মতামত

অর্ধশতাব্দীর বিমানভ্রমণ এবং আমাদের স্বগ্রহণযোগ্যতা

বিমানভ্রমণের অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হলো গত আগস্টের ১৮ তারিখে। এই সময়টিতে খুবই আনাড়িভাবে ৬০–৭০টি দেশ ভ্রমণ করেছি শখানেক বিদেশি বিমানবন্দরে অবতরণ–উড্ডয়ন হয়েছে, নানা দেশের সংস্কৃতি–লোকাচার দেখার সুযোগ হয়েছে। তাতে বুদ্ধিজ্ঞান অনেক বাড়ার কথা ছিল, তা হয়নি। প্রায় ৫০ বছর আগে সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে গায়ে সিসিসিপি লেখা একটি বিমানে আরোহণ করে ভারতের কলকাতা এবং মুম্বাই হয়ে সোভিয়েত রিপাবলিক জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসিতে যাত্রাবিরতির পর যখন শেরমেতিয়েভা বিমানবন্দরে নেমে শুভ্র পায়জামা–পাঞ্জাবি পরা ততোধিক সাদামনের মানুষ বিজ্ঞানলেখক ড. আবদুল্লাহ আল–মুতী শরফুদ্দিনের উষ্ণ সাদর সম্ভাষণ পেলাম, মনটা ভালো হয়ে গেল। এত দিনে আমার ধারণা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের প্রিয় দেশটি এখনো সম্মানজনক অবস্থানে নেই।

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে যে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছে, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ শিরোনামকে ছুড়ে ফেলে, বোদ্ধা অর্থনীতিবিদদের অবাক করে দিয়ে যে ঘনবসতিপূর্ণ দেশটি অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে, সবচেয়ে কম সম্পদে যে দেশটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মানবশিশুকে বিকশিত করছে, সেই দেশটি অবজ্ঞার বিষয় হতে পারে না।

যা দেখেছি তার কিছু বর্ণনা করছি, এতে যত না জানা যাবে, তার থেকে অধিক বোঝা যাবে কতটা আনাড়ি হয়েও আমার মতো মানুষ নানা দেশে ভ্রমণ করতে পারে।

১. ভিসার বিষয়ে দর–কষাকষি, কাকুতি–মিনতি কিংবা নিজের আবেদনের যথার্থতা প্রমাণে যথেষ্ট অনীহা এবং আড়ষ্টতা আমার মধ্যে আছে। অনেকটা যার বাড়িতে যেতে চাই সে রাজি না, নিজেকে এতটা নির্লজ্জ হিসেবে দেখতে চাই না। ২০১৮ সালে সুকুবা শহরে আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের দলনেতা অধ্যাপক সোহেল রহমান ছাত্রদের নিয়ে ভিসার জন্য দাঁড়ালেন। তার পরদিন আমি জাপানি দূতাবাসে গেলাম এবং কর্তব্যরত কর্মকর্তা মুহূর্তের মধ্যে আমার আবেদনপত্রের অপূর্ণতা, অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বলে পত্রপাঠ বিদায় দিয়ে দিলেন।

আমি শুধু নির্লজ্জের মতো বলতে পারলাম যে গতকাল আমাদের দলের সদস্যরা একই রকম দলিলপত্রাদি–সংবলিত আবেদনপত্র সফলভাবে জমা দিয়ে গেছে এবং এই বলে ফিরতি ভ্রমণ শুরু করলাম। দূতাবাস ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে কিঞ্চিৎ নির্লজ্জতা পেয়ে বসল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কম্পিউটার স্নাতক এহসানুল হককে একটি ফোন করায় তিনি অনুরোধ করলেন, যাতে করে দূতাবাস এলাকা থেকে আমি চলে না যাই। সত্যি সত্যি দূতাবাস থেকে একজন দৌড়ে এলেন, আবার একই কর্মকর্তা আমার ওই সব কাগজপত্রই গ্রহণ করলেন। আমার আর বলতেও ইচ্ছা করল না কী কারণে এখন একই দলিলপত্রাদি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠল।

আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের অনেক ভ্রমণকারীই অনেক চৌকস। তাদের হয়তো এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় না, উন্নত দেশের হয়তো কাউকেই হতে হয় না। তবে আমাদের দেশের পাসপোর্ট নিয়ে অনেককেই এ রকম সমস্যায় বিব্রত হতে হয়। আমরা নিজেদের তৈরি রকেটে যদি চাঁদে যেতে পারি অথবা সমরাস্ত্রে বলীয়ান হই, অথবা জাপানের মতো সমৃদ্ধিশালী দেশ হই, তাহলে হয়তো বিদেশিরা আমাদের সমীহ করতে পারে।

২. আমেরিকান অথবা ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে সৌভাগ্যবশত ভিসা–বিপাকে না পড়লেও পাশের দেশ ভারতের ভিসা প্রাপ্তিতে নানা সময় ভাগ্য প্রসন্ন হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যাবতীয় পাসপোর্ট নিয়ে দাঁড়াতে হবে, যার কোনোটি ৫০ বছর, কোনোটি ৪০ বছর আগে ইস্যু করা হয়েছিল, শর্তটি বড়ই সেকেলে বলে মনে হয়। ভিসা কর্তৃপক্ষের কি আরও দক্ষ হওয়া উচিত নয়? আমার স্ত্রী ভারতীয় ভিসা পেয়েছেন কিন্তু আমি পাইনি, এ রকম অনেকবার হয়েছে, যদিও আমি ১২–১৪ বার নানা সময়ে ভারত সফর করেছি, তা–ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে।

একবার বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো হিসেবে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের আমন্ত্রণ পেয়ে ভিসার জন্য দাঁড়িয়েছি। কংগ্রেসের আগের দিন হাইকমিশনে যেতে বাধ্য হলাম এবং বললাম, যেহেতু কংগ্রেস আগামীকাল, আমাকে আজই পাসপোর্ট পেতে হবে ভিসাসহ কিংবা ছাড়া। সৌভাগ্যবশত পাসপোর্ট পেয়ে গেলাম, যদিও ভিসা ছাড়া। সৌভাগ্যবশত এ কারণে যে না পেলে আবার কতবার যেতে হতো তার থেকে অন্তত ভালো।

৩. যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পথে ট্রানজিটে যেহেতু হিথরোতে তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে, এ জন্যই ভিসা লাগবে। অর্থাৎ রাত ১১টা ৫০ মিনিটে হিথরোতে পৌঁছে মধ্যরাতের পরে রওনা হলেও ভিসা লাগবে। ২০০৪ সালে আইসিপিসির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ প্রাগ শহরে অনুষ্ঠিত হবে। আকাশপথের জটিল হিসাবে লন্ডন ঘুরে ফেরত আসতে ভাড়া কম লাগে। আমার দল ইতিমধ্যে লন্ডনের ভিসা নিয়েছে। আমি গিয়ে জানলাম যে কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতিতেও ট্রানজিট ভিসা লাগবে এবং সেই রাজকীয় সিলের জন্য পাসপোর্টের একটি পূর্ণ পাতা ফাঁকা থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার পাসপোর্টে তা ছিল না। উপনিবেশের অর্থকড়ি তো আর পাওয়া যাচ্ছে না, এখন ট্রানজিটকে ইস্যু করে দেশটি অর্থ আদায়ের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে!

৪. অবশ্য লন্ডন এড়ানোর ফল যে ভালো হয়েছে তা নয়। আমি লন্ডন দিয়ে না গিয়ে কম দূরত্বে দুবাই হয়ে প্রাগে পৌঁছার টিকিট কিনে ফেললাম। যাহোক, দুবাই পৌঁছে অপেক্ষা করছিলাম চেক এয়ারলাইনের ফ্লাইটের জন্য, তা তো আর আসে না। অপেক্ষা করতে করতে না খেয়ে থাকতে থাকতে খাওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছি। একাধিকবার গিয়েও চেক প্রজাতন্ত্রের বিমান অফিসে কাউকে পাইনি। এ রকম অবস্থায় যেকোনো শ্বেতচর্মধারী সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব নিশ্চয়ই অফিসের সামনে লঙ্কা–কাণ্ড বাধিয়ে ফেলত। আমার কখনো এতটা সাহস হয়নি। একসময় কর্মকর্তাদের পেলাম, তারা আমাকে জানাল আমাকে খুঁজতে তাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় নিজেকেই দোষী মনে হলো এবং আমার কপালে কোনো সুবিধা জুটল না।

একসময় মনিটরে দেখা গেল চেক বিমান আসছে, তবে তা দুবাইয়ে এসে শ্রীলঙ্কা যাবে এবং ফিরতি ভ্রমণে আমাদের নিয়ে যাবে। প্রায় ঘণ্টা চল্লিশেক অপেক্ষার পর আমাদের যাত্রা শুরু হলো। সম্ভবত এপ্রিল মাস। প্রাগে নেমে জানা গেল আমার বাক্সপেটরা আসেনি এবং শীত নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত কাপড়ও আমার ছিল না। আমাকে হোটেলে নেওয়ার জন্যও কেউ আসেনি। অগত্যা ট্রামে চড়ে হোটেল রেনেসাঁর দিকে রওনা হলাম। সিকি শতাব্দী আগে রাশিয়ায় পড়ার সুবাদে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে মানুষের সাহায্য পেয়ে হোটেলে পৌঁছালাম। এখন নিশ্চয়ই চেক রিপাবলিকে কেউ আর রাশিয়ান ভাষা জানে না। শীতে আমার গোবেচারা অবস্থা দেখে সবাই সহানুভূতি প্রকাশ করলেন, যাতে আমার শীতের কষ্ট কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে গেল। তবে বাক্সপেটরা আসার খোঁজ নিতে গেলেও আমাকে প্রতিবার ৫০ ডলার ধরিয়ে দিয়েছে, যা আমার জীবনে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ।

৫. রাশিয়ায় পড়ালেখাকালীন আমরা অল্প পয়সায় রেলের টিকিট কিনে গোটা ইউরোপ ঘুরতে পারতাম। তাতেও বিড়ম্বনা কম সহ্য করতে হয়নি। বীরত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে হটিয়ে স্বাধীন করা দেশের নাগরিকদের কিন্তু বিদেশ ভ্রমণে যথেষ্ট নাজেহাল হতে হয়েছে। কূট ইউরোপের ততোধিক জটিল সীমান্ত পাড়ি দিতে মধ্যরাতে পুলিশ ডেকে তুলেছে এবং সবুজ পাসপোর্টকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে। আমার ঘুম হারাম হয়েছে পুরোনো যাত্রীর ওপর দেড়–দুই ঘণ্টা পরপর নতুন সীমান্ত নতুন পুলিশ নতুন তল্লাশি হওয়ার কারণে!

৬. একবার ছাত্রদের নিয়ে আমেরিকা থেকে ফিরছি। সিঙ্গাপুরে বেশ একটু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে তখন সিঙ্গাপুর ফ্রি ভ্রমণের ব্যবস্থা ছিল। ভাবলাম সবাই মিলে এই ট্যুরটা ধরি। একটি ১৮–১৯ বছরের মেয়ের কাছে নাম লেখাতে হবে। আমাদের পাসপোর্ট দেখে মনে হলো সে আঁতকে উঠল। বলল দেখো, আমাদের বিমানবন্দর কত সুন্দর, বিমানবন্দর দেখো এবং উপভোগ করো। অর্থাৎ সে আমাদেরকে ট্যুরে যেতে দেবে না। আমি বললাম, দেখো আমরা আমেরিকা, কানাডা বেড়িয়ে এসেছি তোমাদের এক শহরের দেশে থাকার জন্য নয়। তখন সে নিচের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলল। কোনোভাবেই আমাদের সিঙ্গাপুরে ঢুকতে দেবে না।

৭. বিমানবন্দরে নিরাপত্তা তল্লাশিতে যাবেন সবুজ পাসপোর্টধারীদের আলাদা করবে, বোর্ডিং গেটে যাবেন আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনার পাসপোর্ট নাড়াচাড়া করবে, কালক্ষেপণ করবে, নানা রকম দলিল–দস্তাবেজ চাইবে শুধু বিলম্বিত করার জন্য। এ বছর বুদাপেস্টে যাওয়ার পথে আবুধাবিতে সমস্যা। একবার ছেড়ে দিল, তারপর আবার খুঁজে খুঁজে আমাকে বের করে জিজ্ঞাসা করল কেন যাচ্ছি যার উত্তর এর আগেও একবার দিয়েছি। বলে রাখা ভালো, আমার পাসপোর্ট ভিসা ও সিলে পরিপূর্ণ তারপরও। বাংলাদেশের নাগরিক, একটু বিব্রত করতে অসুবিধা কী।

৮. একবার কোরিয়া যাব ছাত্রদের সঙ্গে। তারা ভিসা নিয়েছে, আমি নিতে পারিনি। আমার চৌকস ছাত্ররা বলল যেহেতু আমার আমেরিকান ভিসা আছে, সেহেতু আমার কোরিয়ান ভিসা লাগবে না। অনেক ভয়ে ভয়ে তাদের সঙ্গে গেলাম। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ভিসা দেখাতে বলল, আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললাম, আমেরিকার পাঁচ বছরের ভিসা রয়েছে। কোনো কথা উচ্চারণ না করে ভিসা দিয়ে দিল। সব দেশ এক নয়, সব মানুষ নিশ্চয়ই সবার জন্য একই নিয়ম প্রয়োগ করে না।

আমাদের দেশের এত বড় অঙ্কের রিজার্ভ চুরি হলো, এই পয়সাটা যদি আমেরিকার হতো, তাহলে ফিলিপাইন কি একই রকম আচরণ করতে পারত? এমনকি ইসরায়েল কিংবা ভারতের হলেও ফিলিপাইন অর্থ দ্রুত ফেরত দিয়ে গর্ববোধ করত। বাংলাদেশের অর্থ না দিলেও চলবে, এ রকম একটা অবস্থা আরকি!

৯. ইতালিতে ট্রেনে যাচ্ছি। উল্টো পাশপাশের সিটে বসে আছে একজন আমেরিকান তরুণী, সম্ভবত স্কুল শেষ করে কলেজের অপেক্ষায় আছে এই সুযোগে বিদেশ ভ্রমণ করছে। পকেটে ইগলযুক্ত পাসপোর্ট, তার কেডসসমেত পদযুগল বিপরীত সিটে বসিয়ে আরাম করছে। মহাসভ্য ইউরোপে এমন কোনো মেরুদণ্ডযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নেই যে ওই ১৬–১৭ বছরের তরুণীকে সভ্যতা–ভব্যতা শেখাতে পারে। এটা হলো শক্তির বিরুদ্ধে মূল্যবোধের মহাদুর্বল অবস্থান। অন্য দেশের তরুণ-তরুণী নয়, প্রৌঢ় মানুষও এ রকম কাজ করতে সাহস পাবে না।

১০. ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড করতে ব্রিসবেন বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের জন্য অপেক্ষা করছি। অনেকক্ষণ ধরে একটি কুকুরও যে আমার সঙ্গে অপেক্ষা করছে, তা আমি টের পেলাম যখন কাস্টমস কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসা করল মাংসজাত কোনো খাবার আছে কি না। তখন মনে পড়ল ইন্দোনেশিয়ান এয়ারলাইনে অবতরণের ঘণ্টাখানেক আগে টুথপেস্টের মতো দেখতে কাগজের মোড়কে কিছু একটা দিয়েছে, যা আমি না দেখে ব্যাগে রেখে দিয়েছি। পরে বোঝা গেল ওই মোড়কেই মাংসজাত কিছু খাবার ছিল বলে কুকুরটি আমার থেকে সরছিল না! যাহোক খাবারটি ফেলে দেওয়ার পর বের হওয়ার অনুমতি পেলাম। ওই একই বছর সিডনি থেকে পার্থ যাচ্ছি। প্লেনে চা–পাঁচ ঘণ্টা ঘুমের পর জানতে পারলাম খারাপ আবহাওয়ার জন্য পার্থে নামতে না পেরে আবার মেলবোর্নে ফেরত এসেছে।

ফলে আমার অভ্যর্থনাকারী ফিরে গেছে এবং আবার আসতে তার সময় লাগছে। আমি আমার কাঁধের ব্যাগটি পাশে রেখে তাদের খুঁজছি। একসময় যখন ব্যাগ নিতে গেলাম, কর্তব্যরত পুলিশ আমাকে ধরতে দিচ্ছে না, কারণ ওটা আনঅ্যাটেন্ডেন্ট ব্যাগেজ। তারপর নানা রকম প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়ে তবেই আমাকে ব্যাগটি দিল। ৯/১১–পরবর্তী বিশ্ব এখন যথেষ্ট অবিশ্বাসে ভরা। ভ্রমণসহ সবকিছুই এখন অনেক কঠিন। এমনকি ১৯৯৮ সালে আমার প্রথম আমেরিকা ভ্রমণে দেখেছি একটি ফ্লাইট ছাড়ার আগে যাত্রীদের ডাকাডাকি করে ভাড়া কমিয়ে বাসের মতো তুলত। সে রামও নাই, সে অযোধ্যাও নাই!

১১. উচ্চশিক্ষার্থে অস্ট্রেলিয়া যাত্রায় মেলবোর্ন শহরের ফ্লিন্ডার্স রেলওয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছি অ্যাডিলেডের ট্রেন ধরব বলে। আমার পরিচিত একজনের টেলিফোন নম্বর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করাতে পাশে দাঁড়ানো অস্ট্রেলিয়ান বললেন ‘হ্যাভ ইউ কাম টু ডাই’। আমার তো আক্কেলগুড়ুম। গন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য এসেছি কি না জিজ্ঞাসা করছে। যাহোক পরে বুঝেছিলাম এটা অস্ট্রেলিয়ান এক্সেন্ট। টুডে কে টু ডাই বলে। আরেকবার এক ইন্দোনেশিয়ান সহপাঠীর প্রশংসনীয় সাফল্যে খুশি হয়ে তার মাথায় হাত রেখেছি, অল্পের জন্য তার ঘুষি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছি। পরে জানলাম ইন্দোনেশিয়ানদের মাথায় হাত রাখা অপমানকর।

অ্যাডিলেড শহর চমৎকার, চার্চে-ভরা শহরটির বাসিন্দারাও খুবই সদালাপী, বন্ধুবৎসল। থাইল্যান্ড থেকে মেলবোর্ন দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে খুবই ক্লান্ত। ২১ডি বাস ধরতে হবে। অশীতিপর বৃদ্ধাকে বাসস্টপেজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করাতে দিক দেখিয়ে দিয়ে বললেন তিনি আমাকে আমার মালামাল টানতে সাহায্য করতে পারেন কি না। আমার আক্কেলগুড়ুম যে নিজের দেহ টানতে গলদঘর্ম, সে টানবে একজন যুবকের বোঝা!

১২. দামি এমিরেটসের ফ্লাইটে দুবাই যাচ্ছি। ব্যবহারে ‘আরবীয়’ বিমানবালক মারজানের ধারণা হলো আমি নিশ্চয়ই টিকিট ছাড়া উঠেছি এমনকি ৯/১১–এর ঘটনার পর এত রকম সিকিউরিটির পরও। বয়সের কারণে কাগজপত্র পেতে সময় লাগে। যখন খুঁজে পাচ্ছি না, তখন সে অত্যন্ত নিশ্চিত যে একটি রুই মাছ সে ধরে ফেলেছে। ভাগ্য সহায় টিকিটের একটি কপি পেয়ে গেলাম, তা–ও আবার দামি টিকিট, যাতে সিট নম্বরও লেখা ছিল। সে এদিক–ওদিক দেখে এত সহজে রুই মাছ ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।

তখন সে বলল তার কাছে এই সিটের যাত্রীর রেকর্ড নেই। আমি বললাম কম্পিউটারে দেখে নাও। বলল তার কম্পিউটার কাজ করে না। এবার আমি সুযোগ পেয়ে বললাম লোকাল বাসে কাজ করো। সে নাছোড়বান্দা, আমাকে বোর্ডিং কার্ড দেখাতে হবে। আবার ভাগ্যদেবী সহায় হলো আমার পায়ের কাছে বোর্ডিং কার্ডের ক্ষুদ্র অংশ দেখতে পেলাম এবং বহু কষ্টে হস্তগত করলাম। আবার সে বীরদর্পে এসেছে। ক্ষুদ্র কাগজটি দেখে যখন বিড়ালের মতো ফিরে যাচ্ছিল, তখন তাকে আবার লোকাল বাসের সাহায্যকারী হওয়ার পরামর্শ দিলাম।

আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের অনেক ভ্রমণকারীই অনেক চৌকস। তাদের হয়তো এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় না, উন্নত দেশের হয়তো কাউকেই হতে হয় না। তবে আমাদের দেশের পাসপোর্ট নিয়ে অনেককেই এ রকম সমস্যায় বিব্রত হতে হয়। আমরা নিজেদের তৈরি রকেটে যদি চাঁদে যেতে পারি অথবা সমরাস্ত্রে বলীয়ান হই, অথবা জাপানের মতো সমৃদ্ধিশালী দেশ হই, তাহলে হয়তো বিদেশিরা আমাদের সমীহ করতে পারে।

  • মোহাম্মদ কায়কোবাদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক