক্লাস কন্ট্রোল’ করে বক্তব্যনির্ভর পাঠদান ও পাঠগ্রহণ যথেষ্ট ক্লান্তিকর। আর অবকাশকালীন ছুটি শিক্ষকদের দিতে হবে কম কম করে বিভিন্ন সময়ে, একটানা নয়।

এতে শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি যেমন পূরণ হতে পারে, তেমনি তাদের ওপর চাপও কম থাকবে। অভিভাবকদেরও স্বস্তি মিলবে, সঙ্গে শিক্ষকদের ওপর ক্ষোভও কিছুটা কমতে পারে। আর শিক্ষকেরা তাঁদের ছুটিও পেলেন, সম্মানও বেঁচে থাকল। অথবা এবারের মতো রাতারাতি ‘জনপ্রিয়’ সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভবিষ্যতে আরেকটু ভেবেচিন্তে আরও ফলপ্রসূ উপায় বের করতে পারে মন্ত্রণালয়।

সব পক্ষের ‘উইন-উইন’ এমন ‘সিচুয়েশন’ তৈরি হলে শেষমেশ উইন তো করল সরকারই, যাকে বলা যায়—এক ঢিলে সব পাখি কাত!

  • রঞ্জু খন্দকার শিক্ষক ও লেখক। ই–মেইল: alamgircj@gmail.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব