দেশে নাগরিক সুবিধা তলানিতে ঠেকেছে। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, সড়কে সীমাহীন নৈরাজ্য, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া যায় না। ঘুষ নিয়ে একটা উদাহরণ দিই। ঢাকার একটি এলাকায় থাকেন তিনি। ফ্ল্যাটবাড়িতে বাস। এ জন্য নানা রকমের কর দিতে হয়। তার মধ্যে একটি হলো ভূমিকর। এটি দিতে হয় কাঁটাবনে অবস্থিত একটি অফিসে।
ইদানীং কর দেওয়ার পদ্ধতি ডিজিটাল হয়ে গেছে। কয়েক বছরের কর জমা হয়ে গিয়েছিল। তো সেটি দিতে তিনি গেলেন ঢাকার একটি ভূমি অফিসে। সেখানে এ বলে ওর কাছে যান, ও বলে তার কাছে যান। অবশেষে তিনি ঠিক জায়গায় পৌঁছান। সেখানে আরেক বিপত্তি। এক কর্মচারী জানাল, সার্ভার ডাউন। তিনি সেখানে ঘণ্টা তিনেক অপেক্ষা করলেন। সার্ভার আর ডাউন থেকে আপ হয় না। তিনি ফিরে এলেন। এটা শুনে আমি অন্য কিছুর গন্ধ পেলাম। তাঁকে সেটা বললামও।
পরদিন সকালে অফিস খোলার সময় তিনি আবার গেলেন অকুস্থলে। সেই কর্মচারীর সঙ্গে দেখা। একই কথা—সার্ভার আজও ডাউন। তিনি বললেন, এই যে আমি বসলাম। যতক্ষণ সার্ভার ঠিক না হয়, নড়ছি না। তিনি বসেই আছেন। কিছুক্ষণ পর ওই কর্মচারী এসে কোনো রাখঢাক না রেখেই বলল, তিন হাজার টাকা দিলে কাজটা করে দিতে পারি। এবার তিনি বুঝলেন সার্ভার ডাউনের রহস্য। মুলামুলি করে হাজার টাকায় রফা হলো। ভোজবাজির মতো সার্ভার আপ হলো। খাজনা দিয়ে তিনি বাসায় ফিরে এলেন।
বলতে পারেন, তিনি তো ঘুষ দিলেন, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিলেন। ওই অফিসের বসকে বললেন না কেন? হায়রে বস! এসব জায়গায় বস তো বটেই, ইট-কাঠ-টেবিল-চেয়ারও পয়সা খায়। আর কী করা যেত? ওই অফিসের লোকদের পেটানো? লোকজন জড়ো করে মানববন্ধন? দুটোই তো হয় মাঝেমধ্যে। তাতে কি হুঁশ ফেরে?
উৎকোচ ছাড়া কাজ হয় না। অথবা উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকলে কাজটা সহজ হয়। কজনের পক্ষে সেটি সম্ভব? অনেক অফিসে দারোয়ান-পিয়নকে ডিঙানো অনেকটা পুলসিরাত পার হওয়ার মতো। অফিসপ্রধানের কাছে পৌঁছাবে কী করে? তা ছাড়া এটা তো একটা সিস্টেম হয়ে গেছে। উঁচু থেকে নিচু একটা চেইন কাজ করে। নিচু পদের কর্মচারী বা পিয়ন হচ্ছে ‘টোল কালেক্টর’। ‘টোলের’ ভাগ চেইনজুড়ে সব জায়গায় পৌঁছে যায়।
কিছুদিন আগে আমার কাছে এক ব্যক্তি একটি সমস্যার কথা জানালেন। তিনি সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। কয়েক বছর আগে অবসরে গেছেন। এখনো অবসরভাতা পাননি। অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছেন। তাতে কাজ হয়নি। তাঁর আর কোনো আয় নেই। মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
অবসর ভাতার জন্য মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দৌড়াদৌড়ি করে অনেকেই গত হয়েছেন। এ রকম ঘটনার কথা আমরা গণমাধ্যমে জানতে পারি। অনেকের কাছে শুনি, কী একটা ‘অডিট অবজেকশন’ আছে। সে জন্য সুরাহা হচ্ছে না। টাকা দিলেই সুরাহা হয়ে যায়। কীভাবে এই টাকা কাকে দিতে হয়, এটাও অনেকে জানেন না। আমি তাঁকে বললাম, আপনি স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে যান। বললেন, গেছি, সমাধান হয়নি। বললাম, তাহলে ঢাকায় শিক্ষা ভবনে যান।
আমাদের দেশে অনেক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো পোষা হয় জনগণের করের টাকায়। অথচ সেসবের কোনো উপযোগিতা নেই। বিশাল বিশাল ভবন বানিয়ে আমরা বসে আছি। সেখানে শত শত লোক কাজ করে। কী তাদের কাজ, আজও বুঝলাম না। এসব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর তাদের পোষ্যরা ছাড়া আর কেউ লাভবান হয় না। কী নিদারুণ অপচয়! কী জন্য এসব পোষা?
আমার মনে পড়ল, অনেক বছর আগে টিআইবির একটি দুর্নীতিবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি দপ্তরগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তালিকার শীর্ষে ছিল শিক্ষা বিভাগ। এসব প্রতিবেদন কোনো জরিপে বা পত্রিকায় এলেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তারা হালুম হালুম বলে হামলে পড়ে বলেন, আমরা এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করলাম।
অনেক দিন ধরে অনেক গালভরা কথা শুনছি। এসবের মধ্যে যেমন আশার ফুলঝুরি আছে, তেমনি আছে প্রতিশ্রুতির বন্যা। এসব শুনে শুনে আমাদের কান পচে গেছে। যাঁরা নিয়ম বানান এবং যাঁদের হাতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব, কথা বলার পর তাঁরা তার কতটুকু মনে রাখেন? তাঁদের প্রতিশ্রুতিগুলোর চার ভাগের এক ভাগ বাস্তবায়িত হলে তো এটা সোনার দেশ হয়ে যেত?
যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরা তারস্বরে বলে বেড়ান, আগের সরকারের সীমাহীন অপচয় আর দুর্নীতির কারণে সমস্যার জট এমন বেঁধেছে যে শিগগির সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার উপায় নেই। এসব জঞ্জাল সাফ করতে অনেক সময় লাগবে। তারপর তো আসল কাজে হাত দেওয়া। সুতরাং জনগণকে ধৈর্য ধরতে হবে।
মনে আছে, ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এক জনসভায় জনগণকে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা সবকিছু ধ্বংস করে দিয়ে গেছে, তিন বছর কিছুই দিতে পারব না। জনগণ তিন বছর কেন, ত্রিশ বছরও অপেক্ষা করতে রাজি ছিল, যদি নেতারা ত্যাগের উদাহরণ তৈরি করতে পারতেন। সেটি হয়নি। দেখা গেল, বাড়ি, গাড়ি আর অফিস দখল, লুটপাট, পারমিটবাজি, চোরাচালান, মজুতদারি চলছে অবাধে। আর এসবের পেছনে আছে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা।
বাহাত্তর সাল থেকেই দুর্ভিক্ষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। সেটি প্রবল আকার ধারণ করল চুয়াত্তর সালে। হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় জমাতে লাগল। অনেক আবেদন–নিবেদনের পর সরকার শহরে লঙ্গরখানা খুলল। সেই লঙ্গরের চাল-ডাল খোলাবাজারে বিক্রি হয়ে গেল। সবাই দেখেছে, কারা এটা করেছে।
মানুষ এ অবস্থার পরিবর্তন চাইছিল। অবস্থার পরিবর্তন হলো নির্মমভাবে। অনেকেই নানান ষড়যন্ত্রতত্ত্ব দিয়ে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করেন। কেউ কেউ বিদেশি চক্রান্ত দেখেন। কিন্তু এটি তো সত্য, অভাবী মানুষের আহাজারি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা নেতার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এই নির্মম বাস্তবতাটুকু অনেকেই আজ পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারছেন না। অথবা তাঁদের বোধের জায়গায় জনগণ নেই, আছে শুধু আত্মতুষ্টি।
আমাদের দেশে অনেক দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলো পোষা হয় জনগণের করের টাকায়। অথচ সেসবের কোনো উপযোগিতা নেই। বিশাল বিশাল ভবন বানিয়ে আমরা বসে আছি। সেখানে শত শত লোক কাজ করে। কী তাদের কাজ, আজও বুঝলাম না। এসব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর তাদের পোষ্যরা ছাড়া আর কেউ লাভবান হয় না। কী নিদারুণ অপচয়! কী জন্য এসব পোষা?
আমরা শুনি, অমুক প্রকল্পে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে, সেই টাকা দিয়ে আরেকটা পদ্মা সেতু বানানো যেত। পদ্মা সেতু তো হয়েছে। মানুষ তার উপকার পাচ্ছে। কিন্তু এসব কর্মহীন সরকারি দপ্তর কী কাজে আসে?
এ প্রসঙ্গে অনেক বছর আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল। আদমজী জুট মিলে তখন নৈরাজ্য চলছে। কাঁচামালের অভাবে বা যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার কারণে প্রায়ই কারখানা বন্ধ থাকে। তো জানা গেল, কারখানা বন্ধ থাকলে রোজ চুরি হয় দুই লাখ টাকা। আর চালু থাকলে রোজ চার লাখ টাকা গচ্চা যায়।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে অনেক কর্মকর্তা ওএসডি হন। তিনি বেতন–ভাতা সবই পান। তবে কাজ পান না। ওসডি হওয়া এক কর্মকর্তা আমাকে মজা করে বলেছিলেন, বেতন তো পাই, ঘুষ তো পাই না!
কথা হলো, এই যে ওএসডির প্রথা, এটা কেন? আমাদের মতো একটা গরিব দেশে এত লোককে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো অপচয়কে কী করে ন্যায্যতা দেওয়া হয়? হয় তাঁকে কাজ দিন, নয়তো অবসরে পাঠান। গুরুতর অপরাধ হলে চাকরিচ্যুত করুন। কোনো সরকার সে পথে হাঁটে না। দেখা যায়, সরকার বদল হলে ওএসডি বা বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি নিয়ে ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বহাল হন। এ এক মজার খেলা।
১৯৮২ সালে শামসুর রাহমান একটি কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর একটি লাইনের কথা মনে পড়ে—‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ এ নামে তাঁর একটি কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ আছে।
যখন মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। ইতিহাসে আমরা এমনটি দেখেছি বারবার। তারপরও মানুষ শিক্ষা নেয় না। কেন নেয় না? এটা কি একটা অসুখ? নাকি এটাই নিয়ম?
● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব