অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা সময়ে সচিবালয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা আন্দোলনে নেমেছেন
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নানা সময়ে সচিবালয়ে সরকারি চাকরিজীবীরা আন্দোলনে নেমেছেন

মতামত

এই সিদ্ধান্তগুলো কি পরের সরকারকে চাপে ফেলার আগাম প্রস্তুতি

১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারণা অনেকটা জমে উঠেছে। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হয় এমন কোনো অঘটন না ঘটলেও নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে জনমনে বড় শঙ্কা রয়েই গেছে। ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণাপর্বে প্রবেশ করেছে দেশ।

এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব ও কাজের এখতিয়ারের দিক থেকে মূলত নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচন ও রুটিন দায়িত্বের মধ্যে সরকারের কার্যক্রম সীমিত থাকা উচিত বলেই মনে করেন অনেকে। কিন্তু মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে কিছু সিদ্ধান্ত, উদ্যোগ, নিয়োগ ও চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ও সংশয়ের জন্ম দিয়েছে।

এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে কমিশন, মন্ত্রী ও আমলাদের জন্য রাজসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে চুক্তি, মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সমরাস্ত্র জোন তৈরির ঘোষণা, র‍্যাবের জন্য ১৬৩টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে রকেটগতিতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায়।

সরকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে তড়িঘড়ি করে নেওয়া ও নিতে যাওয়া এসব উদ্যোগ জনস্বার্থের চেয়ে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থের বিষয়টা বেশি কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এখানে কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ও জনগণকে দীর্ঘ মেয়াদে তার বোঝা ও দায় বহন করতে হবে।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এসব চুক্তি ও দেশের জন্য ‘ক্ষতিকর’ চুক্তি স্বাক্ষরের তৎপরতা নতুন নির্বাচিত সরকারকেও বিপদে ফেলবে। (শেষ সময়ে উচ্চ ব্যয়ের বরাদ্দ সন্দেহজনক, প্রথম আলো, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)

এমন বাস্তবতায় পে কমিশনের সুপারিশ পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের জন্য বড় চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক সরকারকে সরকারি চাকরিজীবীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হতে পারে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমদ, এটিকে একধরনের ‘অ্যাডভান্স ব্ল্যাকমেলিং’ বলে মন্তব্য করেছেন।

২৫ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘মন্ত্রীদের জন্য ৯০৩০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট নির্মাণ করবে সরকার’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় নতুন তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট।

‘ঢাকার রমনায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে অপেক্ষাকৃত বড় ফ্ল্যাটগুলো মন্ত্রীদের জন্য এবং ছোট ফ্ল্যাটগুলো প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। এসব ভবনে সুইমিংপুল রাখারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পর্দাসহ আসবাব কেনাকাটায় ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।

যেখানে ঢাকার উচ্চ মধ্যবিত্তরা গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের এবং সরকারের নিচের স্তরের কর্মচারীরা ৬৫০-৭০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন, সেখানে মন্ত্রীদের জন্য এত বড় আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্দেশ্য কী? আবার এমন তো নয় যে মন্ত্রীদের আবাসনের সংকট আছে। বর্তমানে মন্ত্রিপাড়ায় ১৩টি বাংলো, বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট, ধানমন্ডি ও গুলশান মিলিয়ে মন্ত্রীদের জন্য ৭১টি আবাসনব্যবস্থা রয়েছে। বাংলো বাড়ির রাজকীয় সুযোগ-সুবিধার কথা বাদ দিলেও মন্ত্রীদের জন্য এখন যে ফ্ল্যাট রয়েছে, সেগুলোর আয়তন সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। প্রশ্ন হচ্ছে, সাড়ে ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে তারা কি ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলবেন?

একটা রাজনৈতিক সরকারের আমলে আমলারা যদি এমন প্রস্তাব তৈরি করত, তারও নয় একটা স্বার্থ ও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যেত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, ছাত্র জনতার গণ–অভ্যুত্থানে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমলারা এমন উদ্যোগ কেন নিচ্ছেন? তারা কি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রীদের খুশি করার জন্য এমন প্রকল্প নিতে যাচ্ছেন? যে দেশে চার কোটির বেশি মানুষ দুই বেলা দুই মুঠো ভাত জোগাড় করতে নাভিশ্বাস উঠে যায়, সেই দেশে এমন অপচয় ও বিলাসিতার প্রকল্পের কথা স্বাভাবিক চিন্তা করা কারও মাথা দিয়ে কি আসতে পারে?

হাসিনা সরকারের আমলে যে স্বজনতোষী অর্থনীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেখানে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে আমলারাও গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন ছিলেন। একতরফা, রাতের ভোট, আমি-ডামির নির্বাচন করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের বড় ভূমিকা ছিল। গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষ আসা করেছিল, আমলাতন্ত্রের সংস্কার হবে, তারা জবাবদিহির আওতায় আসবে। সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই সরাসরি ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন। এর অবসান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হয়নি।

সরকার শুরু থেকেই অভ্যুত্থানের শক্তির ওপর না দাঁড়িয়ে আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরতার কারণে আমলাতন্ত্র সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ সবচেয়ে বড় বাধার মুখে পড়ে। আন্দোলনের কারণে সেই প্রতিবেদন ও সুপারিশ কম্বলের গভীরে চাপা দেওয়া হয়েছে। আমলাতন্ত্রের সংস্কার বলতে আগের মুখের জায়গায় নতুন মুখ আনা হয়েছে।

বঞ্চিত বিবেচনায় পদোন্নতি ও অবসরে যাওয়া আমলাদের প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নিরপেক্ষ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করার দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ যেখানে ছিল, সেখানে আবার সেই রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে আমলাতন্ত্র বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুধু নিজেদের সংস্কার প্রতিবেদনকে তারা ছুড়ে ফেলেনি, দুদক, পুলিশ সংস্কার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার প্রতিবেদনগুলো তারা নিজেদের স্বার্থে পাল্টে দিয়েছে।

১২ জানুয়ারি ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, আমলাতন্ত্রের কাছে নতিস্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল এবং সংস্কার-পরিপন্থী অনেক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে এমন নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারেরও অনুসরণ করার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের একাংশের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতিস্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।’ (আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের ‘নতিস্বীকারে’ সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট: টিআইবি বিডি নিউজ)

সাধারণ মানুষ ঘুষ, ভোগান্তি ছাড়াই সরকারি সেবা চান। সেটা না পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ কমেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও সাবেক আমলা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কাজ করতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের কতটা বৈরিতার মুখে পড়েছেন, গত মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে খোলাখুলিভাবে সেটা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাকে একজন বলেছিল যে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে যে বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে—এই বিমানটি মাইলস্টোনে না পড়ে সচিবালয়ের ওপরে পড়া উচিত ছিল। মানুষ এত ক্ষুব্ধ। শুধু সচিবালয় নয়, সরকারি প্রতিটি দপ্তরের ওপর জনগণ অনেক ক্ষুব্ধ।’

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে নবম পে কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সুপারিশ দিয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের। এটা ঠিক যে সরকারি চাকরিজীবীদের নিচের স্তরগুলোর বেতন-ভাতা বর্তমান বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু তাই বলে একসঙ্গে সব স্তরে ১০০-১৪৭ শতাংশ বাড়াতে যে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে, তার সংস্থান কীভাবে হবে?

বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানির দাম বাড়ানো এবং ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের বোঝা বাড়ানোর পরও গত কয়েক বছরে রাজস্ব আয় চার লাখ কোটি টাকার ওপর ওঠানো সম্ভব হয়নি। কর-জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা চলছে। টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা চেপে আছে। নতুন করে কাজ হারিয়েছেন এবং গরিব হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি বেসরকারি খাত সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটা ঘাড়ভাঙা অর্থনীতির ওপর এত বড় বোঝা চাপানোর উদ্দেশ্য আসলে কী?

এমন বাস্তবতায় পে কমিশনের সুপারিশ পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের জন্য বড় চাপ ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক সরকারকে সরকারি চাকরিজীবীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হতে পারে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমদ, এটিকে একধরনের ‘অ্যাডভান্স ব্ল্যাকমেলিং’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তাঁর বক্তব্য দিয়েই শেষ করা যাক, ‘যে কাজটা আপনি করবেন না, সেই কাজের একটা বোঝা আগামী সরকারের ওপর চাপিয়ে রেখে গেলেন, যাতে ওইটা নাকচ করলে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আমলাদের অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়। এটা একধরনের অ্যাডভান্স ব্ল্যাকমেলিং।’

ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের কিছু সিদ্ধান্ত কি পরের সরকারকে চাপে ফেলার আগাম প্রস্তুতি কিনা তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের।

  • মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

    মতামত লেখকের নিজস্ব