
মানবজীবনের টিকে থাকা ও বিকাশের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মহান আল্লাহ-তাআলা মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, তা এক সুষম ও পরিমিত ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। উদ্ভিদ, গাছপালা, পশুপাখি, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত ও সাগর—সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে এই বিস্তৃত প্রতিবেশ।
পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন। অতঃপর তা মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে। অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা তা পৌঁছান, তখন তারা আনন্দিত হয়।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৪৮)
আল্লাহ–তাআলার অগণিত নিয়ামতের মধ্যে বৃক্ষরাজি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু খাদ্যের উৎস নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রধান উপাদান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা কি লক্ষ করে না, আমি ঊষর ভূমিতে পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদ্গত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদিপশু এবং তারা নিজেরা আহার করে। তারা কি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হবে না?’ (সুরা-৩২ সাজদা, আয়াত: ২৭)
পরিবেশ সংরক্ষণ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনাচরণে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করেছেন এবং সাহাবিদেরও এ কাজে উৎসাহিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়, আর সে অবস্থায় তোমাদের কারও হাতে একটি চারা থাকে; যদি সম্ভব হয়, তাহলে সে যেন এটি রোপণ করে।’ (মুসলিম: ৫৫৬০, মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২)
বৃক্ষরোপণ শুধু একটি সামাজিক বা পরিবেশগত দায়িত্ব নয়; এটি ইবাদতেরও অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বৃক্ষ রোপণ করে তা ফলদার হওয়া পর্যন্ত তার পরিচর্যা ও সংরক্ষণে ধৈর্য ধারণ করে, তার প্রতিটি ফল যা নষ্ট হয়, তার বিনিময়ে আল্লাহ–তাআলা তাকে সদকার নেকি দেবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৬৭০২) আরও এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষ রোপণ করে, আল্লাহ–তাআলা এর বিনিময়ে তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৫৬৭)
বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণ আর কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই পাহাড় কাটা বন্ধ করা, নির্বিচার বৃক্ষনিধন রোধ করা, নদ-নদী ও জলাধার রক্ষা করা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্যও বটে।
ইসলাম প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মর্যাদা স্বীকার করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সপ্ত আকাশে ও পৃথিবীতে এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই, যা তার সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা, মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি অতীব সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ৪৪)
এ কারণে বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত হাসসান ইবনু ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি মক্কায় এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, যে লোক ফলদ গাছ কাটে তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন।’ (আবু দাউদ) আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (বায়হাকি)
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড়-পর্বতের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন। যেন পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।’ (সুরা-১৬ নাহল: ১৫)
পৃথিবীর পরিবেশকে সুষম ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার বিষয়টিও কোরআনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি ও তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং নয়নাভিরাম বিবিধ উদ্ভিদরাজি উৎপন্ন করেছি। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ।’ (সুরা-৫০ কাফ, আয়াত: ৭-৮)
কিন্তু মানুষের অসচেতনতা ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের ফলে আজ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে। কোরআনে এ বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ৪১)
বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণ আর কেবল একটি নৈতিক আহ্বান নয়; এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই পাহাড় কাটা বন্ধ করা, নির্বিচার বৃক্ষনিধন রোধ করা, নদ-নদী ও জলাধার রক্ষা করা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্যও বটে।
● অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com