অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে বেতন ও মজুরি নিয়ে দুটি সুপারিশ এসেছিল। একটি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৫ শতাংশ বাড়ানো। অন্যটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হার ঘোষণার সুপারিশ। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সুপারিশটি করেছিল জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫। আর শ্রমিকের ন্যূনতম জাতীয় মজুরির সুপারিশ করেছিল সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শ্রম সংস্কার কমিশন।
দুই কমিশনই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিল। তবে ওই সরকারের সময় শুধু বেতন কমিশন নিয়ে উৎসাহ দেখা যায়। শ্রম কমিশনের সুপারিশ তেমন কোনো আলোচনায় ছিল না। যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছিলেন শ্রমজীবী মানুষ।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর আন্দোলন ও গুলিতে প্রাণদান করে পোশাকশ্রমিকেরা মজুরি মাত্র ৪ শতাংশ বেশি বাড়াতে সক্ষম নন। বার্ষিক ৫ শতাংশ নিয়মিত বৃদ্ধির সঙ্গে ৪ শতাংশ যোগ হয়ে মোট বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৯ শতাংশ, যা তৎকালীন মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে ২ শতাংশের মতো কম। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি কম বাড়লে প্রকৃত আয় কমে যায়, এটা সবার জানা।
এটা স্পষ্ট যে বেতন কমিশন গঠন এবং উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ গ্রহণ করে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চাপ রেখে গিয়েছিল।
সরকারের কাছে এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপুল বকেয়া পরিশোধের টাকা নেই, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি দেওয়ার টাকা নেই, জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না টাকার অভাবে, বাজেটে বিরাট ঘাটতি, রাজস্ব আদায় কম—এমন সময় বেতন বাড়াতে দরকার আরও বেশি টাকা। বাজেটে (২০২৬-২৭) জনপ্রশাসনে বাড়তি বরাদ্দ রাখা হলো ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়াতে বছরে দরকার বাড়তি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি।
বিএনপি সরকার যে খুশিমনে বেতন বাড়ানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে, তা মনে হয় না। সরকার জানে যে বেতন না বাড়ালে প্রশাসনযন্ত্র গোস্সা করে বসে থাকবে। কাজ এগোবে না।
সমাজের একটি অংশ যখন আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ কিনে বাসায় ফেরে, তখন আরেকটি বড় অংশ কিছুটা কম দামে চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রোদে পোড়ে।
বাড়তি টাকার সংস্থানের জন্য অনেকেই সরকারের আয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন। আয় বাড়ানোর সুযোগ আসলেই আছে। বিপুল মানুষ করের জালের বাইরে। জালের ভেতরে থাকা বহু মানুষ সামান্য কর দেন। কর ফাঁকি ও করছাড়ের ব্যাপকতা অনেক বেশি।
কর আদায়ে যত পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, সরকারের অর্থের পুরো চাহিদা তাতে পূরণ হবে না। বাস্তবতা হলো মানুষের এখন বাড়তি কর দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। ব্যবসায় মন্দা ভাব, বেসরকারি বেতন ও মজুরি সেভাবে না বৃদ্ধি পাওয়া, সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে চড়া মূল্যস্ফীতি—এসব মানুষের আরও কর দেওয়ার সক্ষমতা নিঃশেষ করে দিয়েছে।
এখন সরকারের সামনে একটি বিকল্প হলো নিজেদের ব্যয় কমিয়ে ফেলা। কীভাবে ব্যয় কমানো যায়, তার দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
একটি উপায় হতে পারে সরকারের আকার কমানো। বিএনপি সরকারের প্রথম মেয়াদে সরকারের অর্থসংকট এত বেশি ছিল না। তবে ১৯৯৩ সালে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন কমিটি (এআরসি) গঠন করা হয়। সাবেক সচিব এম নুরুন্নবী চৌধুরী ছিলেন এর প্রধান।
ওই কমিটি ১৯৯৬ সালে দেওয়া প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৩৫ থেকে কমিয়ে ২২টি করা, ৪৭টি সংস্থা বিলুপ্ত করা এবং ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কমিটির ধারণা ছিল, সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৭৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে এবং ৪৬ হাজার ২৭৬ জন সিভিল কর্মচারী অতিরিক্ত হবে।
বিএনপি সরকার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কারণ, সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন বিএনপি সরকার ওই রকম একটি কমিটি গঠন করে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে, মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংখ্যা কমাতে পারে। অন্তত একীভূত করার চিন্তা করা যায়।
সরকারের বিলাসিতা বাদ দেওয়া দরকার। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ১৫০ টাকার মধ্যে সারছেন। এটা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। এ ছাড়া সরকারের বিলাসিতা কমানোর অনেক জায়গা আছে। একটি হলো প্রকল্পের গাড়ি পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে আমলাদের ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করা।
সরকারের চাকরিজীবীদের বৈঠক করার জন্য ভাতা দেওয়া, অহেতুক প্রশিক্ষণ আয়োজন করে ভাতা নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় ভবন নির্মাণ—এসব বন্ধ করতে হবে। দরকার আসলে সরকারি ব্যয় কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা এবং ওই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া।
দেশে বহুদিন ধরেই আয়বৈষম্য বিপজ্জনক পর্যায়ে। সমাজের একটি অংশ যখন আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ কিনে বাসায় ফেরে, তখন আরেকটি বড় অংশ কিছুটা কম দামে চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রোদে পোড়ে।
করোনাকালে ‘লকডাউনের’ মধ্যে যখন বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছিলেন, বেতন কাটছাঁট হচ্ছিল, ছোট বহু ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়েছিলেন, তখন সরকারি চাকরিজীবীদের কোনো চিন্তা ছিল না। পূর্ণ বেতন নিয়ে, পূর্ণ উৎসব ভাতা নিয়ে তাঁরা ছুটিতে ছিলেন। উদাহরণ আরও আছে।
এ ধরনের বৈপরীত্য সমাজের মধ্যে ‘আমরা বনাম ওঁরা’—এই অনুভূতি অথবা মনোভাব তৈরি করে। এটা ভয়ংকর। যুগে যুগে দেশে দেশে সরকারের প্রতি অসন্তোষের কারণ এই অনুভূতি। বৈষম্যের শিকার হওয়ার বোধই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মাঠে নামিয়েছিল।
মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা বেতনে দোকান ও কারখানায় চাকরি করা এবং ফুটপাতে কোনো রকমে হকারি করে মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় করা তরুণ ও যুবারাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে থাকা ‘আমরা বনাম ওঁরা’ অনুভূতি যদি বেড়ে যায়, সেটাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে চিন্তার বিষয়।
সরকার ‘ওঁরা’র কথা শুনেছে। ‘আমরা’রা কী বলতে চান, তা শুনতে কান পাততে হবে।
রাজীব আহমেদ প্রথম আলোর হেড অব ডিপ নিউজ
মতামত লেখকের নিজস্ব