তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী

মতামত

ত্বকীর মায়ের খোলাচিঠি

সময় ধুলো উড়িয়ে চলে। মাথা ও বুকের ভেতর থরে থরে লেগে থাকা কথার পরতে পরতে জমে ওঠে ধুলোর আস্তরণ। জীবনের যে কথা স্পর্ধিত, গৌরবের, পাখা ছড়িয়ে ওড়া প্রজাপতির মতো উচ্ছ্বসিত অথবা শায়ক বিদ্ধ পাখির ঝাপটানো ডানায় ছড়িয়ে দেওয়া দুঃখের, বেদনার—সব ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু আমদের জীবনের বাঁকবদলে দেওয়া ঘটনা হাজারো ধুলোতে ঢাকা পড়ে না, ধুলো ঠেলে বেরিয়ে আসে বাক্সবন্দী সে দুঃখের স্মৃতিময় কালো পাথর।

১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরে আমাদের সন্তান ত্বকীর জন্ম। তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। এখানেই বেড়ে ওঠা। ত্বকীর জন্মের সময় আমিও কবি সুকান্তর মতো এ বিশ্বকে সব শিশুর বাসযোগ্য করে তোলার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। ত্বকীকে পেয়ে আমাদের দিনগুলি ছিল হিরণ্ময়, লাল-নীল ঘুড়ির মতো আকাশে ওড়া বর্ণিল উচ্ছল এক অনাবিল আনন্দের। ত্বকী আস্তে আস্তে হাঁটতে শিখল। স্কুলে গেল, গান গাইতে শিখল, ছবি আঁকল, বাংলা-ইংরেজিতে কবিতা-গল্প লিখতে শুরু করল।

বই পড়ার একটা ব্যাকুলতা গড়ে উঠল ওর মধ্যে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বইয়ের প্রতি আকর্ষণ গড়ে উঠল। ও-লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে দেশে সর্বোচ্চ নম্বর পেল। এ-লেভেল পরীক্ষায় পেল পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর ২৯৭/৩০০, রসায়নে ২৯৪/৩০০, যা দেশে সর্বোচ্চ নম্বর। কিন্তু ত্বকীর এ ফল যেদিন প্রকাশিত হলো, ত্বকী তখন লাশ হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসছে।

নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের চিহ্নিত ব্যক্তিদের মদদে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ ত্বকীকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তদন্ত সংস্থা র‍্যাব ২০১৪ সালের ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, তদন্ত শেষ পর্যায়ে। কীভাবে, কখন, কোথায়, কে কে এবং কেন ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে, তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে জানায় খুব দ্রুতই অভিযোপত্র আদালতে পেশ করা হবে। কিন্তু এ সংবাদ সম্মেলনের তিন মাস পর ৩ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের পাশে আছেন এবং তাদের দেখে রাখবেন।

এর পর থেকে ত্বকী হত্যার সব কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ঘাতক হিসেবে যাদের নাম আসে, তারা সরকার ও প্রশাসনের সহায়তায় বীরদর্পে শহরময় ঘুরে বেড়াতে থাকে। কাউকেই আইনের আওতায় আসতে হয় নাই। ৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে নতুন করে কয়েকজন ঘাতককে গ্রেপ্তার করা হয় কিন্তু এখন তারাও উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে রয়েছে। ৬ মার্চ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পূর্ণ হলো। এর মধ্যে আওয়ামী শাসনামলের সাড়ে ১১ বছর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর। বারো বছর আগে যে তদন্ত শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল, আজও সে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি।

ত্বকীর জন্ম হয়েছিল বিজয়া দশমীর বিকেলে। চারদিকে ঢাকের বাদন। আনন্দ আর বেদনায় মেশানো এক অনুভূতি চারপাশ। মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিন এসে ত্বকীর কানের কাছে আজান দিলেন। আজান আর ঢাক-বাদ্যের মধ্য দিয়ে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুটি হয়তো বুঝেছিল পৃথিবীর অপার এই সৌন্দর্য সবই তাকে স্বাগত জানানোর আয়োজন।

কিন্তু সতেরো বছরের ক্ষুদ্র জীবনের শেষে এসে জেনে গেল জগতের উল্টো পিঠের নির্মম এক সত্য, মুখ ও মুখোশে একাকার হয়ে যাওয়া আমাদের অনিবার্য এক বাস্তবতা। যেখানে কেবল দুর্জনের আধিপত্য আর অসহায় দুর্বলের আহাজারি। ত্বকীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকের জবানবন্দি অনুযায়ী তারা গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করে বুকের ওপর উঠে গলা চেপে শ্বাস রোধ করে ত্বকীকে হত্যা করেছে। একটি চোখ উপড়ে ফেলেছে। শরীরের কয়েকটি অঙ্গ থেঁতলে দিয়েছে। ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার জানিয়েছেন, মাথার তিন দিক থেকে ত্বকীকে আঘাত করা হয়েছে।

ত্বকী তার একটি কবিতায় লিখেছিল, ‘সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে/ হিংসা বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে,/ জলাঞ্জলি দিয়ে হিসেব কষা,/ ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান/ বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।” আমি ত্বকীকে দেশ ও মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলাম। ত্বকী দেশটাকে মানুষের বাসযোগ্য করার স্বপ্ন লালন করত। মানুষের সমতা, ভালোবাসা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চেয়েছিল। কিন্তু একটি অসম আর বৈষম্যের সমাজ থেকে নির্মমভাবে প্রত্যাবর্তন করতে হলো তাকে।

সরকার যায় সরকার আসে। রাষ্ট্র পরিচালনার পবিত্র দায়িত্ব আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এ পবিত্র দায়িত্ব যখন কলুষিত হয়, মানুষের হৃদয়ে তখন দুঃখের ক্ষত জমতে থাকে। একসময় তা পাহাড়ে পরিণত হয়। আপনারা সংসদ সদস্য, আইনপ্রণেতা। আপনারা আজকে নতুন করে আমাদের এই দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। আমি আশা করছি আপনারা আমাকে আমার সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন। আপনাদের প্রতি একজন সন্তানহারা মায়ের আজকে এই ফরিয়াদ।

  • রওনক রেহানা নিহত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা