ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানের এবারের আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র জানা যায়নি
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানের এবারের আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র জানা যায়নি

মতামত

ইরান বাইরের দুনিয়া থেকে কত দিন বিচ্ছিন্ন থাকবে

ইরানের বেশির ভাগ এলাকায় গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ইন্টারনেট বন্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর নানা ইন্টারনেট শাটডাউনের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ। এর আগে কয়েক দিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ক্রমে তীব্র হচ্ছিল। তবে দেশের একেবারে ক্ষুদ্র একটি অংশে এখনো বাইরের দুনিয়ায় ছবি ও ভিডিও পাঠানো, এমনকি ফোনকল করাও সম্ভব।

গত সোমবার ‘ভাহিদ অনলাইন’ নামের একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে তেহরানের দক্ষিণ উপকণ্ঠ কারিজাকে রাস্তায় পড়ে থাকা কয়েকটি মৃতদেহের ছবি প্রকাশ করা হয়। তার আগের দিন (রোববার) একই চ্যানেলে একটি ভিডিও দেওয়া হয়।

এই ভিডিও ও বার্তাগুলোর কিছু পাঠানো হচ্ছে সেন্সরশিপ এড়িয়ে চলার জন্য তৈরি বিভিন্ন অনলাইন টুলের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে টেলিগ্রাম প্রক্সি, ‘ডেলটা চ্যাট’ নামে একটি বিকেন্দ্রীভূত মেসেজিং সেবা এবং ‘সেনো’ নামের একটি ব্রাউজার।

এসব তথ্য জানিয়েছেন ইরানি ডিজিটাল অধিকারবিশেষজ্ঞ আমির রাশিদি। তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্টারলিংক টার্মিনাল। হাজার হাজার লো-আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেটে সংযোগ দেয় এই ব্যবস্থা। গত দুই বছরে ব্যাপকভাবে চোরাই পথে এই ব্যবস্থা ইরানে ঢুকেছে। যাঁরা এগুলো ব্যবহার করছেন, তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

রাশিদির মতে, বর্তমানে ইরানে প্রায় ৫০ হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল রয়েছে; অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে এই সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত বলা হয়েছে। ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের এই সেবা ব্যবহারকারীরা ইরানের ৯ কোটির বেশি মানুষের তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ।

একটি স্টারলিংক টার্মিনাল দিয়ে একাধিক মানুষ, এমনকি পুরো একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনও ইন্টারনেটে যুক্ত হতে পারে। তবু দেশজুড়ে মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ কয়েক লাখের বেশি নয় বলে জানিয়েছেন ডাগ ম্যাডোরি। তিনি কেনটিক নামের একটি নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মের ইন্টারনেট অ্যানালাইসিস পরিচালক।

এই অল্পসংখ্যক ব্যবহারকারীই এখন ইরানের বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে শেষ ও নড়বড়ে সংযোগ ধরে রেখেছেন। ইলেকট্রনিকভাবে মূলত সরকার অনুমোদিত বা ‘হোয়াইটলিস্টেড’ কিছু ব্যবসা ও ব্যক্তির ন্যূনতম যোগাযোগ ছাড়া দেশ থেকে খুব সামান্য তথ্যই বাইরে যাচ্ছে।

রাশিদির মতে, স্টারলিংক জ্যাম করতে ইরান যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে ড্রোন জ্যাম করতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির মতো সামরিক মানের। এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিদ্যুৎ খরচ বেশি; নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অচল করে দিতে পারে। তবে এগুলো স্থানীয়ভাবে কাজ করে, দেশজুড়ে একসঙ্গে প্রয়োগ করা যায় না।

ইরানজুড়ে কর্তৃপক্ষ স্টারলিংক টার্মিনাল খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, তারা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের জন্য তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে মহল্লাজুড়ে সিগন্যাল জ্যাম করছে এবং ছাদে থাকা স্যাটেলাইট ডিশ শনাক্ত করতে ড্রোন ওড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে পাস হওয়া একটি আইনে ইরানে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখা ‘ইসরায়েলের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড।

রাশিদির ভাষায়, ‘তারা কার্যত স্টারলিংককে এমনভাবে অপরাধ বানিয়েছে যে আইনে বলা হচ্ছে, স্টারলিংক ব্যবহার মানে ইসরায়েল ও মার্কিন সিআইএর জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করা।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ঠিক কতগুলো টার্মিনাল সচল আছে আর কতগুলো জব্দ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

রাশিদির মতে, স্টারলিংক জ্যাম করতে ইরান যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে ড্রোন জ্যাম করতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির মতো সামরিক মানের। এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও বিদ্যুৎ খরচ বেশি; নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অচল করে দিতে পারে। তবে এগুলো স্থানীয়ভাবে কাজ করে, দেশজুড়ে একসঙ্গে প্রয়োগ করা যায় না।

এখনো যাঁদের কাছে চোরাই পথে আনা স্টারলিংক টার্মিনাল আছে, তাঁরা কোনোভাবে অনলাইনে যুক্ত হতে পারছেন। তবে যেসব এলাকায় জ্যামিং বেশি, সেখানে বার্তা পাঠানো ছাড়া প্রায় কিছুই করা যায় না। প্রযুক্তিতে পারদর্শী ব্যক্তিরা নিজেদের অবস্থান আড়াল করতে ভিপিএন ব্যবহার করছেন; অন্যরা ধরা পড়া এড়াতে টার্মিনাল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে নিচ্ছেন।

যদিও আপাতত স্টারলিংক ব্যবহারকারীরা যোগাযোগ করতে পারছেন, তবে ইরান (যদিও তা কঠিন) তাঁদের শনাক্ত করে ধরতে পারে। ইরান সরকার যদি যথেষ্ট চেষ্টা করে, তবে ওই টার্মিনালগুলো যে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে, সেই সিগন্যাল ধরে ব্যবহারকারীদের অবস্থান বের করা সম্ভব। যাঁদের কাছে স্টারলিংক নেই, তাঁদের জন্য রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের সাম্প্রতিক ঘোষণাই ইরানের ভবিষ্যৎ ইন্টারনেটের একটি ঝলক দেখিয়েছে। আইআরআইবি সংবাদ সংস্থা ইরানে এখন থেকে যেসব ইন্টারনেট সাইট পাওয়া যাবে, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।

এই তালিকায় রয়েছে দেশীয় সার্চ ইঞ্জিন, দেশীয় মানচিত্র ও নেভিগেশন সেবা, দেশীয় মেসেজিং অ্যাপ এবং একটি দেশীয় স্ট্রিমিং সেবাও। এটিকে অনেকে ‘নেটফ্লিক্সের ইরানি সংস্করণ’ বলছেন, যেখানে কেবল সরকার অনুমোদিত ভিডিওই থাকবে। এর অর্থ হতে পারে—ইরানের আগের ইন্টারনেট ব্যবস্থা আর ফিরে না–ও আসতে পারে।

  • আইশা ডাউন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদক ও ট্যারবেল সেন্টার ফর এআই জার্নালিজমের ফেলো

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত