প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে বড় করে দেখার বার্তা আছে
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে বড় করে দেখার বার্তা আছে

এ কে এম জাকারিয়ার কলাম

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও সামনের কূটনীতি

অর্থনৈতিক নানা চাপ ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে তারেক রহমানের নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে হবে, নতুন বিনিয়োগ লাগবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও শিল্পায়নে গতি ফেরাতে হবে, আবার একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়নও থামিয়ে রাখা যাবে না। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো শুরু হয় ইরান যুদ্ধ।

এমন একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর বা দেশ নির্বাচনের পেছনে স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিক বিবেচনা গুরুত্ব পেয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া হয়ে চীনে গেছেন। অর্থনৈতিক স্বার্থের বিবেচনায় দুটি দেশই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম উৎস। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ওপর বর্তমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বাংলাদেশে বড় চাওয়া। আর সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা বা বাণিজ্য সম্পর্ক—যেকোনো বিবেচনায় চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগী। তবে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও কৌশলগত বিবেচনায় সফর দুটির মাত্রাগত পার্থক্য ও ভিন্নতা আছে।  

মালয়েশিয়া সফরকে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও স্বার্থ এবং দুটি এশীয় বা মুসলিম দেশের মধ্যে সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের খুব সুযোগ নেই। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগী হলেও শুধু এর ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ককে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে বদলে যাওয়া বিশ্বরাজনীতি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

অতীতের এ ধরনের যেকোনো সফর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরকে আলাদা করে দেখতে হচ্ছে। কেন? সেই আলোচনায় পরে আসছি। 

১৯৭৫ সালের অক্টোবরে কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও চীনের রাজনীতি নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে কিন্তু দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক চরিত্রে তেমন বদল হয়নি। চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে, সব ধরনের সরকারের সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো রাখা এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার ওপরে জায়গা দেওয়া।

কোনো দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আছে নাকি সামরিক বা স্বৈরাচারী সরকার, সেটা তাদের বিবেচনার বিষয় নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা–ই দেখা গেছে। বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সেই অর্থে কখনো খারাপ হয়নি।  

আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীন-ভারতের সম্পর্ক খুবই প্রতিযোগিতামূলক। আমরা জানি, গত আওয়ামী লীগ শাসনে বাংলাদেশ পুরোপুরি ভারতের প্রভাববলয়ের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। এতে চীনের যে খুব সমস্যা হয়েছে, তা নয়। হাসিনা সরকারের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছে এবং চীনের সহায়তায় সে সময় অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। হাসিনার আমলে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারেও পরিণত হয়। আবার হাসিনার পতনেও তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।

বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের চীন সফরের চেয়ে এবারের সফরকে কেন আলাদা করে দেখতে হচ্ছে, এবার সেই প্রসঙ্গে আসছি। দুই দেশের সম্পর্কের পাঁচ দশকের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরের সময় তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ-চীন যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। সেই ইশতেহার এবং সামগ্রিক সফর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবারই প্রথম আর্থিক সহায়তা বা উন্নয়ন প্রকল্পভিত্তিক আলোচনার চেয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই সফরকে কূটনীতি বা পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কারণ, কোনো একটি সফরকে বিবেচনায় নিয়ে কূটনীতির অভিমুখ ঠিক করা যায় না। ধারাবাহিক পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দিয়ে তা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের জন্য সামনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি পরিণত, আত্মবিশ্বাসী ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনীতি নিশ্চিত করতে পারা।

চীনের পররাষ্ট্রনীতির সাধারণ অবস্থান নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি; তারা রাজনীতির চেয়ে অর্থনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তবে গত এক দশকে চীনের কূটনীতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখনো তাদের প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু এর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্ব পাচ্ছে। বলা যায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) শুরুর পর চীন শুধু অবকাঠামো তৈরিতেই আটকে থাকতে চাইছে না। তারা রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরির নীতি নিয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আগে দেশটির সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস–এ প্রকাশিত সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক লিউ জংজির এক কলামেও চীনের এই পরিবর্তিত অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বোঝা যায়, চীন এখন অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও উচ্চপদস্থ মহল মূলত পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তাঁরা পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও শাসনব্যবস্থার চর্চা করেন এবং চীনের উন্নয়ন রূপরেখা ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির সহযোগিতার বিষয়ে সতর্ক থাকেন।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে দরকার ‘জাতীয় পরিস্থিতির উপযোগী উন্নয়নের পথ’ খুঁজে বের করা। এই পথ খুঁজতে তিনি দুই দেশের রাজনৈতিক দল, চিন্তন প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। 

আমরা দেখেছি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মত–পথের নেতা-কর্মী ও ছাত্রনেতারা চীন সরকারের আমন্ত্রণে দেশটি সফর করেছেন। গত কয়েক বছরে দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের সহায়তায় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট হয়েছে। বোঝা যায় সামনে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়বে।

এবার যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তার মধ্যে চীনা ভাষা শিক্ষা এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে সহায়তার মতো বিষয়গুলোও রয়েছে। বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বিষয়টি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; কূটনীতিতে দলীয় যোগাযোগের কৌশলগত গুরুত্ব আছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন এখন এই নীতি অনুসরণ শুরু করেছে। 

বিশ্বরাজনীতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় বিশ্বপরিসরে চীনের প্রভাব ও গুরুত্ব বাড়ছে। দেশটি এখন বাণিজ্য ও অর্থনীতির বাইরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হওয়ার কৌশল নেবে, এটাই স্বাভাবিক।

এদিকে অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশের দরকার অর্থের সহজ উৎস। ঋণ বা বিনিয়োগ যা–ই হোক, দেখা যাচ্ছে এ ক্ষেত্রে চীন ছাড়া বাংলাদেশের সামনে কোনো বিকল্প নেই। চীনের মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থ নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশ সেই পথ ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফর সেই বার্তাই দিয়েছে। 

তবে এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতাকেও বিবেচনার মধ্যে রাখা জরুরি। আঞ্চলিক পরিসরে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা, বৈশ্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের চীনকে ঠেকানোর চেষ্টা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বা দেশটির চারদেশীয় নিরাপত্তা সংলাপে (কোয়াড) ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার যুক্ততা—এসব হিসাব-নিকাশকে বাইরে রাখার সুযোগ নেই। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনের শিল্পাঞ্চল, সামুদ্রিক সহযোগিতা কিংবা চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর—ভারত এগুলোকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখবে না। দেখবে কৌশলগত উপস্থিতি হিসেবে।

আজকের দুনিয়ায় বন্দর আর শুধু একটি বাণিজ্য অবকাঠামো নয়। সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামরিক উপস্থিতির সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে। একইভাবে ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পও এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তা–ই। জাপান বহু দশক ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগীদের একটি। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, যৌথ নদী, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত নিরাপত্তা—এসব নিয়ে পারস্পরিক নির্ভরতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এবং এর অর্থনীতি অনেক দেশ ও শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। 

এমন একটি বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কার্যকর পথ হচ্ছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যুক্ত না হওয়া। কোনো এক পক্ষের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশীদার না হয়ে একসঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে কাজ করে যাওয়া। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর জন্য কার্যকর কৌশল হচ্ছে ভারসাম্য রক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা।  

আগেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে বড় করে দেখার একটি বার্তা আছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ কীভাবে বজায় রাখে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

তবে এই সফরকে কূটনীতি বা পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কারণ, কোনো একটি সফরকে বিবেচনায় নিয়ে কূটনীতির অভিমুখ ঠিক করা যায় না। ধারাবাহিক পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দিয়ে তা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের জন্য সামনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি পরিণত, আত্মবিশ্বাসী ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনীতি নিশ্চিত করতে পারা। 

এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

akmzakaria@gmail.com  

* মতামত লেখকের নিজস্ব