বিশ্বজুড়ে একদিকে যেমন অতিধনীদের ইশারায় চলা পুতুল সরকারগুলোর দাপট দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি জনগণকে কেন্দ্র করে রাজনীতি নতুনভাবে গড়ে ওঠার চিত্রও মিলছে। কয়েক দশক ধরে রাজনীতির মাঠ যাঁদের দখলে ছিল, ভোটাররা এখন তাঁদের বদলে নতুন ও বহিরাগত বা ‘আউটসাইডার’ রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকে বেছে নিচ্ছেন।
এসব আন্দোলনের আদর্শ আলাদা হলেও তাদের কিছু সাধারণ মিল রয়েছে। আর্থিক দুশ্চিন্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরাসরি ও জনপ্রিয় নির্বাচনী প্রচারকৌশল তাদের একই সুতায় বেঁধেছে। গত দুই থেকে তিন বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এমন বহিরাগতদের জয়ী হওয়ার আলামত দেখা যাচ্ছে। এর কয়েকটি উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
হাঙ্গেরি (২০২৬): এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে পিটার মাজায়ার ও তাঁর দল তিসজা পার্টি ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের রক্ষণশীল শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। মাজিয়ার একসময় অরবানের অত্যন্ত কাছের লোক ছিলেন। তবে পরে তিনি ক্ষমতার সেই বলয় থেকে বেরিয়ে অরবানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেন। পুরোনো ওই শাসনকাঠামো ভেঙে ফেলতে তিনি ক্ষমতার ভেতরের নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। তাঁর প্রচারণায় অরবানের বড় বড় আদর্শিক কথার বদলে হাঙ্গেরির দুর্নীতি ও ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কা (২০২৪): ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর শ্রীলঙ্কার ভোটাররা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে ও তাঁর দল এনপিপির দিকে ঝুঁকেছেন। বছরের পর বছর ধরে যেসব রাজনৈতিক পরিবার বা বংশ দেশটি শাসন করে আসছিল, এই জয় ছিল মূলত তাদের প্রতি মানুষের চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান। দিশানায়েকের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মূল ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সামাজিক কল্যাণ ও সরকারকে কাঠামোগত দুর্নীতি থেকে মুক্ত করা। এর ফলস্বরূপ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে তাঁর দল তিনটি আসন থেকে বেড়ে ১৫৯টি আসনে জয়লাভ করে।
নেপাল (২০২৫–২৬): রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) একটি ‘জেন–জি’ বিদ্রোহ ঘটিয়েছে। যার নেতৃত্বে রয়েছেন র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বালেন্দ্র শাহর মতো ব্যক্তিরা। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও দুর্নীতিবিরোধী প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্বাচন করে তাঁরা প্রথাগত সত্তরোর্ধ্ব নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থবির অর্থনীতির মধ্যে তাঁরা মূলত তরুণ জনগোষ্ঠীর বিপুল সমর্থন পেয়েছেন।
নিউইয়র্ক সিটি (২০২৫): জোহরান মামদানি বাড়িভাড়া ও গণপরিবহনের মতো জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যুভিত্তিক জনতুষ্টির প্রচারণা চালিয়ে মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার ওপর মনোযোগ দিয়ে তিনি তরুণ ও কর্মজীবী শ্রেণির ভোটারদের একত্রিত করেছেন, যাঁরা নিজেদের শহরেই কোণঠাসা বোধ করছিলেন।
নেদারল্যান্ডস (২০২৩): গির্ট ওয়াইল্ডার্স ও তাঁর দল পিভিভি ঐতিহ্যগতভাবে ইসলাম এবং অভিবাসীবিদ্বেষী ডানপন্থী অবস্থান ছেড়ে গত নির্বাচনে জীবনযাত্রার মধ্যপন্থী বয়ান দিয়ে দেশের বৃহত্তম দল হিসেবে জয়লাভ করে ইউরোপকে চমকে দিয়েছে। যদিও তাঁর মূল বার্তা ছিল ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী, তবু তাঁর সমর্থনের একটি বড় অংশ এসেছিল সেই ভোটারদের কাছ থেকে, যাঁরা জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকটে পিষ্ট হচ্ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে তাঁদের সংগ্রামের প্রতি উদাসীন হিসেবে দেখছিলেন।
ক্ষমতালিপ্সু প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং কেন তারা শেষ পর্যন্ত জনরোষের মুখে পড়ে, তা বোঝার জন্য গবেষক লিয়াম বার্ন জনতোষণবাদী নেতাদের কাজের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন:
১. তোষণ ও শাসন: এই কৌশলের ফলে বিরোধী দল বা জনগণ নতি স্বীকার করে বা হাল ছেড়ে দেয়। কারণ, জনতোষণ এতটাই নিয়ন্ত্রণ সংহত করে যে জনমনে ক্ষমতার ‘অনিবার্যতা’ বা পরিবর্তনের অসম্ভবতার অনুভূতি তৈরি হয়।
২. স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্র ও রাজনীতির সব প্রতিষ্ঠান এবং কাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যা নেতার ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করা নিশ্চিত করে এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণগুলোকে দুর্বল করে ফেলে।
৩. অর্থলিপ্সা: ব্যক্তিগত বা ঘনিষ্ঠদের সুবিধার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও আত্মসাতের ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়।
জনতোষণের এই রাজনীতিকে পরাজিত করার কৌশল লুকিয়ে আছে উল্লিখিত তিন বৈশিষ্ট্যের কারণে সৃষ্ট দুর্বলতা চিহ্নিত করার ওপর। নতুন ধারার আন্দোলন পরিচালনার ধরন ও লিয়াম বার্নের বর্ণিত কাঠামো বিশ্লেষণ করলে জনতোষণের রাজনীতির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি পথ পাওয়া যায়। সফল নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ করা যায়:
বাংলাদেশ তার পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে প্রবেশ করছে ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের দীর্ঘ ছায়ার নিচে, যা মূলত তোষণচক্রকে ভেঙে দিয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী একনায়কতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আগামী নির্বাচনে দেশে নেপালের আরএসপির মতো একটি উল্লেখযোগ্য তৃতীয় শক্তির আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
নিরলস তৃণমূল প্রচারণা: মূলধারার গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধ প্রবেশাধিকার এড়াতে সফল বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আমরা দেখি তৃণমূল পর্যায়ে তাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে। মাজিয়ার হাঙ্গেরির ৯৫ শতাংশ এলাকা পরিদর্শন করেন, যা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের চেয়ে ভোটারদের সঙ্গে অনেক গভীর সংযোগ তৈরি করে।
বিভাজনমূলক ‘সংস্কৃতি যুদ্ধ’ এড়িয়ে চলা: সফল বিকল্প নেতারা পরিচয়ের রাজনীতি বা প্রান্তিক সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলোর তর্কে জড়িয়ে পড়তে অস্বীকার করেন। রাজনৈতিক কেন্দ্রে অবিচল থেকে সর্বজনীন অর্থনৈতিক চাহিদার ওপর মনোযোগ দিয়ে তাঁরা ক্ষমতাসীনদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ কৌশল রুখে দেন।
সহানুভূতির বার্তা: কেবল ভোটারদের ক্রমাগত ভুলের আলাপ তুলে জয় ঘরে তোলা যায় না। এর পরিবর্তে এমন একটি নতুন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যা ক্ষমতার নিষ্পেষণে পিষ্ট মানুষের হতাশাগুলোকে স্বীকার করে এবং একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট ও উন্নততর নীতি প্রস্তাব করে।
ক্যারিশমা ও যোগাযোগ: জনতোষণের রাজনীতিকে পরাজিত করতে সক্রিয় ও আকর্ষণীয় যোগাযোগ প্রয়োজন। একটি ধূসর, গতানুগতিক ও হতাশাজনক বয়ান এই সময়ের ভোটারদের অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ হয়। ভোটাররা এখন বর্তমান অবস্থার একটি দৃশ্যমান আশাব্যঞ্জক বিকল্পের জন্য মরিয়া।
বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাবিরোধী যে মনোভাব দেখা যাচ্ছে, ভারতও এখন তার বাইরে নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির ‘আব কি বার, ৪০০ পার’ স্লোগানটি ছিল একাধিপত্যের এক চূড়ান্ত বার্তা। কিন্তু ফলাফল দেখিয়েছে, মানুষ এখন আর কেবল বড় বড় আদর্শ বা অনিবার্যতার তত্ত্বে সন্তুষ্ট নয়। ভারতের রাজনীতিতে এই নতুন মোড়টি নিচের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে:
১. অনিবার্যতার পতন ও ম্যান্ডেটের ভারসাম্য: হাঙ্গেরিতে যেমন অরবানের দীর্ঘ শাসনের অনিবার্যতা ভেঙেছে, ভারতেও বিজেপি ১০ বছর পর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে (২৪০ আসন)। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির আসন ৬২ থেকে ৩৩–এ নেমে আসা প্রমাণ করে, কোনো দলই অজেয় নয়। স্মৃতি ইরানির মতো হেভিওয়েট নেতার পরাজয় এই বার্তাই দেয় যে অতিমাত্রায় ক্যারিশমা বা হাইপ্রোফাইল ইমেজ শেষ পর্যন্ত জনরোষের কাছে নস্যি।
২. ডালভাতের রাজনীতি বনাম পরিচয়ের রাজনীতি: মোদি সরকার যখন রামমন্দির বা ৩৭০ ধারার মতো বড় বড় ঐতিহাসিক সাফল্যের ওপর ভর করে প্রচারণা চালিয়েছে, ভোটাররা তখন কর্মসংস্থান আর দ্রব্যমূল্যের সুরাহা খুঁজেছেন। খোদ অযোধ্যায় বিজেপির পরাজয় একটি বড় রাজনৈতিক বাঁক নির্দেশ করে। এটি বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষ কেবল ধর্মীয় আবেগ দিয়ে পেট ভরাতে চায় না। মানুষের পকেটের খবর এখন বড় বড় আদর্শিক বুলির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
৩. অধিকার ও সংবিধান রক্ষা: লিয়াম বার্নের স্বৈরতন্ত্র তত্ত্বে যেমন বলা হয়েছে, শাসকেরা যখন ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান তখন মানুষ ভীত হয়। বিরোধী দলগুলোর ‘সংবিধান বাঁচাও’ প্রচারণা এবং ৪০০ আসন পেলে বিজেপি সংবিধান বদলে দিতে পারে, এই ভয়টি দলিত ও অনগ্রসর ভোটারদের মধ্যে গভীরভাবে কাজ করেছে। মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানের মতো রাজ্যে বিজেপির বড় ধাক্কা খাওয়ার পেছনে এই অধিকার হারানোর ভয়টিই ছিল প্রধান কারণ।
৪. জবাবদিহির নতুন ক্ষেত্র: ভারতের ভোটাররা এখন সরাসরি পরিষেবার হিসাব চাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো বিজেপির শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী প্রচারণাকে রুখে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ভোটাররা এখন আর অমূর্ত প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং সরাসরি জীবনযাত্রার মান উন্নয়নকারী পদক্ষেপে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশ তার পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে প্রবেশ করছে ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের দীর্ঘ ছায়ার নিচে, যা মূলত তোষণচক্রকে ভেঙে দিয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী একনায়কতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আগামী নির্বাচনে দেশে নেপালের আরএসপির মতো একটি উল্লেখযোগ্য তৃতীয় শক্তির আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা প্রথাগত প্রধান দলগুলোর বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে বীতশ্রদ্ধ, তারা সম্ভবত এমন নেতাদের দাবি করবে যাঁরা বংশগত আনুগত্যের চেয়ে স্বচ্ছ রাজনীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতিনিধিত্ব করবেন। মুদ্রাস্ফীতির তীব্র চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে সেই প্রচারণাই জয়ী হবে, যা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অর্থলিপ্সা বা পদ্ধতিগত ব্যাংকিং দুর্নীতি ও অর্থ পাচার মোকাবিলা করতে পারবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি আকর্ষণীয় তৃণমূল দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে পারবে। হাঙ্গেরির মাজিয়ার ইফেক্ট এখানে এমন একজন নেতার চাহিদা হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে, যিনি কারিগরিভাবে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো তুমুল জনপ্রিয়তার অধিকারী।
নেপাল, শ্রীলঙ্কা, হাঙ্গেরি, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সাধারণ সূত্র হলো, অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে টিকে থাকাই এখন চূড়ান্ত আদর্শে পরিণত হয়েছে।
একটি দল মধ্যবাম নাকি ডানপন্থী, তা আধুনিক ভোটারের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই দলটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বর্তমান ব্যবস্থাকে ভাঙতে কতটা সক্ষম। অর্থলিপ্সা থেকে মুক্ত থেকে, তোষণ এবং অনিবার্যতার ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে ও তৃণমূল সহানুভূতি আদায় করে জনপ্রিয় নতুন নেতারা এটাই প্রমাণ করছেন যে জীবনযাত্রার মানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত রাজনীতির কাছে সর্বময় শক্তিশালী স্বৈরাচারী ব্যবস্থাও পরাজিত হতে পারে এবং এটিই এখনকার বাস্তবতা।
সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কর্মী
ই-মেইল: hasibh@gmail.com