রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন লোকপ্রশাসন। প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন জনপ্রতিনিধি। জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের একটি মাধ্যম হলো এমন একটি সাধারণ নির্বাচন, যাতে গণমতের ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটে। ইসলাম জনমত ও সাধারণের পরামর্শকে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়।
মুমিনদের গুণাবলি সম্পর্কে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘...আর যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তারা পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিকে তাদের কর্মসমূহ সম্পাদন করে এবং তাদের আমি যে রিজিক দিয়েছি তা কল্যাণার্থে ব্যয় করে।’ (সুরা-৪২ শুরা, আয়াত: ৩৭-৩৮)
মতামত প্রকাশের একটি পদ্ধতি হলো ভোট। ভোট প্রদানের মানে হলো সাক্ষ্য দেওয়া, সুপারিশ করা, প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব অর্পণ করা। আপনার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের দায়ভারও আপনার। আপনি সৎ ও যোগ্য লোককে নির্বাচিত করলে এর জন্য আপনি যেমন পুরস্কৃত হবেন, তেমনি কোনো অযোগ্য ও অসৎ লোককে নির্বাচিত করলে তার কর্মকাণ্ডের দায়ও আপনার ওপর বর্তাবে। এ জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সতর্ক ও সুবিবেচক হতে হবে। অযোগ্য ও অসৎ কাউকে ভোট দিলে তার মানে হবে অন্যায়ের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা তার পক্ষে সুপারিশ করা।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যে লোক সৎ কাজের জন্য কোনো সুপারিশ করবে, তার সুফল থেকে সে–ও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক মন্দের পক্ষে সুপারিশ করবে তার পাপের বোঝার একটি অংশ সে–ও পাবে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৮৫)।
ভোট যেহেতু পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব, সেহেতু কোরআন করিমের এই ঘোষণাকেও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতগুলো প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।
হজরত আবু বকর (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একদা এক জায়গায় হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় সাহাবিদের তিনবার জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি তোমাদের কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে বড় কবিরা গুনাহের কথা বলব?” সাহাবিরা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেওয়ার পর তিনি বললেন, “আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা।” এরপর তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, “শুনে নাও! মিথ্যা সাক্ষ্য অনেক বড় কবিরা গুনাহ।” (বুখারি)। নবী করিম (সা.) বলেন, “মিথ্যা সাক্ষ্য শিরকের সমতুল্য অপরাধ।” (তিরমিজি)
ভোট নাগরিক অধিকার। কারও ব্যাপারে যদি খোদাদ্রোহ, ইসলামবিরোধিতা, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থবিরোধী হওয়ার সুস্পষ্ট আলামত থাকে, তাহলে ওই অসৎ ব্যক্তি বা প্রার্থীর বিজয় ঠেকানোর চেষ্টাও করতে হবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন কোরো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা করো, আল্লাহ–তাআলা সে সম্পর্কে জ্ঞাত।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৮৩)
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত! মানবতার কল্যাণে তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে—তোমরা সৎ কাজে আদেশ দেবে, মন্দ কাজে নিষেধ করবে; আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখবে।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
অযোগ্য লোককে জনগণের প্রতিনিধি বানালে যোগ্য লোক বঞ্চিত হয়, অযোগ্যদের উত্থান ঘটে। দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দখলদার, মজুতদার, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, ব্যাংক লুটকারী, কালোটাকার মালিক, অর্থ পাচারকারী, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী, নারী নির্যাতনকারী ও শোষকদের ক্ষমতায়ন হয়।
দেশ, জাতি, সমাজ ও জনগণের স্বার্থে সুচিন্তিত রায় প্রদান অপরিহার্য। ভালো-মন্দের মধ্যে অবশ্যই ভালোকে বেছে নিতে হবে। যদি ভালো না থাকে, তবে যে একটু কম খারাপ, সাময়িকভাবে তাকে গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভোটদানের অর্থ হবে, ‘এই সাক্ষ্য দেওয়া যে লোকটি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো।’
শরিয়তের পরিভাষায়, ‘আখাফফুল বালিয়্যাতাঈন’ অর্থাৎ মন্দের ভালো বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকে বেছে নেওয়া এবং অধিক ক্ষতি থেকে বাঁচার প্রচেষ্টা।
কোরআন মজিদে রয়েছে, ‘আর তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় করো, যা শুধু বিশেষভাবে জালিমদের প্রতিই আপতিত হবে না, (মৌন সমর্থনকারীরাও এই মুসিবতে নিপতিত হবে)।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ২৫)
ভোট যেহেতু পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব, সেহেতু কোরআন করিমের এই ঘোষণাকেও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতগুলো প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ করো, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করো। আল্লাহ তোমাদের সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৫৮)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
ই–মেইল: smusmangonee@gmail.com