দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোট হবে সংস্কার তথা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর হাবভাবে অবশ্য বোঝা দুষ্কর রক্তরঞ্জিত জুলাই পেরিয়ে আসা এই দেশে ইনসাফ কায়েমই মানুষের আদি ও অন্তিম চাওয়া। বৈষম্যহীন সমাজের গোড়াপত্তনে দরকার দায় ও দরদের রাজনীতি। জান ও জবানের হেফাজত জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকারই নিশ্চিত করতে পারে।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অনেকেই একাত্তরের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিণতির পুনরাবৃত্তি দেখতে শুরু করেছেন! বারবার চুন খেয়ে মুখ পুড়লেও দই দেখে ভয় পাবেন না, এমন আশ্বাসের অসারতা নিয়ে আলাপ বাহুল্য।
পুরোনো ক্ষতের চেয়ে নতুনটি বেশি পীড়া দেয়, দেখায় তা বেশি দগদগে। মানুষ তাই অতীতের বঞ্চনা যত সহজে ভোলে, বর্তমানের আশাভঙ্গ ততটা সহজে হজম করতে পারে না। চব্বিশের জুলাইয়ের গনগনে দিনে যাঁরা রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের অনেকেরই মনে এখন ‘মাঘের শীত’! তাঁদের সামনে কুয়াশামোড়া দিগন্তের ওপারে অচেনা ভবিষ্যৎ! অথচ আগামী দিনটি কেমন হবে, সেই ফয়সালা করার জন্যই তো ‘জুলাই’ এসেছিল।
আওয়ামী লীগের শ্বাসরোধী শাসনের অবসানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে মনে হয়েছিল ‘আশার বাতিঘর’। এই সরকারের মোটাদাগে তিনটি ম্যান্ডেট—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। বিচারের কাজ শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি মামলার রায়ও ঘোষণা হয়েছে। ঘনিয়ে আসছে ভোটের দিনও। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংস্কারের কতটা, কী হলো?
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গত অক্টোবরে তৈরি করা হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এ সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হবে গণভোট।
এসব প্রস্তাবকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে একটি প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। এই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে জনগণকে তাঁদের মত জানাতে হবে। নানা মহল থেকে অনেকেই বলছেন, গণভোটের প্রশ্ন বেশ জটিল, সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কঠিন। এসব সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে ধারণা নেই বেশির ভাগ মানুষেরও।
দেশের শতকরা ২২ ভাগ মানুষ নিরক্ষর—এ কথা মনে রেখেও যদি যাঁরা পড়তে পারেন, তাঁদের সবার কথা ভাবা হয়, তবে দেখা যাবে কেবল ভাষাগত কারণে অনেকের জন্যই গণভোটের প্রশ্ন পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। দুজন ছোট ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হলো। দুজনেরই সরল স্বীকারোক্তি, গণভোট নিয়ে তাঁরা অন্ধকারে। যদিও তাঁরা কমবেশি লেখাপড়া জানেন।
‘সাধারণ মানুষ’ বলতে মূলত কৃষক-শ্রমিক-শ্রমজীবীদেরই বোঝানো হয়। যাঁদের বেশির ভাগ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থেকে দূরে, দেশ-দশ নিয়ে তেমন ধারণা রাখেন না। গ্রামবাংলার বৃহত্তর নারী সমাজ, বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষও এই কাতারভুক্ত। তবে পিছিয়ে পড়া এসব পরিবারের অনেকেই এখন লেখাপড়া করে ‘জাতে’ উঠে আসছেন। তাঁদের বাস শহরাঞ্চলে, চাকরি-বাকরি করে খাচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁরা আর পশ্চাৎপদ নন, ‘সচেতন’ মানুষ, চোখ-কান খোলা। তেমন তিনজন চাকুরের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, গণভোট নিয়ে তাঁদের ধারণাও ভাসা–ভাসা। ঠিক কী করা উচিত, তাঁরা এখনো জানেন না। উপরন্তু সংস্কারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁরা হতাশ।
দেশের শতকরা ২২ ভাগ মানুষ নিরক্ষর—এ কথা মনে রেখেও যদি যাঁরা পড়তে পারেন, তাঁদের সবার কথা ভাবা হয়, তবে দেখা যাবে কেবল ভাষাগত কারণে অনেকের জন্যই গণভোটের প্রশ্ন পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। দুজন ছোট ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হলো। দুজনেরই সরল স্বীকারোক্তি, গণভোট নিয়ে তাঁরা অন্ধকারে। যদিও তাঁরা কমবেশি লেখাপড়া জানেন।
নোকতা দিয়ে রাখা যাক, সর্বশেষ ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে গণভোট হয়েছিল। ওই গণভোটে মাত্র ৩৫ ভাগ ভোটার তাঁদের মত জানিয়েছিলেন। অথচ এর সাত মাস আগে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৫৫ ভাগের বেশি।
প্রচার-প্রচারণা দিয়ে যদি ‘ঘাটতি’ পুষিয়েও দেওয়া যায় এবং শেষতক যদি ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়, তা হলেও কি ফ্যাসিবাদের দৈত্য কৌটায় ধরা যাবে? বৈষম্যহীন যে সমাজ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অদম্য আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে এত মানুষের আত্মত্যাগ, আবারও ‘লাল’ হলো পদ্মা-মেঘনার পানি, অনাগত দিনে তার মহিমা কি সমুজ্জ্বল থাকবে?
‘কীভাবে জুলাই সনদ লঙ্ঘন করা যায়, সেই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে পরবর্তী সরকারের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার’—টিআইবির এই পর্যবেক্ষণে প্রশ্নগুলো কশাঘাতের মতো ঠেকে! দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটির ভাষ্য, সংস্কারবিরোধী অপশক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে। সংস্কার-পরিপন্থী অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। মোদ্দাকথায়, সরকারের কর্মকাণ্ড ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’ ছাড়া কিছু নয়।
দেশের আমজনতার কাছে সংবিধান মূলত একটা ‘বই’। কেননা রাষ্ট্র-সমাজ-সংসারকে পাঠ করেন তাঁরা তাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। দুটো খেয়ে-পরে নিরাপদে বেঁচে থাকাই যখন ‘দায়’, তখন সংবিধানে কোন ধারা যুক্ত হলো, আর কোন ধারা রদ হলো, তার আর কোনো মানে থাকে কি?
শুধু ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান নয়, বর্ষা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানুষ চেয়েছিল পুরোনোর মৃত্যু হবে, জন্ম হবে নতুনের। পাথরে ফুল ফোটার মতো ‘মিরাকল’ কিছু নয়, বাস্তবের মাটিতেই ফলবে হরেক শস্য। বাংলাদেশের মাটির সেই উর্বরতা আছে, দরকার শুধু সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ।
হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক।
ই–মেইল: hello.hasanimam@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব