কর্মচারীর সুরক্ষা কেবল সামাজিক ন্যায় নয়, প্রতিযোগিতা-সক্ষমতারও শর্ত।
কর্মচারীর সুরক্ষা কেবল সামাজিক ন্যায় নয়, প্রতিযোগিতা-সক্ষমতারও শর্ত।

মতামত

বেসরকারি চাকরির ‘নতুন বিধিমালা’: সুরক্ষা দেবে না সুযোগ কমাবে?

সম্প্রতি সংবাদপত্রে একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে, যা নিয়ে আমারও কিছু বলার আছে: বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘মডেল চাকরি প্রবিধানমালা’ কি সত্যিই সুরক্ষা দেবে, নাকি ঘুরপথে বিদ্যমান সুবিধাই ছেঁটে ফেলবে?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই খসড়া দেশের এমন এক বিশাল কর্মীগোষ্ঠীকে ঘিরে, যাঁরা এত দিন কার্যত কোনো আইনি ছাতার নিচে ছিলেন না।

আমাদের শ্রম আইন মূলত শ্রমিকদের রক্ষা করে। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানি, ব্যাংক-বিমা, আইটি, এনজিও, ট্রেডিং হাউস কিংবা সেবা খাতের লাখো বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী শ্রম আইনের ২(৬৫) ধারার শ্রমিকের সংজ্ঞার বাইরে।

তাঁদের চাকরির নিরাপত্তা, বকেয়া পাওনা, ছুটি কিংবা অভিযোগের প্রতিকার, সবই নির্ভর করে একটি নিয়োগপত্র আর সাধারণ চুক্তি আইনের ওপর। এই শূন্যতা পূরণের উদ্যোগ তাই স্বাগত জানানোর মতো। প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কতটা কর্মচারীবান্ধব হচ্ছে।

খসড়ায় ভালো দিক আছে। লিখিত নিয়োগপত্র বাধ্যতামূলক করা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিধান, শাস্তির আগে তদন্ত ও শুনানির সুযোগ, যৌন হয়রানির বিস্তারিত কাঠামো, ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটি, আর কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করা, এগুলো ইতিবাচক ভিত্তি।

কিন্তু সমস্যাও কম নয়। এটি একটি মডেল, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশিকামাত্র; মানলে ভালো, না মানলে কোনো জবাবদিহি নেই। অতিরিক্ত সময়ের কাজের বাড়তি মজুরির কথা নেই, অথচ শ্রমিকেরা ওভারটাইমে দ্বিগুণ পান। কারণ, না দেখিয়েই স্থায়ী কর্মচারীকে বিদায় করার সুযোগ থেকে যাচ্ছে। পিতৃত্বকালীন ছুটির উল্লেখই নেই।

উৎসব বোনাসকে ‘সর্বোচ্চ এক মাস’ বলে বাঁধলে তা মেঝে না হয়ে ‘সিলিং’ হয়ে যায়, সুরক্ষার নামে সীমা। কর্মঘণ্টার পর ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’, তথ্য ও নজরদারির সীমা নিয়ে খসড়া প্রায় নীরব। আর সবচেয়ে বড় ফাঁক, কে ‘কর্মচারী’ আর কে ‘কর্মকর্তা’, তা স্পষ্ট নয়; ফলে সবাইকে ‘কর্মকর্তা’ বা ‘কনসালট্যান্ট’ তকমা দিয়ে সুরক্ষার বাইরে রাখা সহজ।

আমার কাছে তিনটি সরল মানদণ্ড: ন্যূনতম অধিকার বাধ্যতামূলক হতে হবে, মালিকের খেয়ালখুশির সীমা টানতে হবে, আর প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে একটি কার্যকর প্রতিকার থাকতে হবে।

২০২৬ সালে শ্রম আইন সংশোধিত হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ আইএলওর ১৫৫, ১৮৭ ও ১৯০ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে, আর ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ আমরা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ করতে পারি।

ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকার আর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের যাচাই এখন সরাসরি নির্ভর করছে আমাদের শ্রম মানের ওপর। কর্মচারীর সুরক্ষা তাই কেবল সামাজিক ন্যায় নয়, প্রতিযোগিতা-সক্ষমতারও শর্ত।

আমার কাছে তিনটি সরল মানদণ্ড: ন্যূনতম অধিকার বাধ্যতামূলক হতে হবে, মালিকের খেয়ালখুশির সীমা টানতে হবে, আর প্রতিটি অধিকারের বিপরীতে একটি কার্যকর প্রতিকার থাকতে হবে। এই কষ্টিপাথরে যাচাই করলে সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো দাঁড়ায় এমন:

ভিত্তি ও পরিধি: এটিকে মডেল নয়, প্রজ্ঞাপন আকারে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মান হিসেবে জারি করতে হবে, ২০২৬ সংশোধনীর সঙ্গে মিলিয়ে। ‘কর্মচারী’ ও ‘কর্মকর্তা’র সংজ্ঞা হবে পদবি নয়, প্রকৃত কাজভিত্তিক; বিতর্ক হলে প্রমাণের দায় মালিকের।

বারবার নবায়ন হওয়া চুক্তি নির্দিষ্ট সময় পর স্থায়ী গণ্য হবে, যাতে ‘কনসালট্যান্ট’ তকমায় সুরক্ষা ফাঁকি বন্ধ হয়। আর চুক্তি আইন, ১৮৭২ থাকবে সম্পূরক আইন হিসেবে, যার ২৭ ধারা অনুযায়ী চাকরি ছাড়ার পর প্রতিযোগীর কাছে না যাওয়ার শর্ত এমনিতেই অকার্যকর।

বেতন ও আর্থিক সুরক্ষা: ওভারটাইমে দ্বিগুণ মজুরি; মূল বেতন যেন মোট বেতনের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হয়, নাহলে গ্র্যাচুইটি ও ভবিষ্য তহবিলের ভিত্তি ফাঁপা হয়ে যায়; বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ন্যূনতম হার এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়; নববর্ষ ভাতা আর দুটি উৎসব বোনাস, ‘সর্বোচ্চ’ নয়, ‘ন্যূনতম’ ভাষায়; মুনাফায় অংশগ্রহণ (৫ শতাংশ তহবিল) সব স্তরের কর্মীর জন্য; চাকরি অবসানে সব পাওনা ৩০ দিনের মধ্যে, বিলম্বে জরিমানা; আর সাময়িক বরখাস্তকালে অর্ধেক নয়, অন্তত ৭৫ শতাংশ ভাতা এবং তদন্ত ৩০ দিনে শেষ।

ছুটি ও পরিবার: সপ্তাহে দুই দিন ছুটি; নৈমিত্তিক ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি কেটে না নেওয়া এবং জমা ছুটি নগদায়ন; অন্তত ১৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং শোক ও দত্তক ছুটি; ১০০+ কর্মীর প্রতিষ্ঠানে ডে–কেয়ার; নারীর রাত্রিকালীন শিফটে নিরাপদ পরিবহন; আর কর্মঘণ্টার পর ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’ ও রিমোট-হাইব্রিড কাজের স্পষ্ট নিয়ম।

সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য: ভবিষ্য তহবিলের সীমা কমিয়ে (২০ থেকে ৫০ কর্মী) পোর্টেবল করা; গোষ্ঠী স্বাস্থ্যবিমা বাধ্যতামূলক; ১০০+ প্রতিষ্ঠানে ধারা ৯৯ অনুযায়ী গোষ্ঠী জীবন ও দুর্ঘটনা বিমা; দুর্ঘটনা-ক্ষতিপূরণ ২০২৬ আইনের তহবিলের সঙ্গে যুক্ত করা; নিরাপত্তা কমিটি, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ প্রত্যাখ্যানের অধিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা।

চাকরির নিরাপত্তা ও প্রতিকার: কারণসহ, লিখিত ও যাচাইযোগ্য চাকরিচ্যুতি (আইএলও ১৫৮-এর চেতনায়); প্রতিহিংসা, ইউনিয়ন, গর্ভাবস্থা বা অভিযোগের কারণে বিদায় হলে তা ‘অন্যায় বরখাস্ত’; হয়রানি কমিটিতে বাইরের সদস্য, নির্ধারিত সময়সীমা ও অভিযোগকারীর সুরক্ষা; বৈষম্যের পূর্ণ তালিকা (বয়স, প্রতিবন্ধিতাসহ) ও সমকাজে সমবেতন; আর সরাসরি শ্রম আদালতের আগে একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ ধাপ: সুপারভাইজার, অতঃপর অভিযোগ কমিটি, অতঃপর আপিল, অতঃপর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় ৬০ থেকে কমিয়ে ৩০ দিন, অনলাইনে দাখিলের সুযোগসহ।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের জন্যও ন্যায্যতা দরকার। সরল বিশ্বাসে নেওয়া সিদ্ধান্তের দায়মুক্তি, লিখিত দ্বিমত রেকর্ড থাকলে ব্যক্তিগত দায় না চাপানো, বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যানের অধিকার, নোটিশের সমতা—এগুলো কর্মকর্তাদেরও প্রাপ্য।

একটি কথা স্পষ্ট করা দরকার। কর্মচারীবান্ধব মানে মালিকবিরোধী নয়। প্রতিষ্ঠানেরও বৈধ অধিকার আছে, কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা, প্রমাণভিত্তিক শৃঙ্খলা, প্রয়োজনে পুনর্গঠন, গোপনীয়তা রক্ষা। কিন্তু প্রতিটি অধিকারের পাশে থাকতে হবে। কারণ, প্রক্রিয়া, প্রমাণ, সমানুপাতিকতা আর আপিলের সুযোগ। এটাই ভারসাম্য।

সবশেষে একটি প্রক্রিয়াগত অনুরোধ। এই খসড়া যেন কেবল মালিকপক্ষের মতামতে চূড়ান্ত না হয়। কর্মচারী প্রতিনিধি, মানবসম্পদ পেশাজীবী, সুশীল সমাজ ও গবেষকদের টেবিলে রাখতে হবে।

এই প্রবিধান আমাদের জন্য কেন জরুরি? আমি যখন এক বিদেশি কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলাম অনেক সুযোগ তারা দেয়নি। কারণ, আমাদের কোনো আইনে লেখা নেই।

এখন এই প্রবিধান যদি পাস হয়ে যায়, তবে নতুন কোম্পানিগুলো এই কাগজের গণ্ডির মধ্যে নিজেদের পলিসি গড়বে অথবা যারা অতিরিক্ত সুবিধা দেয়, তারা এই সুযোগে কমিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এটা গবেষণায় প্রমাণিত সুখী কর্মচারীদের কোম্পানিও ভালো চলে।

সবশেষে একটি প্রক্রিয়াগত অনুরোধ। এই খসড়া যেন কেবল মালিকপক্ষের মতামতে চূড়ান্ত না হয়। কর্মচারী প্রতিনিধি, মানবসম্পদ পেশাজীবী, সুশীল সমাজ ও গবেষকদের টেবিলে রাখতে হবে। নাহলে এটি এক পক্ষের প্রবিধান হয়ে থাকবে, আর তখন সংবাদপত্রের প্রশ্নটাই সত্য হয়ে দাঁড়াবে: সুরক্ষা, না সুবিধা ছাঁটাই?

এই মুহূর্তটি বিরল। এক প্রজন্মে একবারই বেসরকারি কর্মজীবীর জন্য একটি ন্যায্য সনদ লেখার সুযোগ আসে। আসুন, আমরা সেটিকে মেঝে হিসেবে গড়ি, সিলিং হিসেবে নয়।

  • সুবাইল বিন আলম টেকসই উন্নয়ন ও নীতিমালাবিষয়ক লেখক

*মতামত লেখকের নিজস্ব