মতামত

এআই ও ডিপফেক কীভাবে নির্বাচনে ‘আতঙ্ক’ হতে পারে

এআই ও ডিপফেক কীভাবে নির্বাচনে আতঙ্ক হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে লিখেছেন মো. মিজানুর রহমান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বর্তমান যুগের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি মানুষের মতো চিন্তাভাবনা, শেখার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনুকরণ করে কাজ করতে সক্ষম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাজে উন্নয়ন ও সুবিধা এনে দিচ্ছে, তবে এর অপব্যবহারও বিভিন্ন জটিল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তথ্যের সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর ব্যবহারে ঝুঁকি রয়েছে।

নির্বাচন, ব্যবসা, চিকিৎসাক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার বিভ্রান্তি, ক্ষতি এবং নৈতিক ও সামাজিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিপফেক (সত্যের অবিকল নকল) প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসাক্ষেত্রে ভুল তথ্য প্রচার করার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে দেখা গেছে।

অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধি ব্যবহার করে জালিয়াতিরও বড় ধরনের উদাহরণ পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী ডিপফেক প্রতারণায় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কণ্ঠ ও ভিডিও নকল করে কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব কৌশল শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি সৃষ্টি করেনি, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও ক্ষুণ্ন করেছে।

২.

বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেমন সমাজকে বদলে দিয়েছে, তেমনই তা নির্বাচনী রাজনীতিতেও একটি নতুন অধ্যায় খুলছে। ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যন্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে রাজনৈতিক প্রচারণা এখন শুধু মঞ্চ বা প্রচারপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধির সহায়তায় গঠিত ভুয়া ভিডিও, ভুয়া পোস্ট এবং মনগড়া প্রচারাভিযান ভোটার মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি সমসাময়িক রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জেনারেটেড কনটেন্ট একটি বড় বিপদ হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা ভোটারদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং এটি গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভুয়া তথ্য নির্বাচনের সময় ভোটারদের ভুল দিশা দিতে ও জনমতকে গঠন বা বিপথগামী করতে ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালিত যন্ত্র এবং ভুল তথ্য প্রচারের প্রভাব ব্যাপক আলোচনা হয়েছে; ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক ভিডিও ও মিথ্যা পোস্টের দেখা মিলেছে। এটি ভোটের আস্থা ও গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার ওপর প্রভাব ফেলেছে।

২০২৩ সালের স্লোভাকিয়ার সংসদীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের নেতার কণ্ঠ নকল করে তৈরি করা ভুয়া অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাইমারি নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধি উৎপন্ন রোবোকল ব্যবহার করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে ভোটের তারিখ বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিচালিত চ্যাটবট ব্যবহার করে ভোটারদের ভুল নির্দেশনা প্রদানের প্রমাণও মিলেছে। এটি সাধারণ ভোটারদের আচরণ ও অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। সাধারণত এসব কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে বাস্তব এবং মিথ্যা তথ্যের পার্থক্য অস্পষ্ট করে দেয়। ফলে নির্বাচন সম্পর্কে ভুল বোঝাপড়া তৈরি হয়।

জার্মান সংস্থা কনরাড অ্যাডেনয়ার ফাউন্ডেশনের (কেএএস) গবেষণামতে, বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় ডিপফেকের অনেক ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, জাম্বিয়া, ফ্রান্স উদাহরণ অনেক।

অতিসম্প্রতি মলদোভায় ২০২৫ সালের পার্লামেন্টারি নির্বাচনের আগে বড় পরিমাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সরকারের বিরুদ্ধে জনমত ঘুরিয়ে দেওয়া এবং এক হাজারের বেশি ইউটিউব চ্যানেল, টিকটক ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ক্রেমলিন–সমর্থিত প্রোপাগান্ডা ছড়ানো যায়।

এর মতো সমন্বিত ‘এনগেজমেন্ট ফার্ম’ ভোটারদের ভুল ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করেছে এবং দেশটির ইউরোপীয় সমর্থক দল পাসের প্রতি আস্থা কমানোর চেষ্টা চালানো হয়েছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধার একটি আসনে ডিপফেক ভিডিও প্রচার করে প্রার্থীকে মিথ্যাভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়া, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও প্রার্থী পরে জয়লাভ করেছিলেন, তবু সেই মুহূর্তে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভুল তথ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভোটাররা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়তে পারেন।

এতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হ্রাস পেতে পারে, ভোটাধিকার পরিত্যাগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে বা ভোটদান সম্পর্কে সংশয় তৈরি হতে পারে। ভুল তথ্যের কারণে রাজনৈতিক দৃশ্যপট এমনভাবে বাঁক নিতে পারে যে বাস্তব বিষয়ের বদলে ভুল তথ্য প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক ভুল তথ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিকৃত করার ঘটনা প্রমাণ করে প্রযুক্তির অপব্যবহার করলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

৩.

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এবং ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহার ২০২৪ সালে যে মাত্রায় ছিল, তার চেয়ে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে এটি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিসমিসল্যাবের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে কৃত্রিম বুদ্ধি জেনারেটেড ভিডিও ও ছবি ব্যবহারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

১ হাজার ৩৬১টির বেশি অনন্য ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় এক হাজার ঘটনা ছিল রাজনৈতিক বিষয়। একটি লক্ষ্যভিত্তিক ভুল তথ্যের উদাহরণ হলো এমন একটি ফটোকার্ড, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে দাবি করেছিল যে গণ অধিকার পরিষদের নেতাকে নিয়ে মিথ্যা বক্তব্য বলা হয়েছে, যা পরে তথ্য যাচাই দ্বারা খণ্ডিত হয়।

ফ্যাক্টওয়াচ-এর রিপোর্টেও দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি ডিপফেক ভিডিও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে বা প্রশাসনিক ব্যক্তিদের নামে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে প্রচার করা হচ্ছে।

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিচালিত ভিডিওগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য বদলানো হয়েছে, যা বিভ্রান্তি ও বিভাজন তৈরি করছে।

রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিজেদের প্রচারণায় তথ্য যাচাই, অফিশিয়াল ডিজিটাল চ্যানেল স্পষ্ট করা এবং সন্দেহজনক কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত অবস্থান নেওয়া জরুরি। আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত সাইবার ও কৃত্রিম বুদ্ধি ফরেনসিক ইউনিট গঠন, যা দ্রুত ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত, উৎস ট্র্যাক ও অপসারণে সক্ষম হবে।

একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ‘ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা’ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ভুল তথ্য বা কৃত্রিম বুদ্ধি জেনারেটেড কনটেন্টের উদ্দেশ্য সাধারণত ভোটার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি, প্রতিপক্ষের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, বিভাজন ও উত্তেজনা তৈরি করা এবং নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ে জনমতকে ভুলভাবে গঠন করা, যা একটি সুষ্ঠু ও ন্যায্য নির্বাচনকে বিপন্ন করে। এ পরিস্থিতির মোকাবিলায় বাংলাদেশে একটি বহুমাত্রিক সমাধান প্রয়োজন।

প্রথমত, তথ্য যাচাই প্ল্যাটফর্ম ও সত্য যাচাই উদ্যোগগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভোটাররা দ্রুত কোন তথ্য ভুল, তা যাচাই করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভুল তথ্য শনাক্তকরণ ও আইনি ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হতে হবে। এর অংশ হিসেবে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ বা ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা ইতিমধ্যে উত্থাপিত হয়েছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বচ্ছ প্রচারণা ও ডিজিটাল নৈতিকতা মেনে চলতে হবে, ডিপফেক বা মনগড়া তথ্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

চতুর্থত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ভুল তথ্য প্রতিরোধ ও তথ্যনির্ভর রিপোর্টিংয়ে জোর দিতে হবে। নাগরিকদের নিজেদেরই উচিত সামাজিক মিডিয়ায় যেকোনো বিতর্কিত কনটেন্ট দেখলে দ্রুত সত্য যাচাইয়ের দিকে মনোযোগী হওয়া এবং ভুল তথ্য না ছড়ানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা যুব সংগঠনগুলো ভুল তথ্য শনাক্তকরণ প্রশিক্ষণ দিতে পারে, যাতে তরুণ ভোটাররা ডিজিটাল বিশ্লেষণে দক্ষ হন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, নির্বাচনী আইন ও উপযুক্ত বিধানগুলোর সমন্বয়ে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে যেন কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক ভুল তথ্য ছড়ানো কঠোরভাবে দণ্ডনীয় হয়। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে এ ধরনের ভাবধারার কারণে যদি ভোটারদের ওপর ভুল তথ্য পৌঁছায় ও জনমত বিকৃত হয়, তবে তা শুধু নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাই সময়মতো উচ্চ স্তরের প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার বিকাশ অপরিহার্য।

শেষ পর্যন্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক প্রযুক্তির অপব্যবহার থেকে নিরাপদ রাখার চাবিকাঠি হলো তথ্যসচেতনতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, শক্তিশালী আইনগত কাঠামো এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও ন্যায্য নির্বাচন নিশ্চিত করবে।

৪.

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার রোধে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে প্রথমত সরকার ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক ভুয়া তথ্য, গভীর মিথ্যা ও ডিজিটাল প্রতারণাকে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে।

নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের করণীয় হলো নির্বাচনী আচরণবিধিতে কৃত্রিম বুদ্ধি ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছ নির্দেশনা যুক্ত করা এবং প্রার্থী ও দলগুলোকে লিখিতভাবে ভুয়া তথ্য বা ডিপফেক ব্যবহার না করার অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা।

রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিজেদের প্রচারণায় তথ্য যাচাই, অফিশিয়াল ডিজিটাল চ্যানেল স্পষ্ট করা এবং সন্দেহজনক কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত অবস্থান নেওয়া জরুরি। আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত সাইবার ও কৃত্রিম বুদ্ধি ফরেনসিক ইউনিট গঠন, যা দ্রুত ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত, উৎস ট্র্যাক ও অপসারণে সক্ষম হবে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও নাগরিক সমাজের উচিত সমন্বিত তথ্য যাচাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি জোরদার করা। এতে সাধারণ মানুষ নিজেই ভুয়া ও সত্য তথ্যের পার্থক্য করতে পারে। এই সব পক্ষের সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপই কেবল কৃত্রিম বুদ্ধির অপব্যবহার রোধ করে সমাজ, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধির অপব্যবহার রোধে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রথমত, এরা কৃত্রিম বুদ্ধিভিত্তিক ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ভিডিও ও ডিজিটাল প্রতারণাকে শনাক্ত এবং তদন্ত করার জন্য বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠন করতে পারে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করবে। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক মামলা পরিচালনা করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ জনগণকে সতর্ক করা সম্ভব।

পরিশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশ দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে স্বৈরাচারের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিল। এখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ এসেছে। কিন্তু যদি কৃত্রিম বুদ্ধি ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হয়ে পড়ে, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, ভোটারের আস্থা এবং সামাজিক সমন্বয় ক্ষুণ্ন হতে পারে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ সমস্যা মোকাবিলায় তথ্য যাচাই প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করা, নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমকে স্বচ্ছতা ও নৈতিক প্রচারণা অনুসরণে বাধ্য করা দরকার। এ ছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নির্বাচনী আইন সমন্বিত কার্যকর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

  • ড. মো. মিজানুর রহমান অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব