দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের অবস্থান ও পুলিশি বাধা।
দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে আন্দোলনকারীদের অবস্থান ও পুলিশি বাধা।

মতামত

ভারতের ককরোচ আন্দোলন বাংলাদেশকে যে বার্তা দিচ্ছে

গত শতাব্দীর শুরুর দিকে সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিলাসী’ গল্পে লিখেছিলেন—‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’

প্রায় এক শ বছর পর এই বাক্য দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে ফিরে এসেছে। ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথে আজ হাজার হাজার তরুণ ‘তেলাপোকা’ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার বিশাল ‘হস্তী’কেও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁরা দিল্লির রাজপথে নামছেন।

আর বাংলাদেশের জন্য এই আন্দোলন থেকে নেওয়ার মতো অনেক শিক্ষা আছে, যা আমাদের সমাজ ও রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলতে পারে।

কিন্তু এই তেলাপোকা আসলে কতটা শক্তিশালী, তা জানতে গেলে বিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হবে। শরৎচন্দ্র যে তেলাপোকার কথা লিখেছিলেন, তিনি হয়তো জানতেন না যে এই পোকা আসলে কতটা অসম্ভব শক্তিশালী।

২০১৮ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশন’-এ চীনা গবেষকদের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাঁরা দেখেন, তেলাপোকার জিনের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার ৫০০, যা ঘাসফড়িংয়ের চেয়ে দেড় গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, তেলাপোকার পেটে কিছু বিশেষ অণুজীব থাকে, যার কারণে তারা পচা-বাসি খাবারও সহজে হজম করতে পারে।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, তারা নিজের পা হারিয়ে ফেললেও দ্রুত নতুন পা গজাতে পারে। খাবার যত বেশি পাওয়া যায়, পা গজানোর কাজটি তত দ্রুত হয়! এই বৈজ্ঞানিক সত্য রাজনীতিতে এসে দাঁড়িয়েছে এক ভিন্ন অর্থে। যারা অবহেলিত, যাদের অপমান করা হয়, তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে—এটাই হয়তো ইতিহাসের পাঠ।

এই ঐতিহাসিক উক্তি যেন বাস্তবে প্রমাণ করতে ২০২৬ সালের ১৬ মে দিল্লিতে যা ঘটল, তা সত্যিই চমকপ্রদ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একদল বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সমাজের পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন।

এই অপমানের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গঠন করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। নামটি ছিল ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্যারোডি।

মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এর অনুসারী ৩৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ইনস্টাগ্রামে অনুসারী হয় ২ কোটি ২০ লাখের বেশি, যা বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ। অনলাইন থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস এখানে নতুন কোনো বিষয় নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার বছরে (২০১১–২০১৪) ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

আন্দোলনের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করা, কারণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়লে আহত হয় ১৮০ জন। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকেও পুলিশ আটক করলেও আন্দোলন থামেনি। বিক্ষোভকারীরা তাদের মাথায় তেলাপোকার মূর্তি ধারণ করে স্লোগান দিচ্ছে—‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব, আমরা জিতব!’

এখন এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস এখানে নতুন কোনো বিষয় নয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার বছরে (২০১১–২০১৪) ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে (প্রশ্নপত্রের ভুল কি কেবল পূর্ণ নম্বরেই শেষ, দৈনিক প্রথম আলো ১৮ জুলাই , ২০২৬)।

২০০৪ সালে ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা বাতিল হয়েছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে। এরপর ২৫তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষাসহ অসংখ্য চাকরির পরীক্ষা, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে।
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ড্রাইভার আবেদ আলীকে জেলে পাঠিয়েই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রধান কারিগর পাওয়া গেছে বলে রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিরা ঢেকুর তুলেছেন। বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, বারবার প্রতিশ্রুতি, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নেই।

এই পুনরাবৃত্ত ইতিহাসই তৈরি করে তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। অথচ প্রশ্নপত্র ফাঁসকে অনেক সময় ‘মামুলি বিষয়’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু এই ‘মামুলি’ বিষয়ই একদিন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে, যেমনটি দিল্লিতে হচ্ছে। সুতরাং, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমস্যার স্থায়ী সমাধান জরুরি, নইলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাষার রাজনীতি। একটি অসতর্ক শব্দই যথেষ্ট আগুন জ্বালানোর জন্য। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে মন্তব্য করেন। এই একটি শব্দই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলন এতটাই তীব্র হয় যে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। একই ধরনের মানুষের ক্ষোভ দেখা গেল ভারতের ককরোচ আন্দোলনে। প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ শব্দটি তরুণদের মধ্যে এমন ক্ষোভের সঞ্চার করে যে তা রাতারাতি এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নেয়। আর বাংলাদেশেও সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এইচএসসি শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার চিকেন’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন।

ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকদের বিক্ষোভে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ছেন আরএএফের এক সদস্য। নয়াদিল্লি, ভারত, ২০ জুলাই ২০২৬

শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং বৃষ্টি উপেক্ষা করেও দুই দিন রাজপথে অবস্থান নেয়। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সরকার কিছু দাবি মেনে নেয়। এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাজনীতিবিদদের ভাষা সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে। একটি অসাবধান শব্দই আন্দোলনের সূচনা করতে পারে—বাংলাদেশে ‘রাজাকার’, ভারতে ‘তেলাপোকা’—উভয় ক্ষেত্রেই তা প্রমাণিত।

শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ঢেউ বইছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটে তরুণদের আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটে। নেপালেও একই ধরনের যুব আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আন্দোলনগুলো একসূত্রে গাঁথা—রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর হতাশা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, আর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকট। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা—সব দেশেই তরুণেরা একই ভাষায় কথা বলছে, শুধু প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

জনগণের অভিযোগ যখন শোনা হয় না, যখন সাধারণ কথাও অস্বাভাবিক করে তোলা হয়, তখন তরুণেরা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের আশ্রয় নেয়। সংগঠিত রাজনীতি যখন দুর্বল হয়, তখন মানুষ মিম, স্লোগান আর প্রতীকের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাটাই হয়তো সাহসের শেষ রূপ।

বাংলাদেশের উচিত এই পাঠ ভালোভাবে আত্মস্থ করা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে কঠোর হওয়া, রাজনীতিবিদদের বাক্যবাণে সাবধান হওয়া এবং তরুণদের কণ্ঠসারকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, শেষ পর্যন্ত, এই আন্দোলনের রেশ অনেক দিন টিকে থাকবে—তা সফল হোক বা ব্যর্থ। এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে তরুণেরা আর নীরব থাকবে না।

তাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দেওয়া, কারণ তাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই—এই বোধ তৈরি হলে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তির ভূমিকা, যা আমাদের বর্তমান যুগে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল আন্দোলনের জন্মস্থান। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরদিনই অভিজিৎ দীপকে এক্স (টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামে আন্দোলনের ডাক দেন।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা ভাইরাল হয়। দ্বিতীয়ত, মিম ও ব্যঙ্গের ভাষা তরুণদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। চিরাচরিত স্লোগানের পরিবর্তে তারা ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও প্রতীকী লড়াই বেছে নিয়েছে। ‘তেলাপোকা’—যে শব্দটি তাদের অপমান করতে ব্যবহার করা হয়েছিল—সেটিকেই তারা নিজেদের শক্তির প্রতীক বানিয়েছে। তৃতীয়ত, তাৎক্ষণিক সংগঠন—মেসেঞ্জারে একটি টেক্সট পাঠাতে যতটুকু সময় লাগে, ততটুকু সময়েই তারা সংগঠিত হতে পারে।

হাজার হাজার তরুণ রাতারাতি জড়ো হতে পারে। চতুর্থত, ভাইরাল ভিডিও—পুলিশের লাঠিচার্জের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা জনরোষ আরও বাড়িয়ে দেয়। এই প্রযুক্তির শক্তিকেই কাজে লাগিয়েছে ভারতের তরুণেরা।

মানববন্ধনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ককরোচ জনতা পার্টির এক সমর্থক। নয়াদিল্লি, ভারত, ২২ জুলাই

বাংলাদেশের তরুণেরাও ঠিক একই কৌশল ব্যবহার করেছে ‘রাজাকার’ আন্দোলনে এবং ‘ব্রয়লার চিকেন’ প্রতিবাদে। তাই প্রযুক্তির এই শক্তিকে বুঝতে হবে এবং আজকের তরুণেরা অনলাইনেই সংগঠিত হয়, সেখান থেকেই তারা রাজপথে নামে—এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।

সবশেষে, ককরোচ আন্দোলন সফল হবে নাকি ব্যর্থ হবে, সেটি বড় প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হলো—এই আন্দোলন সমাজের নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, অন্যায় জমতে থাকলে যেকোনো সময় তা বারুদে রূপ নিতে পারে।

দিল্লিতে যা ঘটছে, তা বাংলাদেশে আগেই হতে পারত। আর যদি সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, ভবিষ্যতেও হতে পারে। শরৎচন্দ্রের ‘তেলাপোকা’ আজ আর গল্পের চরিত্র নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের প্রতীক—যারা অবহেলিত, অপমানিত, কিন্তু টিকে থাকে। হাতি যেমন লোপ পায়, তেলাপোকা বাঁচে। সেটাই হয়তো ইতিহাসের পাঠ।

বাংলাদেশের উচিত এই পাঠ ভালোভাবে আত্মস্থ করা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে কঠোর হওয়া, রাজনীতিবিদদের বাক্যবাণে সাবধান হওয়া এবং তরুণদের কণ্ঠসারকে গুরুত্ব দেওয়া।
কারণ, শেষ পর্যন্ত, এই আন্দোলনের রেশ অনেক দিন টিকে থাকবে—তা সফল হোক বা ব্যর্থ। এটি একটি মানসিকতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে তরুণেরা আর নীরব থাকবে না। দিল্লির রাজপথে যে আগুন জ্বলছে, তা যেন ঢাকার বুকে না ছড়িয়ে পড়ে, সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

  • ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট