এসএসসির ফলাফলের পরে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ১০ আগস্ট ২০২৬
এসএসসির ফলাফলের পরে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ১০ আগস্ট ২০২৬

মতামত

শেষ পর্যন্ত জিপিএ-ই কি শিক্ষার্থীর মেধার মানদণ্ড হবে

৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৪ শতাংশের মতো। গত দুই দশকের মধ্যে এত কম পাসের হার কখনোই ছিল না। ২০০৭ সালের পর থেকেই পাসের হার ছিল তুলনামূলকভাবে উচ্চ এবং ঊর্ধ্বমুখী।

কিন্তু গত বছর থেকে পাসের হার নিম্নমুখী হয়েছে। ২০২৫ সালে গড় পাসের হার ছিল ৬৮ শতাংশের সামান্য ওপরে; অথচ ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশের কাছাকাছি। এর আগের বছরগুলোয় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে বা আশপাশে ছিল; এমনকি কোনো কোনো বছর তা ৯০ শতাংশও ছাড়িয়েছে!

এ বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৪ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষার্থী এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮; আর এ বছর ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন। আবার একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে পাস করতে না পারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ৫১টি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ১৩৪টি; আর এ বছর এ রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১২।

এবারের পরীক্ষার ফলের আরেকটি ব্যাপার বেশ আশঙ্কাজনক। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, পাস করা শিক্ষার্থীদের অন্তত অর্ধেক জিপিএ–৩-এর নিচে পেয়েছে। শিক্ষা বোর্ড–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, জিপিএ–২ থেকে ৩ কিংবা ন্যূনতম জিপিএ নিয়ে যারা পাস করেছে, তাদের বড় অংশ গ্রামের। এর মধ্যে দরিদ্র এলাকায় এমন ফল বেশি দাবি করে তাঁরা এ বিষয়ে আরও বিশ্লেষণের পক্ষে মত দিয়েছেন।

বাস্তবতাও এটা বলে, দরিদ্র পরিবারের অধিকাংশ শিক্ষার্থী আলাদা করে কোচিং-প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায় না কিংবা প্রায় ক্ষেত্রেই ভালো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পায় না। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম তাদের শিক্ষাজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। অতীতের ফলাফলেও গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য দেখা গেছে; কিন্তু তা কমানোর জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও এবার ব্যবধান বেড়েছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার সবচেয়ে কম, ৪৯ শতাংশের নিচে। বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগের পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলও মানবিকের তুলনায় ভালো, গড়ে ৬৫ শতাংশের কাছাকাছি। মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সামগ্রিক পাসের হারে তা প্রভাব ফেলেছে। স্কুলগুলোতে দেখা যায়, মানবিক বিভাগে সবচেয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রবণতা চলে আসছে।

মজার ব্যাপার হলো, শিক্ষা বোর্ডের হাতে যে পাসের হার বাড়ানোর চাবিকাঠি থাকে, তার ইঙ্গিত বিভিন্ন সময়েই পাওয়া গেছে। যেমন গত বছর ফল প্রকাশের পর আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি সাংবাদিকদের কাছে বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো টার্গেট ছিল না যে পাসের হার এত করব, বাড়াব, নাকি কমাব।’ পত্রিকার সংবাদেও বলা হয়েছিল, উত্তরপত্র মূল্যায়নে অন্যান্য বছরের চেয়ে ‘কড়াকড়ি’ ছিল। এ বছর ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা বলেছেন, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র ‘নির্মোহভাবে’ মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এভাবে এক বছরের শিক্ষার্থীদের আমরা আগের-পরের বছরের শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা করে ফেলছি। কিন্তু তারা সবাই পরবর্তী জীবনে চাকরির বাজারে একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ফলে কোনো বছরে খাতা মূল্যায়নে সরকারের বিশেষ নির্দেশনা থাকা বা না থাকা বাস্তব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বাড়তি লাভ-ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ভবিষ্যতে তাদের অসম প্রতিযোগিতায় ফেলে দেয়।

বর্তমান অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোয় আসন খালি পড়ে থাকবে সাড়ে ১৩ লাখের বেশি। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য, ‘ভালো’ কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য আগের মতোই চাপ থাকবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো, কোনটি মন্দ, এটা মোটাদাগে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই বিবেচনা করা হয়।

খাতা দেখার ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতাকে অস্বীকার করা যায় না। সংবাদমাধ্যমে প্রতিবছরই খাতা দেখায় শিক্ষকদের অনিয়ম ও গাফিলতির খবর আসে। চায়ের দোকানে বসে কিংবা শিক্ষার্থীদের সহায়তা নিয়ে খাতা দেখার সংবাদ কয়েক দিন আগে পত্রিকায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা ছাড়া বিকল্প দেখি না। তা ছাড়া নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকার কারণে শিক্ষকভেদে নম্বরেরও কমবেশি হয়। এ সমস্যার সমাধানের জন্য একাধিক পরীক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়নের প্রস্তাব করি।

এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কপালও খারাপ বলতে হবে। করোনা মহামারির সময়ে, যখন স্কুল কার্যত বন্ধ ছিল, তারা পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিকের চূড়ান্ত এবং মাধ্যমিকের সূচনার গুরুত্বপূর্ণ দুই বছর তারা সরাসরি পাঠবঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের শিখনঘাটতি বেশি থাকাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া নবম শ্রেণিতে ওঠার পর এই শিক্ষার্থীদের হাতে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রমের বই তুলে দেওয়া হয়েছিল। সে বই সরিয়ে নিয়ে দশম শ্রেণিতে তাদের আবার আগের শিক্ষাক্রমের বই তুলে দেওয়া হয়। ফলে, পরীক্ষার জন্য সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করেও ধস ঠেকানো যায়নি।

বর্তমান অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোয় আসন খালি পড়ে থাকবে সাড়ে ১৩ লাখের বেশি। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য, ‘ভালো’ কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য আগের মতোই চাপ থাকবে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভালো, কোনটি মন্দ, এটা মোটাদাগে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল দিয়েই বিবেচনা করা হয়।

কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানের ব্যবধান অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। যেমন স্কুল-কলেজে নিয়মিত বিরতিতে পাঠদান ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকির আওতায় আনতে হবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকদের কোচিং বা প্রাইভেট বন্ধ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে যাতে অনিয়ম না হয়, এ জন্য কড়া নজরদারি থাকতে হবে।

শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা জিপিএ দিয়ে কোনোভাবেই মাপা সম্ভব নয়। তাই মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। এখন পর্যন্ত স্কুলগুলোয় নম্বরের ভিত্তিতেই একজন শিক্ষার্থীর মান নির্ধারণ করা হয় এবং তাকে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়। অথচ ওই শ্রেণির নির্ধারিত যোগ্যতা সে হয়তো যথেষ্ট মাত্রায় অর্জনই করেনি। প্রতিটি বিষয়ের জন্যই নির্দিষ্ট যোগ্যতা নির্ধারণ করা থাকে। সেগুলোর কোনোটিতে ঘাটতি রয়ে গেলে পরবর্তী শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণে সমস্যা তৈরি হয়।

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বড়দের ফলাফল জানতে আগ্রহী একই বিদ্যালয়ের ছোট শিক্ষার্থীরাও। তারা এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী নয়, তবু মুঠোফোনে বড়দের ফলাফল দেখছে। সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

এ কারণে স্কুলগুলোর পরীক্ষার রেজাল্ট শিটে বা মূল্যায়নপত্রে গতানুগতিক জিপিএ বা নম্বরের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা-সবলতার স্পষ্ট বিবরণ থাকা দরকার। একই সঙ্গে এই দুর্বলতা বা শিখনঘাটতি দূর করার জন্য বাড়তি ক্লাস ও পরীক্ষার আয়োজন করা প্রয়োজন।

শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও বহুমুখী করার জন্য বর্তমান সরকারের নানা রকম উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ বিষয়ে দুটি আলাদা পাঠ্যপুস্তক যুক্ত হচ্ছে। তৃতীয় ভাষা শেখা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলোর পাশাপাশি আমাদের খেয়াল রাখা দরকার, সব শিক্ষার্থী সব বিষয়ে সমান দক্ষ হয় না। তাদের আগ্রহের ক্ষেত্রও এক রকম থাকে না। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়ও বিবেচনায় রাখা উচিত। সৃজনশীল ও অতিরিক্ত দক্ষতা রেজাল্ট কার্ডে উল্লেখ থাকতে পারে।

পাসের হার বৃদ্ধি পেলেই কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়বে—এমনটা বলা যায় না। বরং শিক্ষার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করানোর দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মনোযোগ দিতে হবে। সামগ্রিক শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষাক্রম, পাঠদানপ্রক্রিয়া ও মূল্যায়নপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে বৈষম্যের শিকার না হয়, সে জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

    মতামত লেখকের নিজস্ব