মতামত

শক্তিশালী সরকার কি মানবিক হতে পারে

একজন দোকানদার মাসের শুরুতে হিসাব মেলাতে বসেছেন। বিদ্যুতের খরচ, পরিবহনভাড়া ও পণ্যের দাম বেড়েছে। তার ওপর যদি ব্যবসা চালাতে কাউকে নিয়মের বাইরে টাকা দিতে হয়, তাঁর কাছে রাষ্ট্রের শক্তি সম্পর্কে বক্তৃতার কোনো মূল্য থাকে না। তিনি একটি সহজ প্রমাণ চান: অভিযোগ করলে পুলিশ আসবে, তদন্ত করবে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠলেও থেমে যাবে না। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের শক্তির পরীক্ষা সেখানেই।

সরকারের সামনে সমস্যাগুলো বাস্তব। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবার ও ব্যবসার ব্যয় আরও চাপে পড়েছে; জ্বালানিসংকটে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ও চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সব সমস্যার দায় এক সরকারের ওপর চাপালে যেমন পূর্ববর্তী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও আন্তর্জাতিক ধাক্কা আড়াল হয়, তেমনি সবকিছুকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা বললে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব এড়ানো হয়। মানুষ শেষ পর্যন্ত বিচার করে আজ তাদের জীবন কতটা নিরাপদ ও স্বস্তির। 

কঠোর হলেই সরকার শক্তিশালী হয় না। যে সরকার সমালোচককে ভয় দেখাতে পারে কিন্তু চাঁদাবাজকে থামাতে পারে না, তার ক্ষমতা আছে; কার্যকর কর্তৃত্ব নেই। শক্তিশালী সরকার আইন প্রয়োগে দৃঢ়, নিজের ভুল স্বীকারে সৎ এবং নাগরিকের সঙ্গে আচরণে সংযত। তার পুলিশ অপরাধীর কাছে কঠিন, অভিযোগকারীর কাছে সহজলভ্য। এই পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সেটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার ভিত্তি হয়ে উঠবে।

প্রথম সাহসী সিদ্ধান্তটি আসতে হবে সরকারি দল থেকেই। প্রধানমন্ত্রী ও দলের নেতৃত্ব যৌথভাবে ঘোষণা করতে পারেন: দলীয় পরিচয় কোনো অপরাধের ঢাল হবে না। ঘোষণা বিশ্বাসযোগ্য করতে পরিবহন টার্মিনাল, বাজার, নির্মাণকাজ ও স্থানীয় ব্যবসাকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগের জন্য স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা গড়তে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তদন্ত চলাকালে তাঁদের দলীয় দায়িত্ব থেকে সরাতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁদের সম্মান পুনরুদ্ধারের পথও থাকতে হবে। গ্রেপ্তারের ছবি প্রকাশ নয়; তদন্ত, বিচার ও সিদ্ধান্তের অগ্রগতি প্রকাশই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।

বিরোধী দল, সাংবাদিক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা অধিকারকর্মীর সমালোচনা শুনলে সরকার দুর্বল হয় না। বরং কোথায় নীতি কাজ করছে না, তা আগেভাগে জানতে পারে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সহিংসতার অভিযোগ হলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দলীয় আনুগত্য দেখে আইনের প্রয়োগ বদলে গেলে মানুষ পরের নির্বাচনের ফল নয়, রাষ্ট্রের ন্যায্যতাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হতে হবে প্রতিটি থানাকে জনসেবার দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান করা। থানায় অভিযোগ গ্রহণের রসিদ বাধ্যতামূলক হোক। অভিযোগকারী ফোনে, সরাসরি অথবা সহজ অনলাইন ব্যবস্থায় তাঁর অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নথিভুক্ত না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যাবে। প্রতি মাসে জেলা অনুযায়ী প্রকাশ করা হোক—কত অভিযোগ এসেছে, কতটি তদন্ত শুরু হয়েছে, কতটির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং পুলিশের আচরণের বিরুদ্ধে কত অভিযোগের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখেই এই হিসাব দেওয়া সম্ভব। পুলিশকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিবেশ দিতে হবে; একই সঙ্গে বেআইনি বলপ্রয়োগ ও ঘুষের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এতে পুলিশের মর্যাদা ও জবাবদিহি একসঙ্গে বাড়তে পারে।

তৃতীয় পদক্ষেপ হতে হবে চাঁদাবাজির অর্থনৈতিক পথ বন্ধ করা। শুধু কয়েকজন আদায়কারীকে ধরলে তাদের জায়গায় অন্যরা আসতে পারে। কোথায়, কী নামে, কার মাধ্যমে টাকা আদায় হয়, সেই ব্যবস্থাটি শনাক্ত করতে হবে। টার্মিনাল ও বাজারে অনুমোদিত ফি প্রকাশ্যে টাঙানো এবং সম্ভব হলে রসিদসহ ডিজিটাল পরিশোধ চালু করা উচিত। ব্যবসায়ীরা নিরাপদে অভিযোগ করতে পারবেন; অভিযোগের পর তাঁদের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বও প্রশাসন নেবে। কোনো এলাকায় একই অভিযোগ বারবার উঠলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কাজ পর্যালোচনা করতে হবে। 

অর্থনীতিতে সরকারের দৃঢ়তা বোঝা যাবে কঠিন সত্য বলার ক্ষমতা দিয়ে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির কারণ, সম্ভাব্য মেয়াদ, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহায়তা—এসব স্পষ্টভাবে জানাতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, কৃষি ও খাদ্যের দামে কীভাবে পড়ছে, তা নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। 

সীমিত সরকারি অর্থ দিয়ে সবার জন্য একই ছাড় দেওয়ার বদলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পরিবার ও ছোট উৎপাদকদের লক্ষ্য করে সময়সীমাবদ্ধ সহায়তা দেওয়া বেশি যুক্তিসংগত। ব্যবসার জন্য জরুরি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সিদ্ধান্তও প্রকাশ্য মানদণ্ডে নিতে হবে, যাতে প্রভাব নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজন অগ্রাধিকার পায়।

আরেকটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হতে পারে ‘১০০ দিনের সরকারি সেবা পরীক্ষা’। জন্মনিবন্ধন, জমির নামজারি, ব্যবসার অনুমতি ও সামাজিক সহায়তার মতো কয়েকটি সেবা বেছে নিয়ে সরকার ঘোষণা করুক: কোন সেবা পেতে কত দিন ও কত টাকা লাগবে। নির্ধারিত সময় পেরোলে আবেদনকারী কারণ জানতে এবং প্রতিকার চাইতে পারবেন। প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হবে কত আবেদন সময়মতো শেষ হয়েছে। এতে নাগরিক প্রথমবারের মতো নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে দেখতে পারবেন। সব মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে কয়েকটি সেবায় মাপা যায়, এমন পরিবর্তন ঘটানো আস্থা ফেরানোর ভালো শুরু।

মানবিক সরকারের আরেকটি পরীক্ষা হলো, ভিন্নমতকে দেখার দৃষ্টি। বিরোধী দল, সাংবাদিক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা অধিকারকর্মীর সমালোচনা শুনলে সরকার দুর্বল হয় না। বরং কোথায় নীতি কাজ করছে না, তা আগেভাগে জানতে পারে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সহিংসতার অভিযোগ হলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দলীয় আনুগত্য দেখে আইনের প্রয়োগ বদলে গেলে মানুষ পরের নির্বাচনের ফল নয়, রাষ্ট্রের ন্যায্যতাকেই সন্দেহ করতে শুরু করে।

সরকার চাইলে প্রতি তিন মাসে একটি সংক্ষিপ্ত ‘জন–আস্থার হিসাব’ দিতে পারে। সেখানে থাকবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি সরবরাহ, চাঁদাবাজির অভিযোগ ও নিষ্পত্তি, পুলিশি আচরণের অভিযোগ, সরকারি সেবার অপেক্ষার সময় এবং কর্মসংস্থানের কয়েকটি সূচক। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে কেন হয়নি, সেটিও মন্ত্রীরা ব্যাখ্যা করবেন। সব সংখ্যা ভালো দেখাতে হবে—এমন কোনো শর্ত থাকবে না। কারণ, খারাপ খবর গোপন করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়; ভুল স্বীকার করে তা সংশোধনের পথ দেখালে দীর্ঘস্থায়ী বিশ্বাস তৈরি হয়।

এসব উদ্যোগের ঝুঁকিও আছে। ডিজিটাল অভিযোগব্যবস্থা দরিদ্র বা প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত মানুষকে বাইরে রাখতে পারে; তাই সরাসরি অভিযোগের পথ রাখতে হবে। দ্রুত নিষ্পত্তির চাপ পুলিশকে অভিযোগ অগ্রাহ্য করতে উৎসাহিত করতে পারে; তাই শুধু নিষ্পত্তির সংখ্যা নয়, অভিযোগকারীর অভিজ্ঞতাও যাচাই করতে হবে। দলীয় নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী বলা যাবে না; আবার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দলীয় প্রভাব দিয়ে তাঁকে রক্ষা করাও চলবে না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়তে এই সূক্ষ্ম ন্যায়বোধ জরুরি।

বাংলাদেশের মানুষ সর্বক্ষমতাবান সরকার চান না; তাঁরা এমন সরকার চান, যার ক্ষমতা প্রয়োজনের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ায় এবং যার কাছে ক্ষমতাবানকেও জবাব দিতে হয়। একজন দোকানদার যদি চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা করতে পারেন, একজন নারী যদি নিরাপদে থানায় অভিযোগ জানাতে পারেন, একজন তরুণ যদি পরিচয় ছাড়াই সরকারি সেবা পান এবং একজন সমালোচক যদি ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারেন—তখনই রাষ্ট্রের শক্তি মানুষের জীবনে পৌঁছাবে। মর্যাদাপূর্ণ জাতির ভিত্তি বড় ঘোষণা নয়, প্রতিদিনের এই নিশ্চয়তা।

● ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন, ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

akmahsanullah@gmail.com

* মতামত লেখকের নিজস্ব