
নির্বাচন সামনে রেখে পুরোদমে শুরু হয়েছে ভোটের প্রচার প্রচারণা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং ইলেকশন কমিশনের এই প্রচার প্রচারণা থেকে বাদ পড়ছে দেশের লাখ লাখ ইশারা ভাষার নাগরিক।
অর্থাৎ বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ। কারণ তাঁদের (ইশারা) ভাষায় কোনো প্রচার প্রচারণা হচ্ছে না। তাঁদের অনুভূতিতে নেই ভোটের আমেজ।
চারদিকে যখন মাইকিং চলছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যখন ভোটের তথ্য প্রচারে ব্যস্ত, সারা দেশ যখন মেতে উঠেছে ভোটের আমেজে তখন লাখ লাখ শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষ অনুভবই করতে পারছে না এই প্রচার।
অথচ সংখ্যায় তাঁরা এক বিশাল জনগোষ্ঠী এবং দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটার। প্রার্থীরা ইশারা ভাষীদের কাছে যাচ্ছেন না এমনকি ভোটও চাচ্ছেন না। ফলে ইশারাভাষী ভোটাররা তাঁদের দাবি-দাওয়াগুলো প্রার্থীকে জানাতে পারছেন না।
ভোটার হয়েও প্রার্থীদের কাছে যেন তাঁদের ভোটের কোনো দাম নেই। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো লাখ লাখ ইশারাভাষীদের ভোট পরিবর্তন করে দিতে পারে ফলাফল।
কারণ একজন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভোটের গুরুত্ব অন্যান্য ভোটারদের ভোটের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
ধরুন, আমরা যারা কথা বলতে পারি তারা এবং ইশারাভাষী কয়েকজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি। একজন প্রার্থী এসে কথা বলতে পারা ভোটারদের বুকে জড়িয়ে ধরে ভোট চেয়ে চলে গেলেন।
ভাষা না বোঝার কারণে ইশারাভাষীদের বুকে টেনে নেওয়া, ভোট চাওয়া বা তাঁদের কথা শোনা হলো না। তখন ইশারাভাষী ভোটারদের মনে কী অনুভূতি হবে?
নিশ্চয়ই নিজেদের গুরুত্বহীন, মূল্যহীন একজন মানুষের অনুভূতি তাঁকে গ্রাস করবে।
ইশারাভাষী ব্যক্তিরা বোধ বুদ্ধিহীন নয়। তাঁরা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ।
শুধু ভাষাটা আলাদা। তাঁরাও আশা করেন প্রার্থীরা তাঁদের কাছে আসবেন, ভোট চাইবেন, গুরুত্ব দেবেন, বুকে জড়িয়ে ধরবেন। তাঁরাও বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন, দাবি দাওয়া, চাওয়া-পাওয়ার কথাগুলো তুলে ধরবেন।
অথচ এর কোনোটাই হয় না। ভোটের দিন সকালে হয়তো পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া মার্কাতেই ভোট দিয়ে ঘরে ফিরবেন দেশের লাখ লাখ ইশারাভাষী ভোটার।
তবে প্রতিটি দল যদি তাঁদের প্রচার প্রচারণায় ইশারা ভাষার ব্যবহার যুক্ত করত তবে কতোইনা সুন্দর মনোমুগ্ধকর প্রচার হতো। দেখা গেছে কয়েকটি বড় রাজনৈতিক দল প্রচারণার জন্য ভোটের গাড়ি বের করেছেন।
গাড়ির এলইডি মনিটরে যদি মাঝে মাঝে ইশারা ভাষায় দলের বার্তাগুলো প্রচার করা হতো তাহলে এই লাখ লাখ ইশারাভাষী ভোটার প্রচারণার অংশ হতো, আবার প্রচারের সৌন্দর্য বেড়ে যেত বহুগুণে। সবচেয়ে বড়কথা ভোটের তথ্য প্রচারের বিষয়টি ইনক্লুসিভ হতো।
২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এবার গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। যেখানে ৪টি প্রশ্নের ওপর জন্য ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট হবে।
যেখানে কথা বলতে ও শুনতে পারা মানুষই ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের এই বিষয়টি বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে ইশারাভাষীদের কাছে বিষয়টি কতটা জটিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি প্রচার গাড়ি বের করা হয়েছে তার মধ্যে একটি গাড়ি যদি ইশারা ভাষায় এই গণভোটের বিষয়টি প্রচার করত তাহলে শুধু ইশারাভাষীদের জন্যই বুঝতে সহজ হতো তা নয় বরং কথা বলতে পারা মানুষদের জন্যও বুঝতে সহজ হতো। কারণ ইশারা ভাষা চোখে দেখা যায়। আর মানুষ শোনার চেয়ে দেখে সহজে বুঝতে পারে।
একজন ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, না জেনে না বুঝে শুধুমাত্র ব্যালটে সিল মারতে পারার আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরবে দেশের লাখ লাখ ইশারা ভাষার ভোটার।
সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান একটি অনুষ্ঠানে ইশারা ভাষার ব্যবহার রেখেছেন এবং ইশারাভাষীদের কথা শুনেছেন। অন্যদিকে গত বছর বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম এর একটি সমাবেশে ইশারা ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে।
তবে ভোটের মাঠে এটা আর কনটিনিউ করেনি কেউই। তাই একজন ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, না জেনে না বুঝে শুধুমাত্র ব্যালটে সিল মারতে পারার আনন্দ নিয়েই ঘরে ফিরবে দেশের লাখ লাখ ইশারা ভাষার ভোটার।
আহসান হাবিব ইশারা ভাষার সংবাদ উপস্থাপক, বিটিভি