হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে

মতামত

হরমুজ এশিয়াকে আসল জ্বালানি পরীক্ষায় ফেলেছে

গত চার মাসে তেলের বাজার কতটা অস্থির হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্চ মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ৯ মার্চ তা ১১৯ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালের জ্বালানিসংকটের পর সর্বোচ্চ। এই উত্থানের প্রধান কারণ ছিল ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এ কারণে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যায়। কয়েক মাস ধরে দাম উঁচুতে ছিল এবং মে মাসের মাঝামাঝিও তা ১০৫ ডলারের ওপরে ছিল।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত তেলের উচ্চ মূল্য সহ্য করার ক্ষমতার কথা বেশি উঠে আসে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এ ধরনের অস্থিরতা কতটা সামলানো যায়। এ বছরের দামের হঠাৎ ওঠানামা দেখিয়েছে, শক্তিশালী প্রস্তুতি ছাড়া স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। এর জন্য জ্বালানিদক্ষতা বাড়ানো, তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, পর্যাপ্ত মজুত রাখা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ বজায় রাখা জরুরি।

আসিয়ান প্লাস থ্রি দেশগুলোর জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন বাড়লে তেলের দামের ধাক্কা কম লাগে। কিন্তু এর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার।

সরকারগুলো উচ্চ মূল্যের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে, কিন্তু বাজারের প্রতিটি পরিবর্তন আগাম অনুমান করা সম্ভব নয়। তাই এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা নানা পরিস্থিতিতেই কার্যকর থাকে। স্থিতিশীলতা মানে একবারের ধাক্কা সামলানো নয়; বরং বারবার অনিশ্চয়তার মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে পারা।

তেলের ধাক্কার একটি দ্বৈত প্রভাবও আছে। স্বল্প মেয়াদে সরবরাহে সমস্যা হলে অনেক দেশ আবার কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণ, তখন পরিবেশের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এ অস্থিরতাই বিকল্প জ্বালানির দিকে যাওয়ার অর্থনৈতিক যুক্তিকে শক্তিশালী করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে। তবে স্থিতিশীলতা শুধু নীতির ওপর নির্ভর করে না, বিনিয়োগের ওপরও নির্ভর করে। যদি নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীরা দামের এই ওঠানামাকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখেন, তাহলে বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানিতেই থাকবে। কিন্তু যদি এটিকে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে ধরা হয়, তাহলে বিনিয়োগ ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে সরে যাবে।

বিদ্যুতের চাহিদার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, কোন বিষয়টি সংবাদ শিরোনামে বেশি আসে আর কোনটি আসলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টার বিদ্যুৎ–ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও মোট ব্যবহারের তুলনায় তাদের অংশ এখনো কম।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টার বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৩ শতাংশের নিচেই থাকবে।

অন্যদিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ বা ঠান্ডা রাখার জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ চিত্র আরও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ অঞ্চলে ২০২০ সালের প্রায় ৫ কোটি এয়ারকন্ডিশনার বেড়ে ২০৪০ সালে ৩০ কোটিতে পৌঁছাবে। শীতাতপনিয়ন্ত্রণে বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৩০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাবে, যা ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। আগামী দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে এই শীতলীকরণের ব্যবস্থাই বিদ্যুৎ–ব্যবস্থার ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করবে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের প্রস্তাব স্পষ্ট করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর চাপেও রয়েছে ইরান

এ পরিস্থিতি থেকে বড় শিক্ষা হলো কোনটি স্থায়ী প্রবণতা আর কোনটি সাময়িক, তা বুঝতে হবে। শুধু সংবাদে যেটি বেশি আলোচিত, সেটির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল বিনিয়োগের ঝুঁকি থাকে।

বিদ্যুতায়নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৬ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে মোট জ্বালানি ব্যবহারে বিদ্যুতের অংশ ২১ শতাংশ থেকে ২০৩০ সালে ২৪ শতাংশে পৌঁছাবে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ অতিরিক্ত চাহিদা আসবে উন্নয়নশীল অর্থনীতি থেকে, যার মধ্যে চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এগিয়ে থাকবে।

আসিয়ান প্লাস থ্রি দেশগুলোর জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন বাড়লে তেলের দামের ধাক্কা কম লাগে। কিন্তু এর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার।

এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আসিয়ান পাওয়ার গ্রিড উদ্যোগের মাধ্যমে ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিনিময়ের প্রকল্পে ৩৮ হাজার গিগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ আদান-প্রদান হয়েছে। এটি দেখিয়েছে, সঠিক প্রস্তুতি কেমন হতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সময়ের জ্বালানি সহযোগিতা পরিকল্পনা অনুযায়ী এ উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করলে ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

অবশ্য কোনো দেশই পুরোপুরি বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। তবে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়লে ঝুঁকি ভাগাভাগি করা সম্ভব হয়। এতে কোনো একটি দেশকে একা পুরো ধাক্কা নিতে হয় না। আগামী বৈশ্বিক সংকট যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন বা আর্থিক অস্থিরতা—যেকোনো কারণে আসতে পারে। এর প্রভাব সব দেশে সমান হবে না। শান্ত সময়ের প্রস্তুতিই তখন পরীক্ষা দেবে।

ইয়াসুতো ওয়াতানাবে আসিয়ান প্লাস থ্রি ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত