
তালতলা হাইস্কুলের ইংরেজির মাস্টার তালেব আলি তালগাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন। পেকে তুলতুলে হওয়া একটা তাল পড়ব-পড়ব করছে। সেই মুহূর্তে তালটার ওপর একটা কাক উড়ে এসে জুড়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে তালটা মাটিতে ধপ করে পড়ল, নাকি পড়ে ধপ করল, তা বোঝা গেল না।
তালেব মাস্টার এই দৃশ্য দেখে বললেন, ‘হোয়াট এ কো-ইনসিডেন্স! কী কাকতালীয় ঘটনারে মাইরি!’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হুবহু একই রকমের আরেকটা কাক একই কায়দায় উড়ে এসে হুবহু একই রকম আরেকটা তালের ওপর এসে হুবহু একই ঢংয়ে বসল এবং হুবহু একই কায়দায় দ্বিতীয় তালটিও পড়ে ধপ করল। তালেব মাস্টার প্রবল বিস্ময়ে বললেন, ‘অ্যানাদার কো-ইনসিডেন্স!’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হুবহু একই রকমের আরকেটা কাক একই কায়দায় উড়ে এসে হুবহু একই রকম আরেকটা তালের ওপর এসে হুবহু একই কায়দায় বসল এবং হুবহু একই কায়দায় তৃতীয় তালটিও পড়ে ধপ করল।
তালেব মাস্টার এবার প্রায় চিৎকার করে বললেন, ‘অ্যানাদার কো-ইনসিডেন্স!’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে শুধরে নিয়ে বললেন, ‘হোয়াট এ মিরাকল!’
ইংরেজি ব্যাকরণ পড়ানো তালেব মাস্টার বুঝলেন, পতনমুহূর্তে তালের ওপর কাক বসার পর তালের পড়ে যাওয়াকে ‘কাকতালীয়’ বলা যায়।
সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় তালের পড়ে যাওয়াকেও না হয় কাকতালীয় বলা যায়। কিন্তু তিন নম্বর তালটিও যখন একইভাবে পড়ে, তখন আর সেই ঘটনাকে কাকতালীয় বলা যায় না। তখন সেই তাল পড়ার ঘটনা হয়ে যায় তেলেসমাতি ঘটনা বা ‘কুদরতকি কারিশমা’ বা অলৌকিক ঘটনা বা মিরাকল।
তালতলার তালেব মাস্টারের তালগাছ তলার ঘটনার মতো বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলায়ও ছেঁড়া ছেঁড়া তিনটা ‘কাকতালীয় কো-ইনসিডেন্স’ সুন্দরমতো জোড়া লেগে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা আস্ত ‘মিরাকল’ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা (বগুড়া-২ আসন) বগুড়ার শিবগঞ্জ এবং নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠন করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলায় যে নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে, সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’। আর মোকামতলা উপজেলায় যে নতুন তিনটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে, তার একটির নাম ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, আরেকটির নাম ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ এবং আরেকটির নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।
এক নম্বর কাকতাল হলো—একদিকে প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ি’, অন্যদিকে, সেখানে বানানো নতুন ইউনিয়নের নাম ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’।
দুই নম্বর কাকতাল হলো, নতুন একটি ইউনিয়নের নাম ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, আবার প্রতিমন্ত্রীর এক ছেলের নাম ‘মীর সীমান্ত’।
তিন নম্বর কাকতাল হলো, নতুন আরেকটি ইউনিয়নের নাম ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’, কী আচানক ব্যাপার, প্রতিমন্ত্রীর আরেক ছেলে নাম মীর দিগন্ত।
প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজির নাম ‘স্বর্ণালী’, আবার নতুন আরেকটি ইউনিয়নের নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।
একের পর এক নামের কাকতালীয় মিল। মানে, একের পর এক কাক উড়ে আসছে, আর তালের ওপর বসছে; আর সমানে একের পর এক তাল পড়ে যাচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, এতগুলো বেতাল কাণ্ডের মধ্যে তাল না পেয়ে ‘একটি বিশেষ মহল’ এই কাকতালীয় ঘটনাগুলোকে প্রতিমন্ত্রীর নিজের বংশ-গুষ্টির নাম ফাটানোর অপচেষ্টা হিসেবে দেখা শুরু করেছে।
এক সময় যেভাবে ‘নেত্রীকে ভুল বোঝানো’ হতো, সম্ভবত একইভাবে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামকে কেউ ভুল বুঝিয়ে থাকতে পারে।
হয়তো সে কারণেই সোমবার সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি নালিশের মতো করে বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এলাকায় একটি ইউনিয়নে তাঁর মীর বংশের নামে “মীরবাড়ি” নামে নামকরণ করেছেন। তাঁর দুই সন্তান দিগন্ত ও সীমান্তের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।...বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে নাম সংশোধনী করতে অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। এখন একই সংস্কৃতি আমাদের মাঝে ফিরছে।’
শফিকুল ইসলামের ভুল ভেঙে দেওয়ার জন্য বাদ মাগরিব সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম পুরো বিষয়টি জাতিকে বুঝিয়ে বলেছেন।
প্রতিমন্ত্রী নতুন সদ্যোজাত ইউনিয়নগুলোর উদ্ভব, ক্রমবিকাশ ও সেগুলোর নামকরণের সার্থকতা ব্যাখ্যা করে বলেন, মোকামতলার সৈয়দপুর ও দেউলি-এ দুটি ইউনিয়ন ছিল অনেক বড়। ইউএনও এবং ডিসি যাচাই-বাছাই করে গণশুনানি করে নতুন নাম দিয়েছেন। এখানে তাঁর হাত নেই।
নিজ এলাকার বর্ণাঢ্য ভৌগোলিক বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সৈয়দপুর ইউনিয়ন গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এটার নাম করা হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’। আরেকটি গাইবান্ধার কাছে; এটি দিগন্ত ছোঁয়া দূরে; তাই এর নাম রাখা হয়েছে ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নাম রয়েছে উল্লেখ করে শাহে আলম বলেছেন, ‘মিরাকেলি (আদতে ‘মিরাকেলি’ বলে কোনো শব্দ নেই। সম্ভবত তিনি ‘মিরাকুলাসলি’ কথাটি বলতে চেয়েছেন) আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই। আমার সন্তানদের নাম হচ্ছে মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইনটেনশন থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম “নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত”। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।’
প্রতিমন্ত্রীর এই অতি বস্তুনিষ্ঠ, সরল সত্যভাষণে যারপরনাই উদ্বেলিত হয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে সমর্থন জানান।
প্রতিমন্ত্রী তাতে বিপুল উৎসাহ পেয়ে আল্লাহর কাছে শোকরানা জানিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য বলেনি যে বিজিবির সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড, ওটা আমার ব্যাংক। উনি দয়া করে যে বলেননি খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস, সেটিও আমার ট্রেন। বা উনি দয়া করে বলেননি যে গুলশান ১-এ যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে, সেটিও আমার।’
প্রতিমন্ত্রীর আত্মপক্ষ সমর্থনসূচক বক্তব্যের শব্দপ্রক্ষেপনে যে বিচক্ষণতা প্রতিভাত হয়েছে, তা তালতলার তালেব মাস্টারের উপলব্ধির সাথে খাপে খাপে মিলে যায়।
প্রতিমন্ত্রী নিজের বাড়ির নাম ও নিজের ছেলেদের নামের সাথে নতুন তিনটি ইউনিয়নের নাম মিলে যাওয়াকে ‘কো-ইনসিডেন্স’ বা কাকতালীয় ব্যাপার বলেননি। তিনি এটিকে বলেছেন, ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ব্যাপার।
তালেব মাস্টারের মতো তাঁরও উপলব্ধির অন্তর্লোকে যে প্রশ্নটি উঁকি মেরে গেছে, তা হলো—একসঙ্গে এতগুলো কো-ইনসিডেন্স ঘটলে তা আর কো-ইনসিডেন্স থাকে কী করে? তালেব মাস্টারের মতো তিনিও বুঝতে পেরেছেন, এটি আসলে ‘মিরাকল’ বা আল্লাহর কুদরত। এ কারণে তিনি বলেছেন, ‘মিরাকেলি আমার সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে।’
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, ‘মিরাকেলি’ কথাটার বাংলা অনুবাদ হিসেবে ‘কাকতালীয়ভাবে’ কথাটা লেখা হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। কারণ প্রতিমন্ত্রী ‘অলৌকিক’ অর্থেই ইংরেজিতে ‘মিরাকেলি’ কথাটা বলেছেন এবং যেহেতু তিনি ইংরেজিতে বলেছেন, সেহেতু ঠিকই বলেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ইউএনও এবং ডিসি যাচাই-বাছাই করে গণশুনানি করে ইউনিয়নের নতুন নাম দিয়েছেন। এখানে তাঁর হাত-পা কিচ্ছু নেই।
দেখা যাচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী শতভাগ ঠিক বলেছেন। জেলা প্রশাসক মহোদয়ও বলেছেন, এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী তাঁকে কিছু বলেননি।
জানা যাচ্ছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় বিএনপির একজন নেতা ইউনিয়নগুলোর এই কাব্যময় নামগুলো প্রস্তাব করেন। তাঁর সেই প্রস্তাব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।
পরে উপজেলা প্রশাসন নামগুলো প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠায়। সে মোতাবেক জেলা প্রশাসক গেজেট জারি করেন।
মানে, বিএনপির স্থানীয় কোনো একজন সংস্কৃতিমনা ও সাহিত্যানুরাগী নেতার মাথা থেকে এই নামগুলো এসেছে। এই নামগুলোর সঙ্গে যে প্রতিমন্ত্রীর বংশ এবং ছেলেদের নামের মিল আছে, তিনি হয়তো তা ভাবতেই পারেননি। ফলে পুরো ঘটনা ‘মিরাকেলি’ ঘটে গেছে।
এই ধরনের ক্ষমতাবানের ভেতরে থাকা বিবেক বাবু যদি টাইমলি হুঁশিয়ার না করে, তাহলেই বিপদ। কারণ একদিকে বংশের নাম, একদিকে এক ছেলের নাম, আরেকদিকে আরেক ছেলের নাম—এই তিন নামের ত্রিভুজে তৈরি হতে পারে ‘নামায়ন’ নামের নতুন প্রশাসনিক মহাকাব্য।
গাঁজা-ভাঙের নেশার চেয়ে বড় নেশা নাঙের নেশা। তার চেয়ে বড় নেশার নাম ‘নামের নেশা’। আগেকার রাজা-বাদশাহ-জমিদার-জমাদারদের নিজের নাম ‘জাঁকাইয়া’ তোলার এই রাজনেশা ছিল। আজকের দিনের রাজা-উজির-মন্ত্রী-সান্ত্রীরও এই নেশা আছে।
দুনিয়ার সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই রাজনেশা আছে। তিনি নিজের নামে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’, ‘ট্রাম্প হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস’, ‘ট্রাম্প গলফ কোর্স’, ‘ট্রাম্প ক্লাব’, ‘ট্রাম্প প্লাজা’, ‘ট্রাম্প পার্ক’, ‘ট্রাম্প ওশান ক্লাব’-এই ধরনের বহু প্রতিষ্ঠান বানিয়েছেন।
শাহে আলমের এই নেশায় পড়ার ঝুঁকি আছে। কারণ তিনি ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্রতিমন্ত্রী’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন সম্প্রতি একটি জনসভায় তাঁকে এই অভিধা দিয়েছেন। কেন তিনি ‘সবচেয়ে পাওয়ারফুল প্রতিমন্ত্রী’ তা অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুলে বলেননি। তবে কথাটা যে ঠিক তা নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম বিষয়ক ‘মিরাকল’ দেখে বোঝা যাচ্ছে।
ইতিহাস বলে, ‘পাওয়ারফুল’ লোকজনের পাবলিকের পয়সায় নিজের নাম ফাটানোর নেশায় পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাঁরা নামরাজ্য প্রতিষ্ঠার লোভে পড়েন। কারণ নাম ক্ষমতার নিঃশব্দ সিলমোহর।
এই ধরনের ক্ষমতাবানের ভেতরে থাকা বিবেক বাবু যদি টাইমলি হুঁশিয়ার না করে, তাহলেই বিপদ। কারণ একদিকে বংশের নাম, একদিকে এক ছেলের নাম, আরেকদিকে আরেক ছেলের নাম—এই তিন নামের ত্রিভুজে তৈরি হতে পারে ‘নামায়ন’ নামের নতুন প্রশাসনিক মহাকাব্য।
সেই মহাকাব্যে সীমান্ত নামটি আর শুধু একটি শব্দ থাকে না, তা হয়ে ওঠে লোভের সীমানা বাড়ানোর নীরব ইঙ্গিত। দিগন্ত আর দিগন্ত থাকে না—তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার নামাঙ্কিত দখলরেখা। আর ইউনিয়নের মানচিত্র হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত নাম আর ক্ষমতার ভূগোল।
সে কারণেই সাঁইজি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—‘তুমি নামের ফাঁদে পড়েছ!’
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক।
ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব