
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন হয়। কাছাকাছি সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ থাকে এক বছর। এমনকি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠিত না হলে পরবর্তী ৯০ দিন পর পুরোনো কমিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর বা বাতিল হয়ে যায়।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান কমিটিগুলো আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করে ফেলবে। কিন্তু নতুন নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা, এ বছর আদৌ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে কি না? কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এই নির্বাচন যদি নিয়মিত না-ই হবে, তবে গত বছর কেন এত ঢাকঢোল পিটিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা হলো?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ও শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যই ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করা জরুরি। এটাকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে আনার দাবি জানিয়ে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই। সেটি করা সম্ভব হলে বিভিন্ন বিভাগ তাদের ক্লাস-পরীক্ষার তারিখও সেই অনুযায়ী ঠিক করতে পারত।
আবার নির্বাচন নিয়মিত করা গেলে এ–সংক্রান্ত নিরাপত্তাজনিত সংকট ও হুমকি কমে যেত। গত বছর ডাকসু নির্বাচন পরিচালনার সূত্রে দেখেছি, তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুলিশ ও জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে নির্বাচন ও তৎপরবর্তী সহিংসতা রোধ করার চেষ্টা করা হয়।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন যদি নিয়মিত করা সম্ভব হতো, তবে ক্যাম্পাসে কোনো সংগঠনই তাদের এখতিয়ারের বাইরে কাজ করতে বা অনিয়ম করতে সাহস করত না। গতবারের নির্বাচিত সংসদের কোনো কোনো সদস্য এমন কিছু কাজ করেছেন, যেগুলো দেশজুড়ে সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
১৯৯০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে মাত্র একবার। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালের আগে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে। প্রায় ৩৩ বছর পর গত বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। প্রায় একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো নির্বাচন হয়নি। অথচ ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে চলা এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছরই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এটি না হওয়ার দরুন ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের মূল দায়িত্ব ও কার্যক্রম থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যেসব ছাত্রসংগঠন রয়েছে, তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত বা সমর্থক হয়েই কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে সরাসরি লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির সুযোগ নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচন কোনো দলীয় প্যানেলের নির্বাচনও নয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা কোনো ব্যানারে বা বিশেষ পরিচয়ে একসঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের কাজ করতে পারেন। কিন্তু নির্বাচিত সংসদ কোনো দলীয় পরিচয় বহন করবে না। কিন্তু গত বছর নির্বাচনের পর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যম সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের দলীয় পরিচয়কে প্রধান করে দেখিয়েছে। পরোক্ষভাবে হয়তো এটাই সত্যি, কিন্তু নির্বাচন আয়োজন ও ছাত্র সংসদ গঠনের বিধিতে এ রকম কিছু নেই।
মানতে দ্বিধা নেই, ছাত্র সংসদ নির্বাচন যদি নিয়মিত করা সম্ভব হতো, তবে ক্যাম্পাসে কোনো সংগঠনই তাদের এখতিয়ারের বাইরে কাজ করতে বা অনিয়ম করতে সাহস করত না। গতবারের নির্বাচিত সংসদের কোনো কোনো সদস্য এমন কিছু কাজ করেছেন, যেগুলো দেশজুড়ে সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ছাত্র সংসদ বা হল সংসদ নির্বাচনে জয়ী প্রার্থীদের কাজের পরিধি কতটুকু, তা গঠনতন্ত্রেই পরিষ্কার লেখা আছে। ছাত্র সংসদ মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। তা ছাড়া আবাসন, পরিবহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁদের সুবিধা বাড়ানোর ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনেও ছাত্র সংসদের ভূমিকা রয়েছে।
এ বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে চাইলে এর প্রক্রিয়া নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে হতে পারে। গত বছর যন্ত্র ও প্রযুক্তির সহায়তায় ফল গণনার কাজটি কেন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা গেল না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ, হাতে ফল গণনা করতে গেলে বিপুল সময়ের প্রয়োজন। তা ছাড়া নির্বাচনের কেন্দ্র কোথায় হবে, কোন শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন, এ ধরনের প্রশ্নও গতবার তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নানা ধরনের অভিযোগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ ছিল না। কারণ, নির্বাচনী বিধিমালা অপূর্ণাঙ্গ রয়ে গেছে, অথবা বিস্তৃত ব্যাখ্যাসহ লেখা হয়নি। ভালো নির্বাচন করতে চাইলে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষকদের নিয়ে স্বাধীন নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও প্রয়োজন হবে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ছাত্র সংসদ প্রতিনিধি থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিজয়ী প্রার্থীরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণে কাজ করে থাকেন। ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনে ছাত্রনেতারা সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন। তা ছাড়া ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত ও গ্রহণযোগ্য করা গেলে ক্যাম্পাসের ছাত্রসংগঠনগুলোও দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য হবে।
তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক