মতামত

লিফট কেনার অভিজ্ঞতা তাঁরা কোথায় কাজে লাগাবেন

নির্মাণাধীন এই ভবনসহ ৫টি ভবনের জন্য ২৫টি লিফট কিনতে ইউরোপের দেশ তুরস্কে যাচ্ছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল
ছবি: হাসান মাহমুদ

পুকুর খনন, ঘাস চাষ, ছাগল চাষ, মসলা চাষ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টাগবোট চালানোসহ নানা কিছু শিখতে বা দেখতে হামেশাই আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকেরা, সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে বের হোন। নানান কায়দাকানুনে বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে সরকারি খরচে এ ‘প্রমোদভ্রমণ’ কয়েক দশক ধরে অফিসপাড়ায় অনেকটাই স্বঘোষিত বিষয় হয়ে গেছে। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় এসব ভ্রমণ নিয়ে গণমাধ্যমে চাউর হলেও থামছে না সেসব প্রকল্পের ফাঁকফোকর।

সরকারি আমলা-কর্মকর্তাদের সেই ‘প্রমোদভ্রমণে’ এবার যোগ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, লিফট কিনতে তুরস্কে যাচ্ছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্যসহ ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল, যেখানে বাকিরা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা। ‘অদ্ভুত’ এই ভ্রমণে যাচ্ছেন বলে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতা নেই, আবার সরকারের সংশ্লিষ্টতাও নেই। এখানে সরকারি কোনো অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে না। সফরের এই অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বহন করবে।

তাঁরা সঠিক কথাই বলেছেন। পাঁচ ভবনে ২৫টি লিফট কিনতে যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়েছে, সেই ভ্রমণের অর্থ ‘ঠিকাদারি’ প্রতিষ্ঠানই বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ, ঠিকাদার তো একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন, আর সেই দাতব্য তহবিল থেকে ওই ছয়জনের ১০ দিনের সফরের অর্থ জোগান দেবে। বিচারবুদ্ধি থাকলে এমন প্রমোদভ্রমণে অর্থ লাভের উৎস কোথায়, তা জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন পড়ে না।

কোনো ফাঁক গলে এসব ভ্রমণের অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বের করবে, তার পাটিগাণিতিক হিসাব তারা জানে। মাছের তেলে মাছ ভাজা করতে পারলে এসব ভ্রমণে ভ্রমণকারীদের হাতখরচের মতো অর্থ যে বের করা সম্ভব, তা বোঝার জন্য সাম্প্রতিক এসব আলোচনার পত্র-পত্রিকায় খবরাখবরই যথেষ্ট। তবে জনগণের করের অর্থ দিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জীবিকা চলছে, ছেলেমেয়েদের আবাসিক ব্যবস্থা হচ্ছে, সেই অর্থ এভাবে অপচয় করার হেতু নিয়ে প্রশ্ন করার মানুষ কমে যাওয়ায় এসব নামে–বেনামে প্রকল্পে ভ্রমণের খাত তৈরি করা হচ্ছে।

কিন্তু কেন? আদৌও কি এসব ভ্রমণ কাজে দেয়? যাঁরা ভ্রমণে যান, তাঁদের এই সংস্কৃতি আমাদের দুর্বল শাসনব্যবস্থার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি না হওয়ায় ক্রমশ এসব ভ্রমণ–উদ্যোক্তা দানব হয়ে উঠছে। প্রকল্পের ভ্রমণের এমন কৌশল বিশ্বের ঠিক আর কতটি দেশে চালু রয়েছে, তা সত্যি বোধগম্য নয়।

দেশের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বিদেশ ভ্রমণে যান মূলত সায়েন্টিফিক সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে। অতিথি গবেষক হিসেবে অন্য ল্যাবে গিয়ে নতুন নতুন কাজ শিখে আসেন। সেসব সেমিনারে গিয়ে যৌথ গবেষণা করার পথ তৈরি করে আসেন কিংবা সুযোগ তৈরি করেন। এসব অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে নেন, তবে সেই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট থেকে দেয় না। এসব ভ্রমণে যেতে হলে ওই শিক্ষকেরই গবেষণা তহবিল থাকতে হয় আর সেই গবেষণা তহবিল পেতে তাঁকে রাত-দিন পরিশ্রম করে প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করতে হয়। বিনিময়ে তিনি বছরে কোনো সায়েন্টিফিক সেমিনারে যেতে কেবল ভ্রমণ বা ট্রাভেল অ্যালাউন্স পেয়ে থাকেন। ফলে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাপক-গবেষকদের ‘বিদেশ সফর’ অনেকটাই রীতিসিদ্ধ।

কিন্তু একজন সহ–উপাচার্য, যিনি একজনও শিক্ষকও, তিনি লিফট কিনতে যাচ্ছেন মূলত জামা কেনার মতো লিফট কেবল দেখবেন বলে। প্রতিনিধি দলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ গ্রহণ না করলেও ওই ভ্রমণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করছেন তাতে তাঁরা মোটেই লজ্জিত নন। বরং তাঁরা গর্বের স্বরে বলছেন, তাঁদের ভ্রমণে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে না। এসব শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণের একটি পূর্ণাঙ্গ কোর্স করানো উচিত।

শুধু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্পষ্টত সারা দেশে এসব প্রকল্পের নামে ভ্রমণ আমাদের দেশের দুর্নীতিকে একধরনের উৎসাহিত করে। পাবলিক ফান্ডের তছরুপের পথ দেখায়। কাগজে–কলমের এই মারপ্যাঁচ একজন রিকশাচালক কিংবা কৃষকের শরীর পোড়ানো করের অর্থ নিয়ে বিদেশ সফরে বিশেষজ্ঞ হয়ে যাওয়া মানুষগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে নিন্দিত হওয়া উচিত।

যেখানে শিক্ষকের আধুনিক লিফট গবেষণা নিয়ে সায়েন্টিফিক সেমিনারে যাওয়ার কথা, নতুন নতুন গবেষণার ফলাফল বিশ্বদরবারে তুলে ধরার কথা, সেখানে শিক্ষকের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল বিদেশ সফলে যাচ্ছে শত বছর আগে আবিষ্কৃত লিফটের ভালো-মন্দ দেখতে। তাতে তাঁরা মোটেই লজ্জিত হচ্ছেন না। কারণ, ‘লজ্জার’ মাথা তো কেটেই স্বয়ং উপাচার্য এসব অনুমোদন দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে খারাপ জিনিস যেন না আসে, সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকে হয়তো তিনি তাঁর সহকর্মী-কর্মকর্তাদের পাঠাচ্ছেন। অভিকর্ষজ ত্বরণের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানোর বাইরে কবে যাঁরা ‘লিফট বিশেষজ্ঞ’ বনে গেছেন, তা কে জানে।

অথচ একজন শিক্ষকের লিফট কেনার অভিজ্ঞতার চেয়ে একাডেমিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার কথা। ঠিকাদারের অর্থ ভ্রমণ না করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণার তহবিলদাতাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রপোজাল নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। গবেষণা তহবিলের নির্দিষ্ট ট্রাভেল অ্যালাউন্স পেতে যে কষ্ট করতে হতো, সেই কষ্ট লাঘবে ঠিকাদারদের এমন লোভনীয় অফারকে উপেক্ষা করার সাহস কার কতটুকু থাকে বলুন? তাঁদের প্রশ্ন করা উচিত ছিল যে, তাঁরা যে ভ্রমণে যাবেন, কেনইবা ঠিকাদার তার খরচ বহন করতে যাবেন? মজবুত টেকসই লিফটের কথা যদি তাঁরা বিবেচনা করতেন, তাহলে এসব অহেতুক ভ্রমণে বিলাসিতা না করে সেই ভ্রমণের অর্থ লিফট কেনায় লাগালে লিফট আরও বেশি মজবুত, টেকসই ও নামকরা কোম্পানির কাছ থেকে কেনা সম্ভব হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যেখানে ছেলেমেয়েরা গবেষণার খরচ পাচ্ছে না, সেখানে এমন কৌশলী প্রকল্প ভ্রমণ আমাদের ভাবিয়ে তোলে।

ইন্টারনেটের যুগে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তের জিনিস কিনতে কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া কোট অর্ডার নেওয়া সম্ভব, নেগোসিয়েশন করা সম্ভব, এমনকি গ্যারান্টি-ওয়ারেন্টি সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব সেখানে জামার বোতাম ছেঁড়া নাকি লাগানো আছে, তা দেখার মনোবাসনা মূলত জবাবদিহির বড্ড অভাবের ফসল বটে। অথচ এসব ভ্রমণকারীকে যদি বলা হতো, আপনার ভ্রমণের এক-চতুর্থাংশ খরচ আপনার কাঁধে থাকবে, দেখতেন কেউ লিফট বিশেষজ্ঞ নন বলে জানিয়ে দিতেন। বিভিন্ন অজুহাতে প্রমোদভ্রমণ থেকে নিজেকে বিরত রাখতেন।

শুধু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্পষ্টত সারা দেশে এসব প্রকল্পের নামে ভ্রমণ আমাদের দেশের দুর্নীতিকে একধরনের উৎসাহিত করে। পাবলিক ফান্ডের তছরুপের পথ দেখায়। কাগজে–কলমের এই মারপ্যাঁচ একজন রিকশাচালক কিংবা কৃষকের শরীর পোড়ানো করের অর্থ নিয়ে বিদেশ সফরে বিশেষজ্ঞ হয়ে যাওয়া মানুষগুলো সমাজ-রাষ্ট্রে নিন্দিত হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, অনেক ঘরেই দুই বেলা খাবার পেতে সারা দিন পুকুর খুঁড়ে, মাঠে ছাগল চরায়, ঘাস কাটে; সেখানে এগুলো দেখতে একদল মানুষ বিদেশে যাবেন, তা কল্পনা করতেই কষ্ট হচ্ছে। লিফট কেনার জন্য এই যে শিক্ষক–কর্মকর্তরা মিলে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন, তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে কোন কাজে লাগবে? তাঁরা কি পরে লিফটের ব্যবসায় নামবেন?

যখনই এসব প্রমোদভ্রমণ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় আলোচনা হয়, তখন এসব ভ্রমণ বাতিল হয়, নতুবা বিলম্বিত হয়। পাবনার ঘটনায় হয়তো সেটিই ঘটবে। কিন্তু সংস্কৃতি তো রয়ে যায়। বন্ধ হয় না কিংবা বন্ধ করতে আইনপ্রণেতারা উদ্যোগ নেন না। সিস্টেম লসের এই ফাঁদকে বন্ধ করার সাহস রাষ্ট্রকেই দেখাতে হবে। এভাবে জনগণের অর্থ অপচয় করার অধিকার কেউ আপনাদের দেয়নি। এটি কেবল সরকারি ব্যয় নয়, জনগণের করের টাকায় সব ধরনের প্রমোদভ্রমণ বন্ধ হোক। যাঁরা করবেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় এনে শাস্তির বিধান চালু হোক।

  • ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: nadim.ru@gmail.com