
পথের কুকুরের কাদার মধ্যে মিশে থাকা পানি চেটে খাওয়ার দৃশ্য কি চোখে পড়ে আমাদের?
কিংবা কখনো চোখে পড়েছে কি, খাবারের দোকানের সামনে একরাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকা একটি কুকুর, যে তাকিয়ে আছে এই আশায়, কেউ যদি শেষ করতে না পেরে কিংবা মায়াবশত একটুকরা খাবার ছুড়ে মারে!
এই ‘নির্দয়’ দেশে কার সহানুভূতি কিংবা করুণা চায় তারা?
এখনো অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করলেও আমাদের দেশ এখন আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।
উন্নত জীবনযাপনের প্রায় সব অনুষঙ্গ জীবনে উপস্থিত রাখা যায় টাকা থাকলেই। ঢাকা এখন দিল্লি, লন্ডন, সিঙ্গাপুরের মতোই ব্যস্ত। পাশের মানুষের দিকে তাকানোরই সময় নেই, পথশিশু কিংবা পথপ্রাণী তো অনেক দূরের কথা।
পথশিশু কিংবা পথপ্রাণীর কথা বাদই দেওয়া যাক, গত কয়েক বছরে আমরা নতুন নতুন আরও কিছু ভয়ংকর দৃশ্য দেখছি, যেগুলো বাংলাদেশের মতো আবেগপ্রবণ মানুষের দেশে আগে কল্পনাও করা যেত না।
এই দেশে আমাদের শহরেই অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা একা মারা যাচ্ছেন। দিনের পর দিন কেউ তাঁদের খোঁজ নিচ্ছেন না।
প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে দরজা ভেঙে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করছেন। তাঁদের সন্তানেরা অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সফল। কিন্তু সফলতার ব্যস্ততায় তাঁরা ভুলে গেছেন যে মানুষ দুটি একদিন তাঁদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, তাঁরাও একদিন কারও হাত ধরার অপেক্ষায় থাকেন।
শুধু বৃদ্ধ নয়, অনেক তরুণও একা মারা যাচ্ছেন। অথচ তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হয়, তাঁদের অসংখ্য বন্ধু ছিল। কিন্তু মৃত্যুর সময় ঠিক কী কারণে তিনি একাই ছিলেন?
কাউকে ডাকতে ইচ্ছা করেনি? নাকি ডাকার মতো কাউকে পাননি? নাকি ডেকেছিলেন, আমরা কেউ শুনতে পাইনি?
এসব অসুস্থতা, হতাশার মৃত্যু হঠাৎ একদিনে হয় না, তাঁরা ধীরে ধীরে মারা যান। আমরা একই ঘরে থাকলেও অনেক সময় ভালো করে তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি না।
দেখলে সেই চোখের নিস্প্রভতা চোখে পড়তই। আমরা কি সত্যিই এত ব্যস্ত হয়ে গেছি? নাকি আমরা অনুভব করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলছি?
মানবিকতা আসলে একটি অভ্যাস। যে মানুষ একটি ক্ষুধার্ত কুকুরকে একমুঠো খাবার দেয়, সে সাধারণত একজন ক্ষুধার্ত মানুষকেও ফিরিয়ে দেয় না।
কারণ, সে ক্ষুধার কষ্ট চিনতে পারে। যে মানুষ একটি আহত পাখিকে বাঁচাতে ছুটে যায়, সে দুর্ঘটনায় পড়া একজন অচেনা মানুষকেও সাহায্য করতে দ্বিধা করে না।
আমাদের দেশ যতই উন্নতির দিকে যাচ্ছে, ততই প্রাণীদের বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে।
এই শহরে অর্থ না থাকলে খাওয়ার বিশুদ্ধ পানি পাওয়াই দুষ্কর। অনেক মানুষই পায় না পর্যাপ্ত খাবার–সুপেয় পানি, প্রাণী তো দূরের কথা।
কিন্তু প্রাণীদের প্রতি মায়া আছে এমন মানুষ এখনো এই দেশে আছে; সে জন্যই খাবারের দোকানের পাশে অনেক সময় কুকুর এবং অন্যান্য প্রাণী আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
দয়া মানুষেরই একটি বৈশিষ্ট্য, যা বিভক্ত হয় না।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি আমাদের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত করেছে, কিন্তু হৃদয়গুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আমরা হাজার মানুষের ছবি দেখি, কিন্তু পাশের মানুষের চোখের পানি দেখি না। আমরা হাজার ভিডিওতে ‘লাইক’ দিই, কিন্তু একটি অসহায় প্রাণীকে এক গ্লাস পানি দেওয়ার সময় পাই না।
আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিস্মিত, কিন্তু মানুষের বিস্ময়কর মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি। এই অগ্রগতি কি সত্যিই অগ্রগতি?
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম বদলেছে, ভাষা বদলেছে, রাজা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু একটি সত্য কখনো বদলায়নি—সহানুভূতি ছাড়া শুধু প্রযুক্তি দিয়ে কোনো সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না; বরং সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
পৃথিবীর সব মহান ধর্ম, দর্শন ও নৈতিক শিক্ষা একটি বিষয়েই একমত। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার শক্তিতে নয়, তার মায়ায়, তার দয়ায়।
যে দুর্বলকে রক্ষা করতে পারে, সে-ই সত্যিকারের শক্তিশালী। যে ক্ষমতা পেয়েও নম্র এবং ক্ষমতাহীন মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল থাকতে পারে, সে-ই সত্যিকারের মহান। যে নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারে, সে-ই প্রকৃত মানুষ।
প্রকৃতিরও একটি নীরব অমোঘ নিয়ম আছে। আজ আমরা প্রকৃতির প্রতি যে আচরণ করব, আগামীকাল প্রকৃতি সেই আচরণেরই প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেবে।
আজ আমরা নদী দূষিত করছি, গাছ কেটে ফেলছি, ভাষাহীন প্রাণীদের হত্যা করছি—আগামীকাল সেই প্রকৃতিই জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, দূষণ বা করোনার মতো অচেনা রোগের মাধ্যমে আমাদের সামনে দাঁড়াবে।
আমাদের দরজা বন্ধ করে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এই তো সেদিনের ঘটনা, কিন্তু আমরা ভুলেই গেছি।
আজ আমরা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকিত্ব উপেক্ষা করছি। আগামীকাল হয়তো আমাদের সন্তানও একই শিক্ষা নিয়ে বড় হবে।
আজ আমরা দুর্বলকে অপমান করছি, আগামীকাল আমাদের দুর্বলতার প্রতিকূল সময়ও কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে। এটা কি জীবনের প্রতিশোধ?
বুঝতে হবে পাশের কাতর মানুষের চোখের ভাষা, অবলা প্রাণীর ভাষা, শহরের পাশের যে নদী আমাদের নানান লোভে দিন দিন মরে যাচ্ছে তার ভাষা, দূষিত বাতাসের ভাষা কিংবা মানুষের চাপে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের ভাষা।
জীবন আসলে প্রতিশোধ নেয় না। জীবন আমাদের আচরণের প্রতিফলন করে।
তাই সন্তানদর শুধু বিজ্ঞান, গণিত বা প্রযুক্তি শেখালেই চলবে না। একটি অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য সুন্দর বাংলা, ইংরেজি, বিভিন্ন দেশের ভাষা বা কোডিং যথেষ্ট নয়।
বুঝতে হবে পাশের কাতর মানুষের চোখের ভাষা, অবলা প্রাণীর ভাষা, শহরের পাশের যে নদী আমাদের নানান লোভে দিন দিন মরে যাচ্ছে তার ভাষা, দূষিত বাতাসের ভাষা কিংবা মানুষের চাপে ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের ভাষা।
বুঝতে হবে নিজের স্বার্থেই, যেন প্রাণীরা নিরাপদে থেকে ইকোসিস্টেম ঠিক থাকে, বাতাস নিশ্বাস নেওয়ার যোগ্য থাকে, পানি থাকে পান করার উপযোগী এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত, পাহাড় যেন নিজের মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ধসে পড়ে প্রাণহানির কারণ না হয়।
ফারজানা আলম শিক্ষক ও উদ্যোক্তা
* মতামত লেখকের নিজস্ব