রাজনীতি

আড়াই মাসেই জন–আস্থার পরীক্ষায় সরকার

বিএনপি সরকারের বয়স আড়াই মাসের একটু বেশি। এই অল্প সময়েই সরকারকে একসঙ্গে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—সংস্কার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়োগে বিতর্ক, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি পরিস্থিতি এবং বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য তাই শুরুতেই বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে, জন–আস্থা ধরে রাখা।

সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিক। দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। নির্বাচনের আগে এসব ছিল বিএনপির বড় অঙ্গীকার। অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আন্তরিকতা ও সাদামাটা চালচলন দৃষ্টিগ্রাহ্য হলেও সেটির প্রতিফলন এখনো পুরো সরকার, প্রশাসন ও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান হয়নি। বরং সংস্কার প্রশ্নে দ্বিধা, কিছু নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় সরকারের যোগাযোগ-দুর্বলতা মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলোর ওপর নজর রাখছেন, এমন ব্যক্তিরা বলছেন, ছোট ইস্যু থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও সাধারণ মানুষ বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না

কৃষি ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি কার্যকরে সরকারের পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মনে করেন অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক—এটা প্রমাণ করা জরুরি। তবে জরুরি সংকটগুলো নিয়েও জনগণের কাছে পরিষ্কার ব্যাখ্যা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সরকারের প্রতি জন–আস্থা বাড়বে।

এর মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে দলের নেতাদের প্রশাসক বসানো নিয়েও সমালোচনা আছে। এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানসহ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারকে মূল এজেন্ডা হিসেবে সামনে আনে। বিএনপিও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয়ে একমত। কিন্তু এখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দলটির দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। সমালোচকেরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি স্বাধীন করার বদলে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বজায় রেখে নিজেদের মতো করে সংশোধনের চেষ্টা চলছে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংস্কার প্রতিশ্রুতির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম আবেগ ছিল গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি। সরকার গঠনের শুরুতেই গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু গুম প্রতিরোধবিষয়ক অধ্যাদেশটি নির্ধারিত সময়ে সংসদে অনুমোদন করেনি সরকার। ফলে গুমের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের পরিবর্তে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিই বহাল থাকবে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী ১২ এপ্রিল বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন, দুদক সংশোধন অধ্যাদেশসহ ১৬ অধ্যাদেশ আরও যাচাই-বাছাই করে সংসদে নতুন বিল হিসেবে আনা হবে। তবে কোন বিল কবে আনা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পদ্ধতি নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, যেভাবে বিষয়গুলো এগিয়েছে, তাতে মানুষের মনে আস্থার চিড় ধরেছে। জনমনে আস্থা পুনর্বহাল করতে হলে বিএনপিকে সংসদে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সাংবিধানিক সংশোধনী ও আইন প্রণয়ন করতে হবে।

বিএনপির একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে দলের ভেতরেও অস্বস্তি আছে। তবে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। তাঁদের কারও কারও মতে, যেসব সংস্কারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হওয়ার কথা নয়, সেগুলো নিয়েও গড়িমসি করা রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শিতার পরিচয় হবে না। নাগরিক সমাজেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান ১৯ এপ্রিল ঢাকায় এক আলোচনায় বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম কিছুদিনের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, পুরোনো বন্দোবস্তেরই অনুসরণ চলছে।

সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর চাপও বাড়ছে। রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কারের পক্ষে নয়। গণভোট–সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত না করার বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখা হবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধী দলগুলো গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও সতর্ক করেছে, বিএনপি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে বলে মনে হলে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে পারে।

সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানি পরিস্থিতিতেও সরকারের যোগাযোগ-দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। আগের সরকারের নীতিগত ত্রুটি এবং ইরান ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতির অভিঘাত থাকলেও সরকার তা মানুষের কাছে সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি। উপরন্তু শুরুতে বলা হয়েছে, জ্বালানির কোনো সংকট নেই। কিন্তু রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং সরকারের সেই বক্তব্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

সরকার গঠনের পর দল হিসেবে বিএনপি, সরকার ও সংসদের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা গেছে। মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদের আকার, দায়িত্ব বণ্টন, জ্যেষ্ঠ নেতাদের বাদ পড়া এবং কিছু প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা আছে। সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমও অনেকটা স্থবির। অর্থনীতির দিক থেকেও সরকারের জন্য পরিস্থিতি চাপের। সামনে জাতীয় বাজেট; অথচ রাজস্ব আহরণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ—দুই দিকেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে।

এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলোর ওপর নজর রাখছেন—এমন ব্যক্তিরা বলছেন, ছোট ইস্যু থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও সাধারণ মানুষ বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছে না। এই বহুমাত্রিক অস্বস্তির অভিঘাত শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে ভোগাতে পারে।

  • সেলিম জাহিদ বিশেষ প্রতিনিধি, প্রথম আলো

  • মতামত লেখকের নিজস্ব