
সাংগ্রাই মারমা ও রাখাইনদের একটি উৎসব। এটি সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উদ্যাপিত হয়। এটি পুরোনো বছর থেকে নতুন বছরে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
এ উদ্যাপন সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন স্থায়ী হয়ে থাকে এবং নববর্ষের দিনে এর সমাপ্তি ঘটে।
সাংগ্রাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রতীকীভাবে মৈত্রী পানিবর্ষণ, যা পূর্ববর্তী বছরের পাপ ও দুর্ভাগ্য ধুয়ে ফেলার প্রতীক।
এ সময় শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা জলক্রীড়া ও মৈত্রী পানিবর্ষণে অংশ নেয়। এই নববর্ষ উৎসব বিভিন্ন নামে উদ্যাপিত হয়, যেমন সাংগ্রাইন, বিজু, বৈসু, চাংক্রান, সাংরান, বিষু প্রভৃতি, যা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে প্রচলিত।
বাংলা পঞ্জিকায় এই সময়টিকে মহাবিষুবসংক্রান্তি নামে উল্লেখ করা হয়। যদিও ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ঐতিহ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামে উৎসবটি প্রচলিত, এসব উৎসবের একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক শিকড় রয়েছে, যা ‘বিষুবসংক্রান্তি’ থেকে উদ্ভূত বলে বিশ্বাস করা হয়, যা ঋতুর পরিবর্তন ও জীবনের নবায়নের প্রতীক।
নববর্ষ উৎসবটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে উদ্যাপিত হয়। যেমন লাওসে পি মাই, থাইল্যান্ডে সংক্রান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান ও শ্রীলঙ্কায় আলুত আভুরুদু নববর্ষ উৎসব।
এ ছাড়া এ সময়েই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখী (পাঞ্জাব), পুথান্ডু (তামিলনাড়ু), বিশু (কেরালা), উগাদি (অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটক) ও বিহু (আসাম) উদ্যাপিত হয়।
এ বছর সাংগ্রাই ১৩ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত উদ্যাপিত হবে এবং নতুন বছর শুরু হবে ১৭ এপ্রিল (মারমা ও রাখাইন বর্ষ ১৩৮৮)।
মন্দির, রাস্তা ও জনসমাগমস্থলে মানুষ প্রার্থনা ও মৈত্রী পানিবর্ষণের মাধ্যমে উৎসবটি উদ্যাপন করে থাকে। তবে এই বর্ষবরণের উৎসব শুধু একটি উৎসব নয়। এটি একটি মহাজাগতিক পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত। এটি পরিবর্তন, শৃঙ্খলা ও ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিকে তুলে ধরে।
একটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, বর্তমান মহাজাগতিক চক্রের (ভদ্র কল্প) প্রারম্ভিক পর্যায়ে জ্যোতির্ময় সত্তাগণ ব্রহ্মলোক থেকে মানবজগতে অবতরণ করে। তাদের প্রাথমিক দৈহিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দীপ্তিময়। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর উপরিভাগে থাকা ‘অমৃতসদৃশ’ আস্তরণকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ফলে তারা ধীরে ধীরে স্থূল দেহ ধারণ করে এবং দেহধারণের ফলে তাদের স্বাভাবিক জ্যোতি ক্রমে ম্লান হয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গভেদের সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে তারা পৃথিবীর স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ওঠে। যখন অন্ধকারের উদ্ভব ঘটে, তখন তারা আলোর প্রয়োজন অনুভব করে। সেই প্রয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে সূর্য, চন্দ্র, তারকা প্রভৃতির আবির্ভাব ঘটে।
পৌরাণিক বিবরণ অনুসারে, এই মহাবিশ্ব স্থির বা অচল নয়, এটি প্রতিনিয়ত সংকোচন ও পুনরায় বিস্তৃতির মাধ্যমে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে এটি একটি ক্রমবিকাশমান ও বিবর্তনশীল সত্তা।
দিব্য সত্তাগণ, বিশেষত দেবরাজ ইন্দ্র—মানবজগতের আচরণ ও গতিপ্রকৃতিকে সময়ে সময়ে প্রভাবিত করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
একসময় মুনি জ্ঞান নামক একজন ঋষি, গভীর ধ্যানচর্চার মাধ্যমে অসাধারণ যোগবল অর্জন করেন এবং সেই শক্তি দ্বারা আকাশভ্রমণ করে মহাজাগতিক সীমানাপ্রাচীরে লিপিবদ্ধ গুপ্ত জ্যোতিষবিদ্যার জ্ঞান প্রাপ্ত হন।
মহাজাগতিক ভ্রমণ করে ফেরার পথে তিনি দিব্যচক্ষুতে উপলব্ধি করেন, অচিরেই তাঁর আয়ু শেষ হতে চলেছে। সেই সময় তিনি কওয়া লমঈন নামের এক সুদর্শন পুরুষকে দেখতে পান। তখন নিজের সাধনা ও জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্দেশ্যে, ঋষি এক অলৌকিক উপায়ে—সর্পদংশনের মাধ্যমে—তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন এবং নিজের প্রাণ তার দেহে স্থানান্তর করেন।
এভাবে নতুন দেহে পুনর্জন্ম লাভ করে তিনি তাঁর জীবন অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন জ্যোতিষী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
একদিন দেবরাজ ইন্দ্র মানুষের বেশ ধরে কওয়া লমঈনের কাছে উপস্থিত হন এবং জ্যোতিষ–সংক্রান্ত এক জটিল প্রশ্ন করে বসেন। তিনি জানতে চান, ‘এ মুহূর্তে দেবরাজ ইন্দ্র কোথায় অবস্থান করছেন?’ কওয়া লমঈন নির্ভুল উত্তর দিয়ে বলেন, এ মুহূর্তে দেবরাজ ইন্দ্র মানবজগতে অবস্থান করছেন আর আপনিই হচ্ছেন সেই দেবরাজ ইন্দ্র।
উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে ইন্দ্র স্বরূপে প্রকাশিত হন, স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন এবং দেবসভায় কওয়া লমঈনের প্রজ্ঞার প্রশংসা করেন। সেই সভায় একজন ব্রহ্মরাজ একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন, ‘বছরের কোন দিনটিকে অশুভ হিসেবে গণ্য করা হবে?’ ইন্দ্র উত্তরে বলেন, ‘সালকে সাত দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগশেষ থাকে, সেটিই অশুভ দিনের নির্দেশক।’ কিন্তু ব্রহ্মরাজ এর বিরোধিতা করে যুক্তি দেন, ‘বছরকে বারো দিয়ে গুণ করে আট দিয়ে ভাগ করলে যে ভাগশেষ পাওয়া যায়, সেটিই অশুভ দিন নির্ধারণ করে।’
এই মতভেদের নিষ্পত্তির জন্য তাঁরা মর্ত্যলোকের জ্যোতিষী কওয়া লমঈনের শরণাপন্ন হন। একটি শর্ত স্থির হয়—যাঁর মত ভুল প্রমাণিত হবে, তাঁর শিরশ্ছেদ করা হবে। কওয়া লমঈনের বিচক্ষণ বিশ্লেষণে ইন্দ্রের বক্তব্যই সঠিক বলে প্রতিপন্ন হয়, যা মহাজাগতিক সীমানাপ্রাচীরেও লিপিবদ্ধ ছিল।
ফলত, শর্তানুযায়ী ইন্দ্র ব্রহ্মরাজের শিরশ্ছেদ করেন। পরে ইন্দ্র ঘোষণা করেন যে এই ছিন্নমস্তক কোনো স্থির জায়গায় সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। এটি আকাশে নিক্ষেপ করলে খরা নেমে আসবে, সমুদ্রে ফেললে জল শুকিয়ে যাবে আর ভূমিতে রাখলে সব উদ্ভিদ দগ্ধ হয়ে ধ্বংস হবে।
তখন ইন্দ্র কর্তৃক নির্দেশ দেওয়া হয় উত্তর দিকে মাথা দিয়ে শায়িত কোনো জীবের মস্তক সংগ্রহ করতে। কওয়া লমঈনের উদ্যোগে পিঙ্গলা নামে এক বিশাল হাতির মাথা সংগ্রহ করে আনা হয় এবং তা ব্রহ্মরাজের দেহে সংযুক্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে পবিত্র জল ছিটিয়ে তাঁকে পুনর্জীবিত করা হয়। এই নতুন সত্তা পরবর্তীকালে ‘ব্রহ্ম পিঙ্গলা’ বা ‘মহা পিন্নে’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি মূলত গণেশের আরেকটি নাম আর গণেশের উৎপত্তির একটি বিকল্প আখ্যান।
(সূত্র: লেখক: উ নিগ্রোধ, গ্রন্থ: বেদা উইজ্জা কোঃজং তোওয়েঃ/বেদ-বিদ্যা, ৯ খণ্ড, ১২৯২ বর্মী/১৯৩১ খ্রি., মিথিলা, মিয়ানমার)
সাতজন দেবকন্যা—নন্দা, কন্যা, ধ্বংসী, ঘোর, মহোরাকা, প্রোক্কা ও হ্রস্বকা—পর্যায়ক্রমে ব্রহ্মরাজের ছিন্নমস্তক বহনের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়, যাতে তা দীর্ঘ সময় একক স্থানে অবস্থান করে কোনো বিপর্যয়ের কারণ না হয়।
ছিন্নমস্তকের এই চক্রাকার স্থানান্তরই সাংগ্রাইয়ের জল উৎসবের মূল ভিত্তি, যা পরিশুদ্ধি, নবায়ন ও ঋতু পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
এই মিথের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—সংকটের সমাধান কোনো ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের মাধ্যমে নয়; বরং সংক্রান্তি বা সংক্রমণের মধ্য দিয়ে সম্ভব। প্রতীকীভাবে ব্রহ্মরাজের এই মস্তক এক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রতিরূপ, যা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যহীন অবস্থায় থাকলে বিপজ্জনক ও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই পৌরাণিক কাহিনিটি ইঙ্গিত দেয় যে ক্ষমতাকাঠামোর সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এর নিয়মিত, প্রণালিভিত্তিক এবং নিয়মিত সংক্রান্তি বা সংক্রমণ।
সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৌরাণিক কাহিনির এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রায়ই একটি অস্থায়ী দায়িত্ব হিসেবে নয়; বরং স্থায়ীভাবে দখল করে রাখার একটি প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা গেছে।
সামরিক ও গণতান্ত্রিক—উভয় ধাঁচের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ও কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে, রাষ্ট্রক্ষমতার ধারক–বাহকেরা অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলোকে নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছে।
নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করা বা নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে আত্তীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে অনুগত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা—এই প্রবণতাগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
সামরিক শাসনামল থেকে এ ধরনের প্রবণতা শুরু হলেও এই ধারা পরবর্তীকালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোর সময়েও বন্ধ হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।
ফলে রাষ্ট্রক্ষমতাকে নির্বাচনের দ্বারা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত একটি গণম্যান্ডেট হিসেবে নয়; বরং দীর্ঘ মেয়াদে দখলদারি কায়েম করার একটি বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর পরিণতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্রমে হ্রাস পেয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে।
নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জন–আস্থা হ্রাস পেয়েছে এবং রাজনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি দুষ্টচক্র বজায় রয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করার নানা কৌশল গ্রহণ করেছিল।
সাধারণভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলগুলো প্রায়ই কোনো না কোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিরোধী রাজনীতির পরিসরকে সংকুচিত করে তোলে। এর পরিণাম সুস্পষ্ট—রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি, সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি, যা কখনো কখনো প্রাণহানির মতো গুরুতর পরিণতিও ডেকে আনে।
এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই জুলাই অভ্যুত্থানের মতো ঘটনার উদ্ভব ঘটে।
সাংগ্রাইয়ের পৌরাণিক কাহিনি একধরনের বিকল্প নীতির ইঙ্গিত দেয়: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় ক্ষমতাকাঠামো থেকে জন্ম নেয় না; বরং তা নিশ্চিত হয় ক্ষমতার নিয়মিত সঞ্চালন ও সংক্রান্তি বা সংক্রমণের মাধ্যমে।
যে ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ও নবায়নের প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকে, সেই কাঠামোগুলোই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ঝুঁকি বা সংকট মোকাবিলায় অধিক সক্ষম হয়ে ওঠে। এর বিপরীতে, এই সংক্রমণের অনুপস্থিতিতে ক্ষমতা হয়ে পড়ে স্থবির; জমা হতে থাকে উত্তেজনা ও অসন্তোষ এবং একসময় রাজনৈতিক সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সাংগ্রাইয়ের পৌরাণিক কাহিনির শিক্ষা ও বর্ষবরণের আচার-অনুষ্ঠান এই গভীর দার্শনিক বোধকেই যেন প্রতীকী অর্থে ধারণ করে।
মিলিন্দ মারমা আদিবাসী লেখক ও অধিকারকর্মী।
ই–মেইল: milinda.marma@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব