মতামত

শিশুহত্যা: আড়ালে থেকে যাচ্ছে বড় যে সংকট

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আট বছর বয়সী এক শিশুকে গলা কেটে হত্যা কিংবা রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনা দেশজুড়ে গভীর ক্ষোভ ও আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। দ্রুত তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে ঘটনাগুলো ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যেসব শিশুহত্যার ঘটনা জাতীয় আলোচনায় আসে না, তাদের কী হয়?

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে।

জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি এ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—মাত্র ছয় মাসে দেশে অন্তত ৮৬ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি মেয়ে, ৩৬টি ছেলে এবং ৩ শিশুর পরিচয় জানা যায়নি। তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের পুরো বছরে শিশুহত্যার সংখ্যা ছিল ১২৪। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৪ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

প্রায় অর্ধেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পারিবারিক পরিসরে। আবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনা ঘটেছে জনপরিসরে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েশিশুরা হত্যার আগে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে, আর ছেলেশিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়েছে পারিবারিক বিরোধ কিংবা জনপরিসরের সহিংসতায়।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন একটি জাতীয় সংকট এবং সেই সংকট মোকাবিলাকে জাতীয় অগ্রাধিকারেই পরিণত করতে হবে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী অপরিচিত কেউ নয়; বরং শিশুর পরিচিত মানুষ। মা–বাবা, সৎবাবা বা সৎমা, আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রতিবেশীরাই অনেক ঘটনায় দায়ী। প্রতিবেদনে দেখা যায়, অন্তত ১৭টি হত্যাকাণ্ডে মা-বাবা এবং ১১টিতে নিকটাত্মীয় জড়িত ছিলেন। আরও ২২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তি। শিশুহত্যার ঘটনাগুলো একটি কঠিন বাস্তবতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে শিশুদের ওপর।

মা-বাবার হাতে সন্তান হত্যার ঘটনাও বাড়ছে। পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি, রাগ-ক্রোধ, আর্থিক সংকট, পরকীয়াজনিত দ্বন্দ্ব কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতার মতো কারণ বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা কোনোভাবেই এ নির্মমতার গ্রহণযোগ্য কারণ হতে পারে না। এ প্রবণতার পেছনের সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো নিয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন, যাতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়।

শিশুদের পূর্ণ মানুষের মর্যাদা দিতে হবে

বয়স্করা অন্যদের ওপর নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য শিশুদের হত্যা করলে তা খবরের শিরোনাম হয়। কিন্তু নিজেদের জীবনের হতাশার কারণে শিশুদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা আমাদের সমাজে খুব সাধারণ ব্যাপার। ধরা যাক, কোনো এক ব্যক্তি সারা দিন কর্মস্থলে তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন, কিন্তু সেখানে কাউকে কিছু বলতে পারেননি। তিনি ঘরে ফিরে শিশুকে বকাবকি করলেন বা অন্যের কারণে বিরক্ত হয়ে নিজের রাগ ঝাড়লেন শিশুর ওপর।

আমাদের দৈনন্দিন আচরণের মধ্যে শিশুদের প্রতি অসম্মান, অপমান এবং ক্ষমতার অপব্যবহার যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শিশুরা ছোট বলে তাদের মানবাধিকার ও মর্যাদা কারও চেয়ে কম নয়; বরং তাদের সুরক্ষায় আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি। নানা বয়সের শিশুদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি বুঝে তাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কি তা করছি?

আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশুদের কথা মন দিয়ে শুনি না, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিই না। এমনকি অনেক সময় এমন ভাষা ব্যবহার করি, যা তাদের আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসে গভীর আঘাত করে। আমরা প্রায়ই শিশুদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয়; বরং বড়দের অধস্তন হিসেবে দেখি। তাই শিশুরা অনবরত নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশুদের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও মর্যাদাবোধ পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ না হলে সহিংসতার এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

শিশুদের সুরক্ষা হোক জাতীয় অগ্রাধিকার

শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় পদক্ষেপ। শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেই কেবল দ্রুত বিচার হবে—এমন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি শিশুর জীবন সমান মূল্যবান, সে ঘটনা আলোচিত হোক বা না হোক।

বিচারব্যবস্থাকে হতে হবে দ্রুত, কার্যকর ও শিশু-সংবেদনশীল। একই সঙ্গে শিশু আইন, ২০১৩-এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, নারী ও শিশু, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

পরিবারকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মা-বাবাকে এমনভাবে সন্তানদের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কোনো ঝুঁকির মুখোমুখি না হয়।

গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। আলোচিত কয়েকটি ঘটনা প্রকাশের মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিটি শিশুহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার বিচারিক অগ্রগতি অনুসরণ, শিশু অধিকারবিষয়ক ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণমাধ্যম শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারে, তার ওপর। বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকার নিশ্চিত করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন একটি জাতীয় সংকট এবং সেই সংকট মোকাবিলাকে জাতীয় অগ্রাধিকারেই পরিণত করতে হবে।

  • লায়লা খন্দকার উন্নয়নকর্মী