মতামত

সংস্কার ছাড়া গণতান্ত্রিক রূপান্তর কি সম্ভব

রাষ্ট্র সংস্কারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বাংলাদেশের জনপরিসরে তর্কবিতর্ক এখনো চলমান। সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ–সভাপতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের একটি সাক্ষাৎকারের প্রতিক্রিয়ায় গবেষক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার একটি প্রবন্ধে কিছু জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি বর্তমান সংস্কার ও এর প্রক্রিয়াগত কিছু দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন।

তিনি মূলত চারটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: প্রথমত, সাংবিধানিক সংস্কারের প্রকল্পটা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর এজেন্ডা আকারে হচ্ছে কি না? দ্বিতীয়ত, সংস্কারপ্রক্রিয়া আদতে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে? তৃতীয়ত, গণভোটের মাধ্যমে কি সত্যিই জনগণের প্রকৃত সম্মতি যাচাই করা সম্ভব? চতুর্থত, স্বৈরতন্ত্রের ফিরে আসার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে যে ‘ভয়কেন্দ্রিক’ রাজনৈতিক ডিসকোর্স তৈরি করা হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত করছে কি না।  

দুই.

দার্শনিক হানা আরেন্ডটের বরাত দিয়ে জালাল উদ্দিন শিকদার উল্লেখ করেছেন, যেকোনো আন্দোলনের পর কিছু সংগঠিত গোষ্ঠী নিজেদের সেই আন্দোলনের ‘একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাঁর মতে, জুলাইয়ের বহুত্ববাদী গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের দাবি বা একটি নির্দিষ্ট ‘সাংবিধানিক প্রকল্প’কে একমাত্র বৈধ আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর প্রশ্ন হচ্ছে, সবাই কি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্যই রাস্তায় নেমেছিলেন?

হানার এই সমীকরণ পৃথিবীর সব আন্দোলনের বেলাতেই খাটে। এই সমালোচনা প্রায় সব আন্দোলনের বেলায় করা যায়। বিদ্যায়তনিক জগতে এই সংকট কাটানোর জন্য নানা পদ্ধতিগত আলোচনাও রয়েছে।

তবে এই যুক্তির আলোকে সাংবিধানিক সংস্কার বা পুনর্লিখনের আলোচনাকে মিলিয়ে দেখার বিষয়টিকে অনৈতিহাসিক হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের সমাজের নানা অংশ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, যার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছে চব্বিশের জুলাইয়ে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায়। এখানে দুটি বাস্তবতাকে আমাদের আমলে নেওয়া দরকার।

প্রথমত, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের আলাপ মোটেও নতুন নয়। এখানকার সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র ও এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে বিস্তর আলাপ হয়েছে। বিগত আওয়ামী শাসনামলে যখন সংবিধানের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা গণতন্ত্রহীনতার বীজগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে, তখন এই আলাপ মূলধারার মাঠের রাজনীতিতেও জোরালো হয়। ফলে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করা একটি জনপ্রিয় দাবিতে পরিণত হয়েছিল।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও গণসংহতির মতো দলগুলো যেমন সংস্কারের আলোচনা রাজনৈতিক মাঠে হাজির করেছিল, তেমনি বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলও তাদের ৩১ দফায় সংবিধান-সংশ্লিষ্ট বহু সংস্কারের কথা বলেছিল।

দ্বিতীয়ত, বিগত দেড় দশকে যে ধরনের পদ্ধতিগত গুম-খুন এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্ট মাসে যে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, সেখানে স্বভাবতই ‘সংস্কার’ আলাপ জরুরি হয়ে দেখা দেয়। কেননা, পৃথিবীর অভিজ্ঞতা বলে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ ধরনের সহিংসতা-উত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না।

সুতরাং সাংবিধানিক সংস্কারের দাবিকে কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। বরং একে গত ৫০ বছরের রাজনৈতিক সংকটের পরিণতি এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলনের যৌক্তিক ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখতে হবে।

এই বাস্তবতায় স্বৈরতন্ত্রের ফিরে আসার আশঙ্কা এবং বিভিন্ন পরিচয়বাদী রাজনীতির ‘ভয়’ (যেমন হিন্দু/মুসলমানরা বিপদে আছে) এক কাতারের নয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে দেশ আবার স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার যে আশঙ্কা, তাকে পরিচয়বাদী রাজনীতির ছকে ফেলে বিচার করা বিভ্রান্তিকর। দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাঁরা গেছেন, তাঁদের কাছে এটা কেবল শঙ্কার বিষয় নয়, বাস্তব। একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রায় স্বৈরতন্ত্রকে ঠেকানোর বাসনা সেই রূপান্তর প্রক্রিয়ারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তিন.

গত দেড় বছরের সংস্কারপ্রক্রিয়া কতটা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বা ‘গণতান্ত্রিক’ ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় আদৌ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কতটা ছিল? সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এটিকে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলা যায়?

প্রথম আলোতে প্রকাশিত আরেকটি লেখায় লিখেছিলাম, বিপ্লবী মুহূর্তে জনগণের যে স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলে তার
রূপ পাল্টায়। প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট না করলে এই সমালোচনা বিমূর্ত হয়ে ওঠে।

জনগণের অংশগ্রহণবিষয়ক সব আলাপে একটা তথ্য উপেক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারছি, সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে কমিশন একটি ওয়েবসাইট চালু করেছিল, যেখানে ৫০ হাজার ৫৭৩টি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত মতামত জমা পড়ে। এ ছাড়া কমিশন মানবাধিকার সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছে। তিন সপ্তাহ ধরে ২১টি অধিবেশনে ৪৩টি সংগঠনের প্রতিনিধিরা লিখিত ও মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সমঝোতার উদ্যোগগুলো কেন বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে? মাঠের রাজনীতির সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ঐকমত্যের প্রক্রিয়াকে যেভাবে গ্রাস করে নেয়, তা থেকে উতরানোর উপায় কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। পাশাপাশি এই আলাপকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার; এবারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো কি আমাদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট উতরানোর জন্য যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কমিশন পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে দেশের ৬৪টি জেলা থেকে সরাসরি সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে ৪৫ হাজার ৯২৫টি খানার (হাউসহোল্ড) মতামত সংগ্রহ করেছে।

এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে সংস্কারপ্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না বলে যে ঢালাও সমালোচনা করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। অতীতে বাংলাদেশে যতবার সংস্কার বা নীতিনির্ধারণী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার তুলনায় এই প্রক্রিয়া পদ্ধতিগতভাবে অনেক বেশি জনসম্পৃক্ত ছিল।

জালাল উদ্দিন শিকদারও তাঁর লেখায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বের কথা বলছেন। বাংলাদেশে যে সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সেটা ধাপে ধাপে যখন ঐকমত্য কমিশন পর্যন্ত গড়াল, সেটাও কিন্তু আলোচনা বা তাঁর ভাষায় ‘তথ্যভিত্তিক জন-আলোচনার’ মাধ্যমেই হয়েছিল। রাজনৈতিক সমঝোতাই ছিল জুলাই সনদ বা ঘোষণাপত্রের মূল ভিত্তি।

চার.

দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক সহিংসতা ও অভিজ্ঞতা জনগণের মধ্যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে, তা দূর করতে আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া আর কোনো পথ নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, সেখানে এটাকে কেবল কোনো গোষ্ঠীর দাবি বলে খারিজ করা যাবে না।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন এক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে একটি ন্যূনতম সমঝোতা গড়ে উঠছিল, ক্ষমতার রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাতে তা আজ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম। গত দেড় বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর গড়ে ওঠা সমঝোতা থেকে বিএনপির পশ্চাদপসরণের আলামত স্পষ্ট। যেমন: বিচার বিভাগ পৃথককরণ ইস্যুসহ যে বিষয়ে খোদ বিএনপিও ঐকমত্যে এসেছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো বাস্তবায়নে তাদের অনীহা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সমঝোতার উদ্যোগগুলো কেন বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে? মাঠের রাজনীতির সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ঐকমত্যের প্রক্রিয়াকে যেভাবে গ্রাস করে নেয়, তা থেকে উতরানোর উপায় কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। পাশাপাশি এই আলাপকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার; এবারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো কি আমাদের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট উতরানোর জন্য যথেষ্ট ও পর্যাপ্ত?

যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতার ভাঙন মানেই আবারও নাগরিকের জানমালকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। তাই সংস্কারের বিষয়বস্তু নিয়ে আরও খুঁটিনাটি আলোচনা যেমন দরকার, তেমনি মাঠের রাজনীতিতেও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অব্যাহত রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ বজায় রাখার বিকল্প নেই।

  • সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব