রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

মতামত

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে স্থানীয়রা কী ভাবছে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমি প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছি। আমার উদ্দেশ্য একটাই, আর তা হলো পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের মনে যে অজানা ভীতি ও সংশয় রয়েছে, তা দূর করা।

দীর্ঘদিন ধরে আমি মানুষকে বলে আসছি, বর্তমান প্রজন্মের পারমাণবিক চুল্লিগুলো চেরনোবিল বা ফুকুশিমার দুর্ঘটনাগ্রস্ত চুল্লির তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। তবে প্রশ্ন হলো যাঁদের বাড়ির পাশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে, তাঁরা নিজেরা কী ভাবছেন? এটি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুফল যেমন তাঁরাই আগে পাবেন, তেমনি সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রভাবও তাঁরা আগে অনুভব করবেন।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমার পাঁচ সদস্যের একটি গবেষণা দল রূপপুর কেন্দ্রের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ৬০০ মানুষের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ বাধ্যতামূলক। দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচিত বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের কাছে পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার আশঙ্কা, পরিবেশগত প্রভাব, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, তথ্যপ্রবাহ, কর্মসংস্থানসহ ২৮টি প্রশ্ন করা হয়। পরবর্তী সময় জরিপের ভিত্তিতে ইতিবাচক, নেতিবাচক ও নিরপেক্ষ মত দেওয়া এই তিন ধরনের অংশগ্রহণকারীর মধ্য থেকে ১৫ জনের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

জরিপ ও সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই জানান, রূপপুর নিয়ে এ ধরনের জরিপে অংশগ্রহণই ছিল তাঁদের প্রথম অভিজ্ঞতা। জরিপের প্রশ্নাবলি ও সাক্ষাৎকারের আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে নতুন কিছু তথ্য জানতে পেরেছেন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে আরও তথ্য জানা প্রয়োজন, এ কথাও তাঁরা উপলব্ধি করেছেন। অনেকে বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে এলাকায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বেড়েছে, জমির দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে এবং ব্যবসা–বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে।

বর্তমানে ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন জ্বালানিসংকটে ভুগছে। এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা যেমন জরুরি, তেমনি এর আশপাশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তাঁদের দেওয়া সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকের মতে, রূপপুর দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হবে এবং বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে। দু-একজন বলেছেন, ভবিষ্যতে নতুন চুল্লি বসাতে হলে রূপপুরেই বসানো উচিত, অন্য কোথাও নয়। তাঁদের যুক্তি হলো ঝুঁকি যদি থাকেই, তাহলে তা একটি এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। আবার ৯০ শতাংশ বাসিন্দাই চান না তাঁদের এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হোক। তাঁরা নিরাপত্তা, বিশেষ করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অল্পসংখ্যক মানুষ এ কথাও বলেছেন যে দেশের চরাঞ্চল কিংবা জনবসতি কম, এমন অঞ্চলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা উচিত।

প্রায় সবাই স্বীকার করেছেন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার ধারণা নেই। পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে তাঁরা বিভ্রান্তিতে রয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদ্মা নদীতে ফেলা হবে। আবার কেউ বলেছেন, প্রকল্পে চাকরি পেতে অনিয়ম, ঘুষ ও তথ্য গোপনের ঘটনা রয়েছে। মোটকথা, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং পরমাণু নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ওপর তাঁদের আস্থা খুবই কম।

পরিবেশগত দিক থেকেও নানা উদ্বেগ উঠে এসেছে। স্থানীয় লোকজনের মতে, ভারী নির্মাণকাজের কারণে এলাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমেছে এবং পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। পদ্মা নদীর পূর্ব পাশে (রূপপুরের তীরবর্তী অংশ) ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে পদ্মার দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে অবস্থিত কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এবং পরবর্তী নদী–তীরবর্তী এলাকাগুলোতে চর সৃষ্টি ও ভাঙন বেড়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ডাব ও লিচুর ফলনও কমে গেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুফল মূলত রূপপুরের পূর্ব পাশ তথা ঈশ্বরদী অঞ্চলে বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা এলাকায়, যা কেন্দ্রের খুব কাছেই (২ থেকে ৩ কিলোমিটার), সেই তুলনায় উন্নয়ন কম হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ। তাঁদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে অনুকূল বায়ুপ্রবাহের কারণে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছ ধারণার অভাবে জরিপ ও সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষই নিরপেক্ষ মতামত দিয়েছেন অথবা এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই বলে জানিয়েছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের বাসিন্দাদের যথাযথভাবে সচেতন ও শিক্ষিত করে তুলতে পারলে তাঁরাই কেন্দ্র পরিচালনা, নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠেন। গুজব ও ভুল তথ্য প্রতিরোধেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

জরিপ ও সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণকারীরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ কীভাবে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখবে, সে বিষয়ে ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিলবোর্ড ও নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা উচিত। একই সঙ্গে বিকিরণে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য কাছাকাছি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। কারণ, আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য পাবনা কিংবা কুষ্টিয়ার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে বিকিরণসংক্রান্ত বিশেষায়িত স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষ্ঠা করলেও দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না বলে তাঁদের অভিমত।

এ ছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জরুরি অবস্থা মোকাবিলা বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দিতে একটি সহজ গাইডলাইন তৈরি করে পাবনা, কুষ্টিয়া ও নাটোরের জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে স্কুল–কলেজে সহপাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই ঈশ্বরদীতে অবস্থিত পারমাণবিক তথ্যকেন্দ্র সম্পর্কে জানেন না। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের মত হলো তথ্যকেন্দ্রটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি গ্রিন সিটির আশপাশে স্থানান্তর করা উচিত, যেখানে সাধারণ মানুষের সহজ প্রবেশাধিকার থাকবে। একই সঙ্গে ঈশ্বরদীর মতো কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও মিরপুর এলাকাতেও সমানভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।

বর্তমানে ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন জ্বালানিসংকটে ভুগছে। এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করা যেমন জরুরি, তেমনি এর আশপাশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ, আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে তাঁদের দেওয়া সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মো. শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র।

msislam@du.acbd

মতামত লেখকের নিজস্ব