এক অটিস্টিক শিশু খেলা করছে
এক অটিস্টিক শিশু খেলা করছে

মতামত

অটিজম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: শিক্ষার নতুন দিক

বাংলাদেশে অটিজম শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় লক্ষ্য। শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি আইনের আওতায়, সব ভিন্ন সক্ষমতার শিক্ষার্থী সাধারণ বিদ্যালয়ে তাদের সহপাঠীর সঙ্গে পড়াশোনা করার অধিকার রাখে (প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩, ধারা ১৬(জ))।

অটিজম হলো মস্তিষ্কের ভিন্ন বিকাশজনিত একটি স্নায়বিক অবস্থা। অটিজম–সম্পর্কিত অনেক ভুল ধারণা শিক্ষার্থী ও সমাজে এখনো প্রচলিত, যা শিক্ষার সুযোগ ও সামাজিক বিকাশে বাধা দেয়। তাই স্কুলগুলোতে অটিজম সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। অটিজমের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক, অভিভাবক, সহপাঠী ও বিদ্যালয়ের সব সদস্য যদি বৈশিষ্ট্য ও সহায়তার উপায় সম্পর্কে সচেতন হন, শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে।

সুসংগঠিত পরিবেশ, নিয়মিত রুটিন এবং স্পষ্ট নির্দেশনা অটিজম শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও সামাজিক ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি করতে সাহায্য করে। ভিজ্যুয়াল সময়সূচি, ছবি ও সংকেত দৈনন্দিন কার্যক্রম বোঝাতে সাহায্য করে এবং উদ্বেগ কমায়। শিক্ষার্থীর আগ্রহকে পাঠের সঙ্গে যুক্ত করলে শেখার আগ্রহ ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, চিত্রাঙ্কন, গান বা বিশেষ কোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলে, সেই সুযোগ দিলে শেখার আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা মানে সবাইকে একইভাবে শেখানো নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা।

শুধু তাই নয়, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের নিজস্ব গতিতে শেখার সুযোগ দেয় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। প্রযুক্তি, যেমন যোগাযোগ অ্যাপ বা ভিডিওভিত্তিক শেখার পদ্ধতি, অংশগ্রহণ ও নির্ভরশীলতা বাড়ায়। আইইপি (IEP) প্রতিটি শিক্ষার্থীর আলাদা প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার পথ নির্ধারণে সাহায্য করে এবং উন্নতির প্রক্রিয়া দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা যায়। শিক্ষক, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞদের যৌথ অংশগ্রহণে পরিকল্পনা তৈরি হলে ফলাফল আরও ভালো হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যকর করতে নীতি পরিবর্তন, পর্যাপ্ত তহবিল, প্রশিক্ষিত জনবল, উপযুক্ত অবকাঠামো ও সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অভিভাবক ও শিক্ষকের নিয়মিত যোগাযোগ শিক্ষার্থীর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক নেতিবাচক মনোভাব অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা সৃষ্টি করে। স্থানীয় নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তি ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে অটিজম শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব। সীমাবদ্ধতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; সামাজিক নেতিবাচক মনোভাব ও অপর্যাপ্ত সুযোগও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিতে বাধা দেয়। তাদের অধিকার ও সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা শুধু শিক্ষাব্যবস্থা নয়; এটি সমতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতিফলন। সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে শুধু অটিজম শিক্ষার্থী নয়, প্রতিটি শিক্ষার্থী মেধার বিকাশের সমান সুযোগ পাবে। আইন শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর উদ্দেশ্য হলো সমাজের সব ক্ষেত্রে সবাইকে যোগ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা।

  • ড. তানিয়া জেরিন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষক