গত বছর বড়দিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন দেশে ফেরেন, তখন তিনি ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শিরোনামে এক অল্প সময়ের বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তখন কিছু উগ্রবাদী শক্তি বাদে আর বাকি সব আতঙ্কিত মানুষই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসুক, সেটাই চেয়েছিলেন।
তারেক রহমান মানুষের এই সঠিক মনোভাব ধরতে পেরেছিলেন বলেই তিনি এক ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জনতার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার সুরটি ধরতে পারাই রাজনীতিতে সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমান পরিপক্বতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তবে তাঁর ‘প্ল্যান’ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা এখনো মানুষ পায়নি।
নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করে একটি সতর্ক অর্থনীতির বিনির্মাণই হওয়া উচিত সেই পরিকল্পনার প্রধান কর্মসূচি। বিক্ষিপ্ত ইতিহাসগত বিতর্ক সৃষ্টি করলে অর্থনীতির জরুরি বিবেচনাগুলোকে পেছনের বেঞ্চে ঠেলে দেওয়া হয়। এগুলো করলে শেষতক একজন ‘গ্লোবাল সেলিব্রিটি’র শাসনামলও যে অর্থনীতিকে বিপন্ন করতে পারে, তার প্রমাণ গত দেড় বছরেই আমরা পেয়েছি।
বিএনপি শুরুতেই সে পথে এগোলে ভুল করবে। প্রতিহিংসায় আবিষ্ট হলে মামলার সংখ্যা হয়তো জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু এতে সুবিচার বা ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়বে না। বিনিয়োগ থমকে যাবে। বাড়বে বেকারত্ব।
আওয়ামী আমলের শেষ ‘দরবেশ যুগ’ থেকে বিএনপি যেমন শিক্ষা নিতে পারে, তার চেয়েও শতগুণ বেশি শিক্ষা নিতে পারে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘মব যুগ’ থেকে। প্রথমটি অর্থনীতি খেয়েছে ভেতর থেকে, পরেরটি কামড় দিয়েছে বাইরে থেকে—একেবারে প্রকাশ্যে। দুটিই পরিত্যাজ্য।
অর্থনীতিতে অলিগার্করা থাকবেন সহকর্মী হিসেবে—নীতিনির্ধারক হিসেবে নন। চীনের ধনকুবেররা সে দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং বিপ্লবের কুশীলব। কিন্তু কমিউনিস্ট শাসকেরা তাঁদের নীতির রেললাইনে চালিত করেন। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কিছু করলে পাসপোর্ট বাতিল করেন, খেলাপি হলে রাস্তার মোড়ে বিলবোর্ডে ছবি টাঙিয়ে দেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামও এই নীতি দৃঢ়তার সুফল পেয়েছে।
জ্বালানিসংকট নিরসনে প্রয়োজনে ‘ঘর থেকে কাজ’ পদ্ধতি বের করতে হবে। ঘড়ির সময়কে অন্তত আধা ঘণ্টার জন্য স্থায়ীভাবে এগিয়ে আনতে হবে। রাজস্ব বর্ষ মিশে যাক ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে। আলাদা রাজস্ব মন্ত্রণালয় হওয়া উচিত। মেট্রোরেলের প্রসার ছাড়া যানজটের অবসান হবে না।
২০২৪ সালে ভিয়েতনামের বিলিয়নিয়ার মাই লানের ফাঁসির আদেশ হয় ব্যাংক থেকে অর্থ লুটের কারণে। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী হইচই শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক রেডিওতে শুনলাম এক আলোচনা। একজন ভিয়েতনাম–বিশেষজ্ঞ বললেন, এটি এক কড়া বার্তা যেন অন্যরা ব্যাংক লুটতে আর আগ্রহী না হন। মাই লান বলেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।’ তিনি নিজের সব সম্পদ উজাড় করে রাষ্ট্রকে দিলেন। বিচারক দয়ার্দ্র হৃদয়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে ‘লাল ভাত’ খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। সুবিচার ও আইনের গতিময়তা একটি সতর্ক অর্থনীতির পূর্বশর্ত।
সেই থেকে আর কোনো বড় ‘মাই লানের’ জন্ম ভিয়েতনামে হয়নি। তাদের অর্থনীতিও ভালো করছে। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার আগে, অর্থাৎ ২০১৪ সালের আগে বিশ্বদরবারে ভারত ছিল দশম বৃহত্তম অর্থনীতি। সেখানে টাইকুনেরা ধন বাড়ায়, কিন্তু নীতিনির্ধারণে মাতব্বরি করতে পারে না।
আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে হার্ভার্ডের অধ্যাপক গীতা গোপীনাথ মনে করেন, ২০২৮ সালেই ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে উন্নীত হবে। সবই সম্ভব হয়েছে আইনজ্ঞ ও অর্থবিশেষজ্ঞদের পরামর্শে রাজনীতিকদের নীতিনির্ধারণী সক্ষমতার কারণে। বিএনপিকে তা করে দেখাতে হবে। এখানে নীতিনির্ধারণে দরবেশ, ব্যাংকখেকো বা ভূমিপ্রেমিক—কারও জায়গা হবে না। এটিই হচ্ছে একটি সতর্ক অর্থনীতি গড়নের পূর্বপাঠ।
অধ্যাপক ইউনূসের শাসনামল না এলে আমরা বুঝতেই পারতাম না যে অদূরদর্শিতা কাকে বলে। শেখ সাদি বলেছেন, আদবহীনকে দেখেই আদব শিখে নিতে হয়। প্রবাদে বলে, সব ভালো যার শেষ ভালো তার।
‘শান্তিতে নোবেলজয়ী’ ইউনূস নির্বাচন দিলেন বটে; কিন্তু সেটিকে সর্বদলীয় করলেন না। ঝুঁকিটা দিয়ে গেলেন অন্যের কাঁধে। মাত্র কয়েক দিন আগে তড়িঘড়ি করে যে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি করে গেলেন, তাতে গোপনীয়তার আড়ালে দেশের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগত সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করলেন।
বন্দর নিয়ে চুক্তিগুলোয় অধ্যাপক ইউনূসের অতি আগ্রহ সন্দেহজনক। এতে তাঁর নিজস্ব গোষ্ঠীর আত্মস্বার্থের উপস্থিতি সংশয়াতীত নয়। দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিপরীতে তাঁর অস্ত্রচুক্তির উৎসাহ একজন অস্থির শেয়ারবাজারির আচরণের সমতুল্য। বিএনপি সরকারকে এসব অসতর্ক ও অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপের বিপরীতে হাঁটতে হবে।
হাসিনা সরকার ১৫ বছরে বিদেশি ঋণ বাড়িয়েছে প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার। এ তহবিল দিয়ে তারা বিস্তর মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর অনেকগুলোই আজ দৃশ্যমান; যদিও এগুলোয় অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতি ঘটেছিল।
২০২৬ সালের নির্বাচিত বিএনপি সরকার আগের ১৯৯১ বা ২০০১-এর বিএনপি সরকার থেকে আলাদা হবে—এটিই মানুষের প্রত্যাশা। নির্বাসিত ১৭ বছরের জীবনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটি আধুনিক অর্থনীতি ও পশ্চিমা গণতন্ত্র থেকে শিক্ষালাভ করেছেন কি না, সেটি তাঁকে কাজে প্রমাণ করতে হবে।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি ঋণ বাড়িয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তার বিনিময়ে দৃশ্যমান কোনো বড় প্রকল্প দেখাতে পারেনি। বাজেটের প্রায় পুরোটাই গিয়েছে পরিচালনগত ব্যয় মেটাতে। উন্নয়ন ব্যয় অনুল্লেখ্য। এটি অদক্ষতা ও অপচয়ের বাতিক। ইউনূস সরকারের অর্থ উপদেষ্টা দায়িত্ব শেষ করে বণিক বার্তা পত্রিকায় দাবি করেছেন, ‘জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত এড়িয়ে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে জোর দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।’ কেউ কেউ বলেন, তিনি আত্মপ্রশংসা করে থাকেন।
প্রয়োজনীয় একটি সেতু বানালে তা জনদুর্ভোগ কমায়। এতে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা বাড়ে। এটি জনতুষ্টিমূলক হলে দোষের কী? বিএনপি দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু বানানোর চিন্তা করছে। এটি একই সঙ্গে জনতুষ্টিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের সহায়ক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার জনতুষ্টিমূলক প্রকল্প গ্রহণ করবে—এটি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ইউনূস সরকার জনতুষ্টি কিংবা জাতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের কথা ভাবলে গোপন চুক্তিগুলো করত না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বৃদ্ধিই সাক্ষ্য দেয় যে সেই সরকার জবাবদিহির ধার ধারেনি। শুধু ঘন ঘন ভাষণ দিলেই একে জবাবদিহি বলে না। স্বল্পমেয়াদি সমস্যা সমাধানে অপারগ সরকার কখনো জাতিকে দীর্ঘ মেয়াদের স্বপ্ন দেখিয়ে শান্ত রাখতে পারে না। বিএনপি সরকারের উচিত প্রথমেই সতর্কভাবে স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা।
এর জন্য প্রয়োজন একটি টাস্কফোর্স, যেখানে অর্থনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক। বিএনপি সরকারের উচিত হবে পয়সা দিয়ে হলেও একদল অর্থনীতিবিদকে নিযুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ওপর একটি অর্থনৈতিক মূল্যায়নের গবেষণা প্রতিবেদন রচনা করা। এটি নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে। অর্থনীতির পথচলায় সতর্কতা বাড়াবে।
২০২৬ সালের নির্বাচিত বিএনপি সরকার আগের ১৯৯১ বা ২০০১-এর বিএনপি সরকার থেকে আলাদা হবে—এটিই মানুষের প্রত্যাশা। নির্বাসিত ১৭ বছরের জীবনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটি আধুনিক অর্থনীতি ও পশ্চিমা গণতন্ত্র থেকে শিক্ষালাভ করেছেন কি না, সেটি তাঁকে কাজে প্রমাণ করতে হবে।
একটু ভিন্নধর্মী চিন্তা তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে, এই মর্মে যে আমাদের সরকার উন্নত দেশের পথে হাঁটছে। উদাহরণস্বরূপ, এই প্রযুক্তির যুগে সাপ্তাহিক ছুটি কেউ কমায় না; বরং বাড়ায়। জ্বালানিসংকট নিরসনে প্রয়োজনে ‘ঘর থেকে কাজ’ পদ্ধতি বের করতে হবে। ঘড়ির সময়কে অন্তত আধা ঘণ্টার জন্য স্থায়ীভাবে এগিয়ে আনতে হবে। রাজস্ব বর্ষ মিশে যাক ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে। আলাদা রাজস্ব মন্ত্রণালয় হওয়া উচিত। মেট্রোরেলের প্রসার ছাড়া যানজটের অবসান হবে না। উগ্রবাদী মনোভাবের তোষণ পৃথিবীর কোনো অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি। নারীদের সব কর্মে ন্যায্যতার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জাতীয় দর্শন সুনির্দিষ্ট করে এবং কৌশলগত ও বাণিজ্যগত স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রীয় সম্পর্কগুলো মেরামত করে এগিয়ে যেতে হবে। এগুলোই একটি সতর্ক অর্থনীতি গড়ার মূলমন্ত্র।
ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক
মতামত লেখকের নিজস্ব