যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে ইরানের পতাকা
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমা হামলায় বিধ্বস্ত ভবনের সামনে ইরানের পতাকা

মতামত

বোমার আগুন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই লাগবে

ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই ভয়াবহ দমননীতি চালিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাব বলছে, কেবল গত কয়েক মাসেই নিহত হওয়ার সংখ্যা ৩০ হাজার ছুঁতে পারে। এমন এক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভের আবেগে ভেসে আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক আকাশপথে হামলার দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত বিচার না করি, তা হলে বড় ভুল হবে।

কারণ, এই হামলা কেবল একটি সামরিক পদক্ষেপ নয়; এটি এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের সীমা, সাংবিধানিক কর্তৃত্ব, তথ্যের সত্যতা—সবই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে। একবার যদি এই দরজা খুলে যায়, তা হলে সহিংসতার সেই নজির আর কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তা কে দেবে? আমেরিকানদের, আর যারা বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের আমেরিকার বন্ধু বলে মনে করে, তাদের শুধু আজকের ‘খারাপ’ শত্রুকে আক্রান্ত দেখে খুশি হলে চলবে না। তাঁদের ভাবতে হবে আজ যে শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, কাল সেটা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে?

যে প্রেসিডেন্ট তথ্য বা আইনের ধার ধারেন না, তাঁর হাতে এই ক্ষমতা থাকলে বিষয়টি চিন্তার হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে কোনো স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ এক কথা। কিন্তু একই ক্ষমতা যদি দেশের ভেতরে নিজের বিরোধীদের ‘দেশের শত্রু’ বলে দমন করতে ব্যবহার করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এখন সেই আশঙ্কাও সামনে চলে এসেছে।

প্রশ্ন তাই ইরানকে ঘিরে নয়, প্রশ্ন আমেরিকার গণতন্ত্রকে ঘিরে। বোমা কি শেষ পর্যন্ত বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তার প্রতিধ্বনি একদিন ভোটকেন্দ্র, আদালত ও শহরের রাস্তায়ও শোনা যাবে? সেই আশঙ্কাই আজ সবচেয়ে বড় ‘ব্লো-ব্যাক’।

ঘটনাচক্র কখনো কখনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যেদিন তেহরানের মাটিতে বোমা পড়তে শুরু করল, সেদিনই ওয়াশিংটন পোস্ট জানাল, হোয়াইট হাউস নাকি খুব শিগগির একতরফা নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে, যাতে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কে, কখন, কীভাবে ভোট দেবে, তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট নিজের হাতে টেনে নিতে পারেন। যুক্তি? উত্তর হলো জাতীয় নিরাপত্তা; বিশেষত কথিত চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা। লক্ষ্য? উত্তর হলো এমন বিধিনিষেধ আরোপ, যা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য প্রকাশ্যে বলেননি, তিনি এমন আদেশ দিতে চলেছেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে দেওয়া তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরান আক্রমণের পরিকল্পনাও তিনি গোপন রেখেছিলেন। ফলে অস্বীকারের রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে বাস্তব সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ওপর সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে, এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রলোভন বাড়তেই পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা জেরিম্যান্ডারিংয়ের (জেরিম্যান্ডারিং হলো নির্বাচনী সীমান্ত বা কংগ্রেসিয়াল/ভোটকেন্দ্রের সীমানা এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে রাজনৈতিক সুবিধা একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর জন্য নিশ্চিত করা যায়) চেষ্টাও যে খুব সফল হয়েছে, তা নয়। টেক্সাসে রিপাবলিকানদের সীমানা-কারচুপি ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা আক্রমণের মুখে থমকে যায়। এমনকি প্রবল রিপাবলিকান ঘাঁটি ইন্ডিয়ানাও নিজেদের রাজ্যে নতুন করে সীমানা সাজাতে অনীহা দেখায়। এর সঙ্গে যদি সামনের মাসগুলোতে শেয়ারবাজারে বড়সড় সংশোধন বা ধস নেমে আসে, তা হলে হোয়াইট হাউসের ওপর নির্বাচনী ‘অলৌকিক ঘটনা’ ঘটানোর চাপ বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই।

কিন্তু সংবিধান কী বলে? মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১ স্পষ্ট জানায়, কংগ্রেসীয় নির্বাচনের নিয়ম নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে, যদিও কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে পারে। প্রেসিডেন্টের হাতে একতরফাভাবে ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ করা বা বাধ্যতামূলক ভোটার পরিচয়পত্র চালু করার ক্ষমতা নেই। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ‘সেভ অ্যাক্ট’-এ ভোটার আইডির কথা থাকলেও তা এখনো আইন হয়ে ওঠেনি। তা হলে উদ্বেগ কোথায়? উদ্বেগ এই যে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ঐতিহাসিকভাবে ঢিলেঢালাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইরানে হামলার ঘটনাই তার উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান আন্তর্জাতিক সংঘাত শুরু করার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসকে দিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ একতরফা শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে, তবু আইনি কর্তৃত্বের ঘাটতি হামলা ঠেকাতে পারেনি।

ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্প যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তা নিউইয়র্ক টাইমস–এর ভাষায় ‘প্রমাণহীন ও অতিরঞ্জিত’। আরও সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, তিনি দায়মুক্তভাবে মিথ্যা বলতে পারেন এবং সেই মিথ্যার ভিত্তিতে শত বা সহস্র প্রাণহানির ঝুঁকি নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন। এ এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। আর এই প্রবণতা কেবল পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই দেখিয়েছে, বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিস্তৃত ক্ষমতার দাবি কীভাবে ঘুরিয়ে দেশের ভেতরেও প্রয়োগ করা যায়।

ইরান-সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় (যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না), তা হলে বোমাবর্ষণ ও পাল্টা হামলার আবহকে সামনে রেখে নতুন দেশি বিধিনিষেধ আরোপের যুক্তি তৈরি করা আরও সহজ হবে। জাতীয় নিরাপত্তার জরুরি অবস্থা একবার ঘোষিত হলে, তা প্রায়ই ক্ষমতার প্রসার ঘটায়, সংকোচন নয়। আজ জাতীয় নিরাপত্তার ছুরি ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকদের দিকে তাক করা। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—রাষ্ট্রীয় শক্তি দূরের শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করাকে আমরা স্বাগত জানাই, কিন্তু সেই শক্তিই একদিন আমাদের দিকে ঘুরে আসতে পারে।

প্রশ্ন তাই ইরানকে ঘিরে নয়, প্রশ্ন আমেরিকার গণতন্ত্রকে ঘিরে। বোমা কি শেষ পর্যন্ত বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তার প্রতিধ্বনি একদিন ভোটকেন্দ্র, আদালত ও শহরের রাস্তায়ও শোনা যাবে? সেই আশঙ্কাই আজ সবচেয়ে বড় ‘ব্লো-ব্যাক’।

  • আজিজ হক শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ