
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা তাঁদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এরই মধ্যে পোস্টাল ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটাররা ভোট প্রয়োগও করেছেন। প্রবাসীদের পাশাপাশি সরকার নতুন করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘পোস্টাল ব্যালট’ব্যবস্থায় ভোট প্রয়োগের সুযোগ প্রদান করছে। প্রতিবছর ভোটের কাজে নিয়োজিত হাজারও ভোটার নিজেদের ভোট প্রদানে বঞ্চিত থাকেন, সেই হিসাবে ভোট প্রয়োগের এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় ছিল। তবে কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তার পোস্টাল ব্যালট পেপার এবং ঘোষণাপত্র দেখার পর কিছু জরুরি প্রশ্ন তোলা উচিত মনে হয়েছে।
যেখানে নাগরিকেরা ভোট প্রয়োগ করবেন গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পোস্টাল ব্যালট পেপারে ভোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে সরকার ‘নাগরিকদের গোপনীয়তা’ ভঙ্গের স্পষ্টত অবস্থান নিয়েছে।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ স্বাক্ষরিত (ইসিএস/ওসিভি-এসডিআই/০১/বিবিধ/২০২৫) স্মারকের ‘দেশের অভ্যন্তরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা অথবা কর্মচারী ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা অথবা কর্মচারীদের আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের নিমিত্ত রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ’ বিষয়ে জানানো হয়।
প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটার, নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তা/ কর্মচারীরা, নিজ ভোটার এলাকা বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদেরকে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন শেষের জন্য খুদে বার্তা (এসএমএস) সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর (আইবাস++ সিস্টেমের মাধ্যমে বেতনভোগী কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা) কাছে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।
সবই ঠিক ছিল, তবে ব্যালট পেপারের সঙ্গে দেওয়া ‘ভোটদাতা কর্তৃক ঘোষণা’ দেওয়া ফরম-৮ নিয়ে ঝামেলাটা বেঁধেছে। এই ঘোষণাপত্রে থাকা আট সংখ্যার ক্রমিক নম্বর আর ব্যালট পেপারের আট সংখ্যার ক্রমিক নম্বর একই। একজন ভোটার (সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী) ভোট প্রয়োগের পর এই ঘোষণাপত্রে নিজের নামের স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ সেটি ব্যালট পেপারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে হবে।
ফরম-৮–এ (ঘোষণাপত্র) নির্বাচনবিধি ১১(১), ১১(৪), ১১(৬), ১২ ক(৪) উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, ‘আমি এতদ্দ্বারা ঘোষণা করিতেছি যে উপরিউক্ত নির্বাচনের ক্রমিক নম্বরসংবলিত পোস্টাল ব্যালট পেপার যে ভোটদাতার নিকট প্রেরণ করা হইয়াছে, আমিই সেই ব্যক্তি। আমি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রতীক বরাদ্দের পর আমার নির্বাচনী এলাকার প্রার্থী এবং প্রতীক দেখিয়া সজ্ঞানে পোস্টাল ব্যালট পেপারে টিক অথবা ক্রস চিহ্ন দিয়া কারও দ্বারা প্রভাবিত না হইয়া এবং গোপনে ভোট দান করিয়াছি।...
‘আমি আরও ঘোষণা করিতেছি যে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের উদ্দেশ্যে মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধন করার পর আমি শুধুমাত্র পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান করিয়াছি। বিধায় সরাসরি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হইয়া ভোট দিতে পারিব না। এ বিষয়ে আমি অবগত আছি যে এই ধরনের কোনো চেষ্টা নির্বাচন আইনবহির্ভূত বলিয়া গণ্য হইবে এবং এমনটি করিলে আমার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে। আমি আরও ঘোষণা করিতেছি যে, আমি আমার ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করিব।’
প্রশ্ন হলো, ভোটাররা গোপনীয়তা রক্ষার ‘অঙ্গীকারনামায়/ ঘোষণাপত্র’ স্বাক্ষর করে সরকারের কাছে জমা দিলেও সরকার সেই গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারবে? ধরুন, আপনার ভোটের ব্যালট নম্বর যদি হয় ০০১২, আপনাকে ঠিক এই ক্রমিক ০০১২ নম্বর সিল থাকা ‘ঘোষণাপত্র’ পাঠিয়ে প্রমাণ করতে হবে, আপনি ভোট প্রয়োগ করেছেন। এখন যদি নির্বাচন কমিশনের কেউ কোন সরকারি কর্মচারী কাকে ভোট প্রদান করেছেন, তা যদি জানতে চান, তাহলে ‘ক্রমিক’ নম্বর তালাশ করে অনায়াসে বের করতে পারবে। কারণ, নির্বাচন কমিশনে থাকা আপনার সেই ঘোষণাপত্রের ক্রমিক নম্বর আর ব্যালটের থাকা ক্রমিক নম্বর হুবহু মিলে আপনার ‘গোপনীয়তা’ উন্মোচন করতে পারে।
সরকার হয়তো ব্যালট পেপারের হিসাবের জন্য ক্রমিক নম্বর সেখানে বসিয়েছে, তাহলে ঘোষণাপত্রে কেন ক্রমিক নম্বর বসিয়ে নাগরিকদের, বিশেষ করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মানসিক পীড়ার আয়োজন করতে যাচ্ছে?
বিষয়টি অদ্ভুত শোনালে ‘সভ্য’ বাংলাদেশে এই রকম ‘নীতিবহির্ভূত’ নিয়ম চালু রেখে নির্বাচন কমিশন ‘ব্যালট পেপারে ভোট প্রদানকারী’ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘বিপদে’ ফেলতে যাচ্ছে। ধরুন, একজন সরকারি চাকরিজীবী তাঁর পছন্দের ‘ক’ রাজনৈতিক দলকে ভোট প্রদান করলেন, এখন নির্বাচনে দেখা গেল ‘খ’ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। এখন সেই ‘খ’ সরকার গঠন করে যদি ‘দলীয়’ অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন কিংবা ছাঁটাইকরণ করতে চায়, তাহলে এই যে ‘ব্যালট পেপারে’ ভোট দিলেন, তা নিশ্চয় নির্বাচন কমিশনে সংরক্ষিত থাকবে। ঘোষণাপত্রে থাকা নিজের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখে সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাজনৈতিক পরিচয় বের করা কয়েক মিনিটের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
ফলে ভবিষ্যতে ভিন্নমতের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘চাকরি হারানোর ভয়’ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র নরক হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি থাকবে। নির্বাচন কমিশন কি পারবে সেই বিশৃঙ্খলা রুখতে? এই ডেটাবেজ সংগ্রহের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারী/ অনুরাগীদের চিহ্নিতকরণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের আঘাত হানার আশঙ্কা তীব্রতর।
এখন সরকার বলতে পারে, তারা যে ‘ঘোষণাপত্র’টি সংগ্রহ করছে, তার মাধ্যমে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না কিংবা ভোটের পর সেইগুলো নষ্ট করে ফেলা হবে। তাহলে প্রশ্ন জাগবে, সরকার কেন ভোটারদের ট্র্যাকিং করার মন্ত্র গ্রহণ করছে? কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সরকার ব্যালট পেপারে ক্রমিক নম্বর আর ঘোষণাপত্রের ক্রমিক নম্বর একই করে রেখেছে? এই ঘোষণাপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্য কি সরকার জানিয়েছে?
সরকার হয়তো ব্যালট পেপারের হিসাবের জন্য ক্রমিক নম্বর সেখানে বসিয়েছে, তাহলে ঘোষণাপত্রে কেন ক্রমিক নম্বর বসিয়ে নাগরিকদের, বিশেষ করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মানসিক পীড়ার আয়োজন করতে যাচ্ছে? বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, ভোটারদের গোপনকক্ষে ব্যক্তিগতভাবে ব্যালট পেপারে সিল মেরে গোপনীয়তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। পোলিং কর্মকর্তার পরিচয় যাচাইয়ের পর ভোটার ব্যালট পেপার নিয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা পোলিং এজেন্টের নজরদারিবিহীন স্থানে ভোট দেবেন। ভোটারের গোপন কক্ষে উঁকি দেওয়া বা ভোট কাকে দিয়েছেন, তা জানতে চাওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভোট প্রদানের পর ব্যালট পেপারের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে সেটি কি দণ্ডনীয় অপরাধ হবে না?
পোস্টাল ব্যালট পেপারে প্রার্থীর নামের পাশে প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের ১১(৩) বলছে, ‘প্রেরিত পোস্টাল ব্যালট পেপারটিতে শুধু সব প্রতীক এবং প্রতিটি প্রতীকের বিপরীতে ভোটদানের জন্য ঘর বা চেক বক্স মুদ্রিত থাকিবে, প্রার্থীর নাম মুদ্রিত থাকিবে না।’ প্রার্থীর নাম পোস্টাল ব্যালেটে মুদ্রিত থাকবে না আইন থাকলেও তারা নাম রেখেছে, যা স্ববিরোধিতা বটে। ভোটদাতাদের ব্যালটের ক্রমিক নম্বর রেকর্ড রাখার কারণে পরবর্তী সময় সেই এলাকার প্রার্থীদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কাকে আপনি উড়িয়ে দিতে পারবেন না।
একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট দেবেন কি দেবেন না, সেটা নিতান্ত তাঁর মৌলিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রজাতন্ত্রে চাকরি করার সুবাদে তাঁকে ভোট প্রদানে বাধ্য করার এখতিয়ার কি সরকারের থাকতে পারে? বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে, একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাইলেও ভোট প্রদান এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কারণ, নির্বাচন কমিশন থেকে যে ব্যালট পেপার তাঁর ঠিকানা গেছে, সেই ব্যালটের ক্রমিক নম্বর যে সরকার টুকে রাখেনি, তার নিশ্চয়তা কী আছে?
অন্যান্য সাধারণ ভোটারের জন্য যদি ফরম-৮ (ঘোষণাপত্র) না লাগে, তাহলে কেবল প্রজাতন্ত্রে চাকরি করার জন্য সরাসরি ব্যক্তিগত অধিকারে সরকারের হস্তক্ষেপ নাগরিক অধিকার সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবেই। মনে রাখতে হবে, ভোট একটি সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার আদায় করতে এসে নাগরিকেরা যদি নির্বাচন কমিশনের কাছে জিম্মি হন, তাহলে সেটি কখনোই ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
ই–মেইল: nadim.ru@gmail.com
* মতামত লেখকের নিজস্ব