
কয়েক দিন আগে প্রথম আলোর ভিডিও বিভাগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামে অসাবধানতাবশত ‘কথিত’ শব্দটি বন্দিশালার আগে যুক্ত হয়ে যায়। ছাপা পত্রিকা ও অনলাইনে মূল প্রতিবেদনের কোথাও এই শব্দটি না থাকলেও ভিডিও স্টোরির শুধু শিরোনামে এসেছিল, এবং প্রকাশের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রথম আলো শব্দটি প্রত্যাহার করে নেয়।
পরবর্তী সময়ে পাঠকদের জন্য একটি সংশোধনীও প্রকাশ করা হয়, যা পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক ব্যাকরণ অনুসরণ করেই করা হয়েছিল। তবে এই ভুলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু আলোচনার সৃষ্টি হয়। পত্রিকাটির শুভাকাঙ্ক্ষী ও পাঠকদের একাংশ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা লক্ষ করেন, যদিও সংশোধনীতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, অতীতে কোনো প্রতিবেদনে বন্দিশালার আগে ‘কথিত’ শব্দ যুক্ত করা হয়নি।
প্রথম আলোর সংশোধনী দেওয়ার পরও জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মন্তব্য করেন, ‘আমরা একটি বোকামি করি, যখন যার ওপর রাগ হয়, গিয়ে হামলায় পড়ি, তার অফিসটা ভাঙি। লাভ হয় কোনো কিছু? সে এই ভাঙা অফিস দেখিয়ে, ওই যে ফকির যেমন ঘা দেখিয়ে টাকা তোলে, সে এই ভাঙা অফিস দেখায়ে আরও একটু মানুষের কাছে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম আলোর বিকল্প নেই? আপনারা এই পত্রিকা কিনবেন না, আপনাদের কোনো আত্মীয়স্বজনের বাসায়, অফিসে এই পত্রিকাটি রাখতে দেবেন না। তাদের সার্কুলেশন কমান। তাদের ওয়েবসাইটে যাবেন না। বিকল্প তৈরি হবে এইভাবেই।’
এই বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিক সমাজে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে গণমাধ্যম বর্জনের প্রকাশ্য আহ্বান জানানো কতটা যৌক্তিক এবং সংবাদমাধ্যম পোড়ানোর মতো সহিংস ঘটনাকে এভাবে লঘু করে দেখানো কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয়?
একজন আইনপ্রণেতা জনপরিসরে একটি পত্রিকা না কেনার আহ্বান করছেন, সেটি দোষের কিছু নয়। তিনি কিংবা তাঁর দল ব্যক্তিগতভাবে প্রথম আলো না পড়তে পারেন, না কিনতে পারেন, পাঠক হিসেবে এটি তাঁদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অতীতে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রায় একই সুরে কথা বলেছিলেন এবং সে সময়ে সরকারি কার্যালয়ে প্রথম আলো রাখার ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে জানা যায়।
যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রথম আলো তাদের কাছে ভালো নয়; এখন মারদিয়া মমতাজের দল জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে, এরপরও তারা বলছে প্রথম আলো কিনো না। প্রশ্ন হলো, প্রথম আলোকে কেন তারা ভয় পায়?
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথম আলো পড়েন না বলে ঘোষণা দিলেও পত্রিকাটির পাঠক কখনো পত্রিকা পড়া থেকে বিরত থাকেননি। তেমনি জামায়াতের এমপি প্রথম আলো না পড়লেও পাঠক তাঁর নিজস্ব বিচার-বিবেচনা বোধ হারাবেন বলে মনে হয় না। কারণ, দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও প্রথম আলো জামায়াত, বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ—এ ধরনের কোনো দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠেই ধারাবাহিকভাবে সাংবাদিকতা করে গেছে। পত্রিকাটি যথাযথ সাংবাদিকতা ও গণমানুষের অবস্থান তুলে ধরতে না পারলে কখনো এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেত বলে মনে হয় না।
জামায়াতের নারী সংসদ সদস্যের বক্তব্যের প্রকৃত উদ্বেগের জায়গাটা ভিন্ন। এই সংসদ সদস্য দেশের গণমাধ্যম পোড়ানোকে যেভাবে অবজ্ঞা করেছেন, যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন, তা এককথায় অগ্রহণযোগ্য। গত বছরের ডিসেম্বরে দেশি ও প্রবাসী ইউটিউবারদের উসকানিতে সংঘবদ্ধ ও চিহ্নিত একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী একদল মানুষ যখন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আগুন দেয়, সারা দেশের মানুষ তখন বিষয়টিকে ঘৃণার চোখে দেখছে। এখন জাতীয় সংসদের একজন সংসদ সদস্য যখন জনসমক্ষে বলেন, ‘আমরা একটি বোকামি করি, যখন যার ওপর রাগ হয়, গিয়ে হামলায় পড়ি, তার অফিসটা ভাঙি, কোনো লাভ হয় না বলে আফসোস করি’—তখন, সহজে প্রশ্ন তৈরি হয়, এই ‘আমরা’ আসলে কারা?
এই আমরা কি জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠনের কেউ? তিনি কাদের উদ্দেশে ওই শব্দটি ব্যবহার করেছেন? গত ডিসেম্বরে প্রথম আলো ভবন পোড়ানোর সময় ইসলামী ছাত্রশিবির ও রাকসুর কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আগুনের ঘটনায় তাঁদের কারও কারও সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়। এই প্রেক্ষাপটে একজন সংসদ সদস্যের মুখে ‘আমরা হামলায়ে পড়ি’ এমন শব্দচয়ন স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সন্দেহের জন্ম দেয়।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, পত্রিকার কার্যালয় পোড়ানোর পর সেই পোড়া ক্ষত দেখতে যখন সাধারণ মানুষ ও সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি প্রথম আলো কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, তখন সেই সহমর্মিতাকে এই সংসদ সদস্য বর্ণনা করেছেন ‘সহানুভূতি আদায়’ হিসেবে, এবং অত্যন্ত অসম্মানজনক ভাষায় বলেছেন, ‘ফকিরের মতো ঘা দেখিয়ে’। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মুখে এমন উপমা রীতিমতো আমাদের হতবাক করে। এখানে উল্লেখ্য যে জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও আগুনে পোড়া প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন। এখানে এটাও জানিয়ে রাখা যায় যে মারদিয়া মমতাজ নিজেও একসময় প্রথম আলোতে লেখালেখি করেছেন।
যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রথম আলো তাদের কাছে ভালো নয়; এখন মারদিয়া মমতাজের দল জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে, এরপরও তারা বলছে প্রথম আলো কিনো না। প্রশ্ন হলো, প্রথম আলোকে কেন তারা ভয় পায়?
গত ১৫ বছর তারা কোন পত্রিকার খবর পড়ত? এখনো তো সংসদে আলোচনায় তারা প্রথম আলোর খবর নিয়ে সরকারের সমালোচনা করে। একটি ফটোকার্ডের সূত্রে আওয়ামী লীগ প্রথম আলোর সাভার প্রতিনিধিকে জেলে পুরেছিল, সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিল। পত্রিকার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে দলীয় বুদ্ধিজীবীদের মাঠে নামিয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গণ–অভ্যুত্থানের পর যে সেই একই পথের সূচনা ঘটালেন একজন সংসদ সদস্য।
আমি জানি না, এই সংসদ সদস্যের এসব কথাবার্তা জামায়াতের দলীয় অবস্থান কি না। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি যদি এসব কথা বলেও থাকেন, তাহলে আমরা বলতে পারি, তিনি সাংবাদিকতার বেসিক নর্ম বোঝেন না কিংবা বুঝলেও সমালোচনা করতে হবে বলে পত্রিকার সমালোচনায় নেমেছেন। মানুষের ভুল হয়, যন্ত্রের ভুল হয়, সেই ভুলকে স্বীকার করে নেওয়া, সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার পরিচয়। প্রথম আলো সেই দায়িত্বশীল ভূমিকাই পালন করেছে। শুধু তা–ই নয়, তারা এই ভুলটি স্বীকার করে এর ব্যাখ্যাও দিয়েছে। একটি সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রথম আলো এখানে পেশাদারির পরিচয় দিয়েছে।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জনসমক্ষে কোনো সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে সমালোচনা করার অধিকার তাঁর রয়েছে। কিন্তু সেই সমালোচনায় যখন সহিংসতাকে লঘু করে দেখানো, সহমর্মিতাকে কটাক্ষ করা এবং অস্পষ্ট ‘আমরা’ শব্দের আড়ালে দায় এড়ানোর প্রবণতায় রূপ নেয়, তখন তা নিছক রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকে না, বরং তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
একজন সচেতন পাঠক ও নাগরিক হিসেবে এই ধরনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা এবং জবাবদিহি দাবি করা তাই অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, মারদিয়া মমতাজের এই বিষোদ্গারমূলক বক্তব্যের দায়ভার কি জামায়াতে ইসলামী নেবে?
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
nadim.ru@gmail.com