২০২৫ সালের মে মাসে ইউক্রেনের রাজধানীতে ইউরোপের নেতারা।
২০২৫ সালের মে মাসে ইউক্রেনের রাজধানীতে ইউরোপের নেতারা।

মতামত

ইউরোপীয় নেতারা কেন ট্রাম্পকে আর ছাড় দিচ্ছেন না

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার যে প্রবণতা এখন ইউরোপের নেতাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, সেটিকে আর কোনো একক ঘটনার ফল বলা যাবে না। এটি এমন এক বৃহত্তর পরিবর্তনের ইঙ্গিত, যেখানে ইউরোপ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার আগের নির্ভরশীল ও নম্র অবস্থান থেকে সরে এসে আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিচ্ছে।

গত মাসে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস যখন ট্রাম্পের সমালোচনা করেন, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত মতামত বা বার্লিন ও হোয়াইট হাউসের মধ্যকার সাময়িক দূরত্বের প্রতিফলন ছিল না; বরং এটি ছিল ইউরোপীয় নেতৃত্বের একটি বিস্তৃত মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে তারা এখন ইরান, ইউক্রেন কিংবা ইউরোপের সার্বভৌমত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলতে প্রস্তুত।

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি বড় কারণ হলো ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত ও অস্থির নীতি। ইউরোপীয় নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের নীতির জবাবে আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো জরুরি হয়ে উঠেছে।

মের্ৎস ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেন। নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি স্কুলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ট্রাম্পের কোনো কার্যকর প্রস্থান কৌশল নেই। উল্টো ইরানের কূটনৈতিক দক্ষতা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপমানিত’ করেছে। তবে মের্ৎস একা নন; ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ইতালির জর্জিয়া মেলোনির মতো নেতারাও সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন।

এর আগে চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের চেষ্টা ইউরোপের কাছে স্পষ্টভাবে অগ্রহণযোগ্য ছিল। এটি ন্যাটোর এক মিত্র দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে গিয়েছিল এবং গ্রিনল্যান্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করেছিল। একইভাবে ট্রাম্প ও তাঁর সহকারী জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্তর আরবানকে সুবিধা দিতে চেয়েছিলেন। সে ঘটনাও ইউরোপে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

তবে এই ঘটনাগুলোই একমাত্র কারণ নয়। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে এখন একটি বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আগের তুলনায় কমে এসেছে। ইরান যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপে থাকা সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে নির্ভরতা একমুখী নয়; ইউরোপেরও গুরুত্ব রয়েছে।

একই সময়ে ইউরোপ নিজস্ব সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। সেই ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখন ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের দিকে যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইউরোপের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, তথাপি গবেষণা সংস্থা সিপ্রির হিসাবে দেখা গেছে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের অংশ ২০২১ থেকে ২০২৫ সময়ে ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগে ৬৪ শতাংশ ছিল।

এই পরিবর্তন ইউক্রেন প্রশ্নেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ইউক্রেনের অধিকাংশ অর্থ এখন আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। ইউক্রেন এখনো ন্যাটোর তালিকা অনুযায়ী অস্ত্র কিনছে। তবে তার বড় অংশই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে আসছে। প্রায় ৬০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম দেশীয়ভাবে উৎপাদিত। আর ২০ শতাংশ ইউরোপ থেকে আসছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় সরকারগুলো এখন বুঝতে পারছে, ট্রাম্পের অনেক হুমকিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, আদালত এমনকি তার নিজের রাজনৈতিক শিবিরের ভেতর থেকেও বিরোধিতা বাড়ছে। হাঙ্গেরিতে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পর ইউরোপে ‘মাগা’ আন্দোলনের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ কমেছে; বরং ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম থাকায়, তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অনেক নেতার রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে।

এই পরিবর্তিত মানসিকতা ভবিষ্যতে বাণিজ্য বিরোধেও প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্প যদি ইউরোপীয় গাড়ির মতো পণ্যে শুল্ক বাড়ান, তাহলে ইউরোপ আগের মতো নরম প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলো প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের আমেরিকান পণ্যের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে, যদিও প্রাথমিকভাবে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হবে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক এখন বদলে যাচ্ছে। ইউরোপ আর আগের মতো নতজানু নয়। তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা এখন তাদের আছে।

  • মুজতবা রহমান ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত