জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে নির্বাচনী সরঞ্জাম। গতকাল বিকেল চারটায় চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায়
জেলার বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে নির্বাচনী সরঞ্জাম। গতকাল বিকেল চারটায় চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি এলাকায়

খাগড়াছড়ি আসন

প্রচারণার উৎসবের আমেজ ভোটের দিনও প্রত্যাশা

উচ্ছ্বাসের সঙ্গে শঙ্কার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রচারে এগিয়ে চার প্রার্থী।

খাগড়াছড়ি সদরের মহাজনপাড়ায় নিজেদের প্রদর্শনী কেন্দ্রে (শোরুম) আড্ডা দিচ্ছিলেন নারী উদ্যোক্তা লাকি চাকমা। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই উদ্যোক্তা। তাঁদের আড্ডার আলোচনার মূল বিষয় ভোট।

আলাপের একফাঁকে লাকি চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, খাগড়াছড়িতে এবার অন্য রকম ভোট হতে যাচ্ছে। টানটান উত্তেজনা ও উচ্ছ্বাস যেমন আছে, তেমনি নিরাপত্তার শঙ্কাও রয়ে যাচ্ছে। প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত যেভাবে প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছেন, তাতে বলতে পারি, নির্বাচন আগের মতো একতরফা হচ্ছে না। কঠিন লড়াই হবে এবার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসন নিয়ে লাকি চামকার কথার মিল পাওয়া যায় জেলার সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা–কর্মী, এমনকি প্রার্থীদের বক্তব্যেও। তাঁরা একবাক্যে বলছেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ চমৎকার, উৎসবমুখর। তবে ভোটের দিন পর্যন্ত এ পরিবেশ বজায় থাকবে কি না, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার ছায়া—দুইয়ে মিলে খাগড়াছড়ির এবারের নির্বাচন। সাধারণ ভোটাররা খাগড়াছড়ি নিয়ে নতুন সরকার ও নতুন সংসদ সদস্যের প্রতি নিজেদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন প্রথম আলোর মাধ্যমে। গণভোটের বিষয়ে জানলেও বিস্তারিত সম্পর্কে ধারণা কম বলে জানান তাঁরা।

খাগড়াছড়ি আসনে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে শঙ্কার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও প্রচারে এগিয়ে আছেন চার প্রার্থী। তাঁরা হলেন বিএনপির আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মো. এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী স্থানীয় সরকার পরিষদের (পরবর্তী জেলা পরিষদ) সাবেক চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ান ও দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ধর্ম জ্যোতি চাকমা। দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি দুটি আঞ্চলিক দলের আলাদা করে সমর্থন রয়েছে বলে জেলাজুড়ে আলোচনা রয়েছে।

দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল সরাসরি এবং পাহাড়ের দুটি আঞ্চলিক দল পরোক্ষভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হওয়ায় পাবর্ত্য চট্টগ্রামের এই আসনের নির্বাচনে অন্য মাত্রা যোগ করেছে।

এই আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম, জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তফা, ইসলামী আন্দোলনের মো. কাউছার, গণ অধিকার পরিষদের দীনময় রোয়াজা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরা।

ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট দেওয়া নিয়ে সংশয়

গত বুধবার খাগড়াছড়ি সদরের খাগড়াপুর, ন্যানসি বাজার, শাপলা চত্বর, মহাজনপাড়া, সিঙ্গিনালা, স্বনির্ভর, কলেজগেট, খবংপুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি–পেশা ও নানা বয়সী ২৫ জনের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর প্রতিবেদকের।

তাঁদের অনেকের বড় একটা প্রশ্ন—পছন্দের প্রার্থীকে নিজের ভোট নিজে দিতে পারবেন?

সদরের খাগড়াপুর এলাকায় একটি দোকানে কথা হয় এক ত্রিপুরা যুবকের সঙ্গে। সরকারি চাকরির বিধিনিষেধের কারণে নাম প্রকাশ করেননি তিনি। বলেন, খাগড়াছড়ির শহরের মানুষ হয়তো পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু ভেতরের উপজেলাগুলোতে যাঁরা থাকেন, তাঁরা তো পারবেন না বলে মনে হয় না।

একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মসূত্রে জেলা সদরে লক্ষ্মীছড়ি ও মহালছড়ি উপজেলার চার বাসিন্দা।

বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, দুর্গম এলাকায় এখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ভোটারদের চাপ দেওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা। তিনি বলেন, একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছে।

ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দ

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে বলে মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের একজন সদরের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন।

তিনি বলেন, ২০১৯ সালে ভোটার হলেও এত দিন ভোট দিতে পারেননি। বিএনপির নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়ার এলাকার লোক হওয়ায় তাঁদের কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। এবার তা নেই।

খাগড়াছড়ি সদরে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উক্যচিং মারমা বলে, আগের নির্বাচনগুলোতে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। কেন্দ্রে গিয়ে ফেরত এসেছেন। তবে এবার সে রকম কিছু নেই। এবারের নির্বাচনে সবাই ভোট দিতে পারবে বলে মনে হচ্ছে।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে খাগড়াপুরের বাসিন্দা ৭৯ বছর বয়সী বিমল কৃষ্ণ ত্রিপুরা বলেন, পরিবেশ ভালো মনে হচ্ছে এবার। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভোট দিতে যাবেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি আসনে চলছে প্রচারণা। শহরের আদালত ভবন এলাকায় সড়কের পাশে ঝুলছে প্রার্থীদের ব্যানার। গত বৃহস্পতিবার

পিছিয়ে থাকার আক্ষেপ

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত সুযোগ–সুবিধা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ আছে। বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও মৌলিক অধিকারের তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করেন ভোটাররা। তবে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ির উন্নয়ন নিয়ে ভোটারদের হতাশা রয়েছে।

জেলা সদরের ন্যানসি বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি করেন মো. রুবেল হোসেন। তাঁর হতাশা খাগড়াছড়ির দীর্ঘদিনের উন্নয়ন–বৈষম্য নিয়ে। তিনি বলেন, পাহাড়ের অন্য দুই জেলা রাঙামাটি আর বান্দরবান অনেক এগিয়ে গেছে। ওখানে বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যোগাযোগ ভালো। পর্যটনের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। অথচ ভোটার আর জনসংখ্যা বেশি হয়েও সব দিক দিয়ে খাগড়াছড়ি পিছিয়ে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। যেসব স্কুল–কলেজ আছে, সেগুলোতে নানা ধরনের সংকট।

খাগড়াছড়ির স্বনির্ভর বাজারে একটি ভাতের দোকানে দুপুরের খাবার খেতে এসেছিলেন স্কুলশিক্ষক ঝিনুক চাকমা। তিনি বলেন, চেঙ্গী নদীর ওপারে পেরাছড়াপাড়ায় তাঁদের বাড়ি। নদী পার হয়ে যেতে হয়। একটি সেতুর জন্য তাঁরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন। কিন্তু ভোটের আগে অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কেউ তা বাস্তবায়ন করেননি।

এই বাজারের নারী দোকানি সোনালিকা চাকমা তো সরকারের কাছে আশা করে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খাগড়াছড়িতে বাঙালি–পাহাড়ি এলাকাভেদে উন্নয়নে বৈষম্য রয়েছে। বাঙালিদের যেসব এলাকা রয়েছে, সেখানকার রাস্তাঘাটগুলো ভালো, সড়কবাতি আছে, কিন্তু পাহাড়িদের এলাকার রাস্তাঘাট ভালো না, ভাঙাচোরা। গাড়ি চলাচলের মতো অবস্থা নেই। রাস্তায় বাতি নেই। সবাই শুধু ভোট নিয়েছেন, কাজ করেননি।

নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ পাহাড়

খাগড়াছড়িতে নির্বাচন মানেই শুধু প্রতীক আর প্রচার নয়, নারী ও শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নও বড় হয়ে আসে। গত দেড় বছরে দুই স্কুলছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে এখানে।এ নিয়ে উত্তপ্ত হয় পাহাড়।

নারী অধিকারকর্মী মনীষা তালুকদার বলেন, ‘নিরাপদ খাগড়াছড়ি চাই। সাম্প্রদায়িক হামলার ভয় এবং লুটপাটের ভয়ে যাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে না হয়। নারী–শিশুর নিরাপত্তা চাই। কিশোরী বা নারীরা যাতে সহিংসতার শিকার না হন, এ জন্য আাইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন করতে হবে নতুন সরকার ও সংসদ সদস্যকে।’

এবারের প্রথম ভোটার হওয়া খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রী হৈমন্তী চাকমা বলেন, নারী ও শিশুদের জন্য পাহাড় নিরাপদ হোক। সহিংসতা চান না।

তারুণ্যের আগ্রহ ও ভাবনা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জয়–পরাজয়ে একটি ভূমিকা থাকে নতুন ভোটারদের। খাগড়াছড়ি আসনে এবার ভোটার বেড়েছে ৩৮ হাজার ৬৯৪ জন। এবার মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৩ জন।

নতুন ভোটারদের একজন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রী ইয়াসমিন আকতার। কলেজের ছাত্রীনিবাসের সামনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। প্রথম ভোট নিয়ে নিজের আগ্রহ–উৎসাহের কথা জানিয়ে বলেন, ‘দেশের অবস্থা খুব খারাপ করে গেছে আগের সরকার। এবার এমন কাউকে ভোট দিতে চাই, যিনি মানুষের বিপদে–আপদে পাশে থাকবেন। দেশের উন্নয়ন করবেন।’