বিউটি রানী পালের (বায়ে) সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের প্রতিবাদ (ডানে)
বিউটি রানী পালের (বায়ে) সঙ্গে সংহতি  জানিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের প্রতিবাদ (ডানে)

মতামত

শিক্ষকেরা গানে গানে প্রতিবাদের যে নতুন ভাষা দিলেন

গত কয়েক দিনে আশির দশকের শেষের দিকের একটি গান ফেসবুকে ভাইরাল। গানটি হলো ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’। ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় এই গান এবং এর বিরহ আর স্মৃতিকাতরতার সুরের সঙ্গে কে না পরিচিত! কিন্তু ফেসবুকে একসঙ্গে এত মানুষ এই গানের ভিডিও ছাড়ছে দেখে কৌতূহলী হলো মন।

শ্রাবণের দিনে শ্রাবণের গান বাজবে এটা তো স্বাভাবিকই। তবে এই গান ভাইরাল হওয়াটা কেবল শ্রাবণের বর্ষা উদ্‌যাপন নয়, এটি পরিণত হয়েছে সাইবার বুলিং ও মোরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজের অভিনব, স্বতঃস্ফূর্ত ও নান্দনিক ডিজিটাল প্রতিবাদে।

হ্যাঁ, এই গান ভাইরাল করেছেন শিক্ষকেরাই। শিক্ষকেরা ক্লাসরুমে শুধু শিশুদেরই শেখান না, প্রতিবাদ কতটা একই সঙ্গে সৃজনশীল ও জোরালো হতে পারে, সেটিও আমাদের শেখালেন তাঁরা।

গানের রিল, মোরাল পুলিশিং ও সংহতি

ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পালের কয়েক সেকেন্ডের একটি সাধারণ রিল ভিডিও থেকে। ২৩ জুলাই তিনি নিজের ফেসবুক ওয়ালে নীল রঙের শাড়ি পরিহিত অবস্থায় স্কুলে হাঁটার একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওর নেপথ্যে বাজছিল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি।

সাবলীল এই ভিডিও নিয়ে নেটিজেনদের একাংশ শুরু করে বিষোদ্‌গার। কমেন্ট বক্সে দেখা যায় মোরাল পুলিশিংয়ের নানা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য। একজন শিক্ষিকা কেন রঙিন শাড়ি পরবেন? কেন তিনি বৃষ্টিতে ভিজবেন? কেন একজন নারী ফেসবুকে নিজের আনন্দ বা বিষাদের মুহুর্তের ভিডিও দেবেন?

সেই আদিকাল থেকে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে সমাজের মধ্যে যে গাত্রদাহ—সেসবের ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশই যেন দেখা গেল। এখানে কেবল একজন নারীকেই নয়, একজন শিক্ষককেও তাঁর শিক্ষকতার যোগ্যতা, চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে কাঠগড়ায় তোলা হলো।

সাইবার বুলিংয়ের মুখে পড়া সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের শিক্ষক বিউটি রানী পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে।

বিউটি রানী পালের প্রতি হওয়া এই ডিজিটাল হেনস্তার প্রতিবাদে সারা দেশের হাজারো শিক্ষক-শিক্ষিকা একযোগে রাস্তায় নামেননি, গাড়ি আটকে দেননি, কোনো ভাঙচুর চালাননি বা হিংসাত্মক স্লোগান দেননি। তাঁরা বেছে নিয়েছেন শিল্প ও প্রতিবাদের এক অনুপম নান্দনিক ভাষা।

সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা ওই একই গান ব্যাকগ্রাউন্ডে দিয়ে ফেসবুকে একের পর এক রিল পোস্ট করতে শুরু করলেন। বাদ যাননি পুরুষ সহকর্মীরাও; বগুড়া, ঢাকা, কুমিল্লা ও বরিশাল থেকে শিক্ষকেরা হেঁটে, ইউকেলেলে বাজিয়ে কিংবা গান গেয়ে যোগ দিলেন এই মিছিলে।

গোপালগঞ্জের এক প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক আফরোজা লিপি স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে গানের ভিডিও দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছেন: ‘সমালোচনা আমারও হতে পারে; কারণ, আমি শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, খেলাধুলা, নাচ, গান, কবিতা, অভিনয়, বিতর্ক সবকিছু আমাকে শেখাতে হয় এবং শেখাই কারণ, আমি শিক্ষক। এটা আমার পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্য; ‌যা আমি সঠিকভাবে পালন করি।’

বরিশালের শিউলি রানী ওই গানের সঙ্গে সমুদ্রসৈকতে হেঁটে বেড়ানোর ভিডিও দিয়ে সপাটে প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘আমাদের শিশুদের নাচ, গান, অভিনয় শেখাতে হবে; কিন্তু আমরা ভিডিও দিতে পারব না? কারণ, আমরা শিক্ষক?’

মাদারীপুরের এক স্কুলশিক্ষক শিরিন সুলতান সম্পা এই গানের সঙ্গে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাচ্চারা তাঁকে জড়িয়ে ধরছে, বাচ্চাদের তিনি মাতৃস্নেহে আদর করছেন। আর ক্যাপশনে লিখেছেন: ‘হোক না নীরব প্রতিবাদ, শিক্ষকেরাও মানুষ। শিক্ষকদের শখ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে, স্কুলের প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণি ছুটি হয়ে গেলেও ওরা দাঁড়িয়ে ছিল আমার অপেক্ষায়।’

প্রতিবাদের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা

সমাজবিদ ও তাত্ত্বিকেরা বহুদিন ধরে ‘অ্যাস্থেটিকস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিবাদের সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলছেন। ফরাসি সমাজ-দার্শনিক জাক র‍্যানসিয়ের একটি আলোচিত বই দ্য পলিটিকস অব অ্যাস্থেটিকস। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, যেকোনো সামাজিক আন্দোলন তখনই শক্তি লাভ করে, যখন তা সমাজে নতুন কোনো রূপকল্প, নতুন ভাষা ও সুরের জন্ম দেয়। র‍্যানসিয়ের মতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখন শিল্প ও ঐক্যের সংমিশ্রণ ঘটে, তখন তা বিদ্যমান শাসক বা নীতি পুলিশদের দমন–পীড়নের ভাষাকে অকার্যকর করে দেয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গ্রাফিতি, দেয়াললিখন ও স্লোগানে এর দারুণ প্রয়োগ, বাস্তবায়ন বা বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি। আবার জুলাইয়ের পর নারীদের ওপর অফলাইন-অনলাইনে হেনস্তা ও উগ্রবাদী আচরণ কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে, সেটিও আমরা জানি। ফলে বিউটি রানী পালের পাশে দাঁড়িয়ে সারা দেশের শিক্ষকদের এই গণসংহতিও নান্দনিক প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। এখানে প্রতিবাদ কোনো ভয় দেখায়নি; বরং শিল্প আর সৌন্দর্যের শক্তিতে অসাধু মানসিকতাকে চরমভাবে পাল্টা আঘাত করেছে।

শিক্ষকতা পেশার প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবজ্ঞা, কর্মজীবী নারীদের হেনস্তা ও সংস্কৃতিচর্চাকে কোণঠাসা করে রাখার অপচেষ্টা—সবকিছুর বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত ও সংহতিমূলক যে নান্দনিক প্রতিবাদ দেখালেন আমাদের শিক্ষকেরা, তা অনন্য নজির হয়েই থাকবে।

বিখ্যাত মার্কিন নারীবাদী লেখক ও সমাজবিজ্ঞানী বেল হুকস প্রতিবাদের নান্দনিকতাকে শোষিতের আত্মপ্রকাশের অন্যতম প্রধান রূপ হিসেবে দেখেছেন। নিপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গ সমাজকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দেখান, শোষিত বা প্রান্তিক মানুষের জন্য সৌন্দর্য ও শিল্প সৃষ্টি করাটা নিজেই একটি বড় প্রতিবাদ। হুকস এমনকি এই সৌন্দর্যের মূল্যকে ভোগবাদ ও বস্তুবাদের বিপরীত হিসেবেও দাঁড় করান। তাঁর যুক্তি, সৌন্দর্যের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া ও তার প্রশংসা করতে শেখাও একধরনের প্রতিরোধ।

সরকারি চাকরিতে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রান্তিক গোষ্ঠীই বলতে হবে। তাদের বঞ্চনা-গঞ্জনা ও অপ্রাপ্তির শেষ নেই। উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, আমাদের দেশে তা ভাবাই যায় না। আমাদের প্রাইমারি শিক্ষার শিক্ষকেরা যেভাবে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা অধিকারের জন্য রাস্তায় নামেন, তা–ও নিশ্চয়ই সেসব দেশেও ভাবনার বাইরে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা একই গানের সঙ্গে নিজেদের রিল তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন

আজকের উন্নত বিশ্বে এবং বাংলাদেশের আধুনিক পাঠদানের পদ্ধতিতে শিক্ষকেরা ক্লাসরুমে শিশুদের সঙ্গে নেচে, গেয়ে, পাখির মতো উড়ে উড়ে খেলাচ্ছলে পড়াশোনা শেখান। এতে শিক্ষার মধ্যকার ‘ভীতি’ দূর হয়, শিশুরা আনন্দ পায়। অথচ আমাদের সমাজের একাংশ যখন শিশুদের এই আনন্দের শিক্ষাকে ‘ধর্মীয় নিক্তি’তে ফেলে শিক্ষকদের ব্যক্তিজীবনকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অপমান করে, তখন বুঝতে হবে এটি কেবল শিক্ষকের ওপর আক্রমণ নয়, এটি পুরো শিশুমনের বিকাশের ওপর এক বড় আঘাত।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘একজন শিক্ষক কখনোই সত্য অর্থে শিক্ষা দিতে পারেন না, যতক্ষণ না তিনি নিজে শিখছেন। একটি প্রদীপ কখনো অন্য প্রদীপকে প্রজ্বালিত করতে পারে না, যদি না তার নিজের শিখায় আগুন জ্বলতে থাকে।’ ক্লাসরুমে শিশুকে একজন শিক্ষক কীভাবে সৃজনশীলতার চর্চার মাধ্যমে পাঠদান করবেন, যদি তিনি নিজেই সেই সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত না হন, একে ধারণ না করেন?

নাগরিক স্বাধীনতা ও সরকারি বিধিমালা

একজন শিক্ষক পেশাগত পরিচয়ের বাইরে একজন স্বাধীন নাগরিক। তাঁর ভালো লাগা, ভালোবাসার পোশাক পরা, গান শোনা এবং নিজেকে প্রকাশ করার পূর্ণ অধিকার তাঁর সংবিধান প্রদত্ত স্বাধীনতা। হ্যাঁ, এখানে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, শিক্ষকের এমন আচরণ তথা নেচে–গেয়ে রিল বানানো সরকারি চাকরির বিধিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ?

সরকারি কর্মচারীদের আচরণ বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ প্রযোজ্য। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই বলা নেই যে সরকারি কর্মচারীরা গান, নাচ বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে পারবেন না। কারণ, এ বিধিমালা যখন প্রণয়ন বা বাস্তবায়িত হয়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই ছিল না। তবে এ বিধিমালায় আচরণ বিধিমালায় সরকারি কর্মচারীদের দায়িত্বশীল আচরণ, কর্তব্য পালনে সতর্কতা এবং চাকরির মর্যাদা বজায় রাখতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরে ২০১৯ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন বিষয় যেন প্রকাশ না করা হয়। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের এমন কোনো তথ্য বা বক্তব্য প্রকাশ না করার নির্দেশনা রয়েছে, যাতে সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। সর্বোপরি এ নির্দেশিকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বিউটি রানী পালের ভিডিওতে এমন কোনো অসংগতি চোখে পড়ে না, যা সরকারি চাকরির আচরণ বিধিমালা বা নির্দেশিকাকে লঙ্ঘন করে। তবে তিনি বা তাঁর কোনো সহকর্মী যদি কর্মস্থলে এমন কোনো ভিডিও বানান, যাতে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয় এবং অল্প বয়সী শিক্ষার্থীরাও অযাচিত রিলস বা ভিডিও বানানোর প্রতি উৎসাহিত হয়, তাহলে এ নিয়ে সমালোচনা হতে পারে; কিন্তু যেভাবে তাকে আক্রমণ করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই নয়।

দেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে এর অর্জন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বা হতাশা নিয়ে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে দেশের বাইরে ভারতে শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম নিয়ে চলছিল জেন–জির আন্দোলনের জোয়ার। এর ফাঁকে আমাদের শিক্ষকেরা নীরবে এ ডিজিটাল প্রতিবাদ গড়ে তুললেন।

শিক্ষকতা পেশার প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবজ্ঞা, কর্মজীবী নারীদের হেনস্তা ও সংস্কৃতিচর্চাকে কোণঠাসা করে রাখার অপচেষ্টা—সবকিছুর বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত ও সংহতিমূলক যে নান্দনিক প্রতিবাদ দেখালেন আমাদের শিক্ষকেরা, তা অনন্য নজির হয়েই থাকবে।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com

    মতামত লেখকের নিজস্ব