মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সায়রার ডেইলের বেড়িবাঁধসংলগ্ন বসতভিটা
মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সায়রার ডেইলের বেড়িবাঁধসংলগ্ন বসতভিটা

মতামত

মহেশখালীর মাতারবাড়ী: সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্নের আড়ালে ভিন্ন গল্প

তেপ্পান্ন হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সীমানাদেয়ালের পাশে আক্ষরিক অর্থেই বস্তিতে পরিণত করা মহেশখালীর মাতারবাড়ী দ্বীপের পুষ্টিহীন রোগাক্রান্ত শিশুদের নির্লিপ্ত অসহায় চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, এই মেগা প্রকল্প জনগণের অর্থের যথেচ্ছ অপচয়।

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন, মাতারবাড়ী হবে সিঙ্গাপুর, কেউ বলেছেন মালয়েশিয়া, কেউ বলেছেন সুইজারল্যান্ড। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন দেখানোর বিষয়টি বেশ উচ্চারিত হয়েছে। বলা হয়েছে, মাতারাবাড়ীর সবাই কাজ পাবেন, ভালো বেতনে কাজ পাবেন। আর লবণ চাষ করতে হবে না, চিংড়ি–কাঁকড়ার চাষ করতে হবে না, নদী-সাগরে মাছ ধরতে হবে না। ২১ ধরনের ক্ষতিপূরণের আওতায় সবাই ক্ষতিপূরণ পাবেন। মাতারবাড়ীতে গরিব থাকবে না।

এরপর মাতারবাড়ীর পশ্চিম উপকূলে গোল সূর্য বঙ্গোপসাগরের নীল জলে অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে বহুবার অস্তমিত হয়েছে। আর অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে নেমে এসেছে মাতারবাড়ীর ঘরে ঘরে।

মাতারবাড়ী সত্যিই সিঙ্গাপুর হয়ে গেছে! মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের চার লেনের মসৃণ সংযোগ সড়ক দিয়ে নতুন ব্রিজ পার হয়ে সেলফি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া পেছনে রেখে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে একটা সিঙ্গাপুরসুলভ অনুভূতি পাওয়া যায়।

কোহেলিয়া নদী ভরাট করে চার লেনের চকচকে সড়কে এক-দেড় শ মাইল গতিতে গাড়ি চালিয়ে সুইজারল্যান্ডের অনুভূতি লাভ করা যায়। কয়লা জেটির পাশের কোনো দোকানে বসে চা–কফিতে চুমুক দিতে দিতে কয়লা খালাসকারী জাহাজ বা ক্রেন দেখে হয়তো কারও কারও মনে মালয়েশিয়ার অনুভূতি খেলা করতে পারে। কিন্তু মাতারবাড়ীর এক লাখ অধিবাসীর জীবনে এগুলো অভিশাপের মতো। কারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই তাঁদের জীবনে বস্তি নেমে এসেছে, দুনিয়ার নিকৃষ্টতম বস্তি। কাজ নেই, খাবার নেই, সম্মান নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই।

ডিসেম্বর মাস, লবণ চাষের ভরা মৌসুমে মাতারবাড়ীর মানুষের কোনো কাজ নেই। শুকনা মুখে অবসরের ক্লান্তি। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের লবণ উৎপাদনকারী জনগোষ্ঠী এখন ভীষণ ব্যস্ত। লবণমাঠ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নিয়মিত পরিচর্যা, লবণ জমিতে সাগরের পানি তোলা, এক প্লট থেকে আরেক প্লটে পানি সরবরাহ, লবণ স্তূপ করা, ওজন করা, বহন করে নৌকায় বা গোডাউনে নিয়ে যাওয়া, নৌকায় করে মোকামে নেওয়াসহ হাজার রকম কাজ। নারীদেরও এ সময় অবসর থাকে না—লবণমাঠের চাষির জন্য খাবার প্রস্তুত করা, মাঠে পৌঁছে দেওয়া, চাষের উপকরণ তৈরি করা ও মেরামত করা, লবণ বহনের ঝুড়ি বোনাসহ অনেক অনেক ব্যস্ততা।

অথচ লবণের মৌসুমে একসময় বাইরে থেকে শ্রমিক আসত মাতারবাড়ীতে কাজ করার জন্য। মাতারবাড়ী হিন্দুপাড়ার রমা দাসের (ছদ্ম নাম) স্বামী বছরখানেক আগে কক্সবাজারে একটি আবাসিক হোটেলে কাজ নিয়েছেন। কারণ, এখানে কোনো কাজ নেই। রমা দাস জানালেন, তাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য এই প্রথম মাতারবাড়ীর বাইরে কাজের জন্য গিয়েছেন। বলতে বলতে লজ্জায় মুখ ঢাকলেন!

মাতারবাড়ী থেকে অভিবাসী হওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কেউ সাময়িক কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন, কেউ স্থায়ীভাবে মাতারবাড়ী ছেড়ে শহরের বস্তি, দূরের পাহাড় বা অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন, কপর্দকশূন্য শ্রম বিক্রি করতে।

মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র

কক্সবাজার জেলার অপার সুন্দর পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার একটি ছোট্ট দ্বীপ মাতারবাড়ী। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপের লক্ষাধিক অধিবাসী বঙ্গোপসাগর ও পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ, শুকনা মৌসুমে লবণ উৎপাদন, বর্ষাকালে চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি দ্বীপের ভেতরে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের চাষ তো হতোই। আর সব দ্বীপের মতোই এখানেও প্রচুর গবাদিপশু হতো। ফলে মাতারবাড়ী ছিল অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীপ এবং এখানকার অধিবাসীরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে সচ্ছল।

মাতারবাড়ী দ্বীপ ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কারণে। তৎকালীন সরকার মাতারবাড়ী দ্বীপটিকে একটি পাওয়ার (বিদ্যুৎ) হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে এই হাব গড়ে তোলা হবে। এরই অংশ হিসেবে ১২০০X২=২৪০০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ১৩২০ মেগাওয়াট কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে দুটি বৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করার জন্য প্রায় তিন হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি এই দ্বীপে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্যও বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। অবশ্য যে প্রক্রিয়ায় এসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তাকে অধিগ্রহণ না বলে জবরদখল বলাই উত্তম। এসব জমি ছিল মাতারবাড়ীর মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের জমি। পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদী ছিল মাছের আধার, জীবন-জীবিকার আরেক উৎস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পাশাপাশি অবারিত সাগরে মৎস্য আহরণ চলত ১২ মাস।

২০২১ সালে সরকার কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতিল করে দেশের আরও ১০টি পরিকল্পনাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু মাতারবাড়ী ২৪০০ মেগাওয়াটের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াটের নির্মাণকাজ চলতে থাকে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ছিল জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাইকা। নির্মাণকাজে জড়িত ছিল আরেক জাপানি প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশন।

২০১৪ সালে মাতারবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়নি। সে সময় স্থানীয় মানুষ জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলন করেছেন। নারীরা ঝাড়ু হাতে মিছিল করেছেন, ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।

প্রকল্পটির মালিকানায় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গঠিত, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। ২০২২ সালে দ্বীতিয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে জাইকা। একই সঙ্গে সুমিটোমো করপোরেশন দরপত্রে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। ফলে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট আর আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১ হাজার ৫০০ একর ভূমি পুরোটাই ব্যবহার করছে ১২০০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

২০১৪ সালে মাতারবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়নি। সে সময় স্থানীয় মানুষ জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলন করেছেন। নারীরা ঝাড়ু হাতে মিছিল করেছেন, ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।

প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ শুরু হলে এই দ্বীপের পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সব কটি (১১টি) স্লুইচগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে দ্বীপের ভেতরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের সব ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের বর্ষাকাল থেকেই দ্বীপে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। ২০১৮ সালে জলাবদ্ধতা চরম রূপ নেয়। সে সময় ১০ হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এবং পুরো দ্বীপের জনগোষ্ঠী পরোক্ষভাবে জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হন।

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই সড়কটি সাজানো হয়েছে নান্দনিকভাবে। যদিও এ সড়কের অতিরিক্ত নির্মাণব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

মাতারবাড়ী মূল সড়কটি পানির নিচে চলে যাওয়ার কারণে, মাতারবাড়ীবাসী একরকম বন্দিদশায় পর্যবসিত হন। স্থানীয় লোকজনের দাবির মুখে রাঙ্গাখালী খাল—যেটা কোহেলিয়া নদীর সঙ্গে দ্বীপের মূল পানিপ্রবাহের পথ—তার মুখে পাইপ বসিয়ে সাময়িক জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করা হয়। সুবিশাল কোহেলিয়া নদী এখন একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ এবং ওই পথে সাগরে যাওয়ার ওপর বাধা প্রদান করতে শুরু করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। নির্মাণকাজের বর্জ্যে নদী ভরাট হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে নদীর ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয় প্রকল্পের সংযোগ সড়ক।

কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবার এখন বেকার, অস্তিত্বের সংকটে জীবন্মৃত। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মানুষের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমেই মাতারবাড়ী দ্বীপের শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র পানি ব্যবস্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। যা মাতারবাড়ীর মতো দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতির টিকে থাকার প্রধান শর্ত। মাতারবাড়ীতে ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির কোনো সংকট ছিল না। স্থানীয় মানুষ বলছেন, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার পর পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।

অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে ভূমিমালিকদের কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার ভূমি অফিসে যাওয়া-আসা, রাতে থাকা, ফাইল এগোনোর জন্য নিয়মিত ঘুষ দিতে গিয়ে তাঁদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থের ৩০ শতাংশই অপচয় হয়েছে। আপত্তি মামলা থাকায়, এখনো কিছু ভূমিমালিক তাঁদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি।

প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৪০–৫০টি পরিবার তাদের পুনর্বাসনের বাড়ী পেয়েছেন উচ্ছেদ হওয়ার ছয়–সাত বছর পরে। এই পরিবারগুলোকে প্রকল্পে স্থায়ী কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তেমন কোনো কাজ পাননি। মাতারবাড়ীর মাত্র ১ হাজার ১০০ শ্রমিককে চিহ্নিত করে তাঁদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সে টাকাও তাঁরা পেয়েছিলেন প্রকল্প শুরুর পাঁচ–ছয় বছর পর।

প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলার সময়, বাইরের শ্রমিকের পাশাপাশি মাতারবাড়ীর লোকজনও এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা চাহিদার তুলনায় ছিল নগণ্য। তার চেয়ে বড় কথা, প্রকল্পে যে ধরনের কাজে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ধরনের কাজে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে, আবার তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন। ভূমি ও কাজ হারানো মাতারবাড়ীর হাজার হাজার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মাতারবাড়ীর মানুষ তাঁদের জীবন–জীবিকার মূল উৎস ভূমি হারিয়েছেন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে। মাথাগোঁজার ঠাঁই অবশিষ্ট জমিও এখন আর নিরাপদ নয়, বড় বড় কোম্পানি নানান ছলচাতুরী করে তা–ও কুক্ষিগত করছে।

মাতারবাড়ীর মানুষ ভয়ংকর বিপদে পড়েছেন। তাঁদের কোনো কাজ নেই। জীবিকার জমি হারিয়েছেন। কোহেলিয়ায় মাছ নেই, সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেন না, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে। অনেক ঘুরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার মতো বড় নৌকা তাঁদের নেই।

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৪ সাল থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। চিমনি দিয়ে অবিরাম কয়লা পোড়া ধোঁয়া নির্গত হয়। চিমনির নিচে লক্ষাধিক মানুষের জীবন অনিরাপদ রেখে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করে পৃথিবীর আর কোথাও এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ রকম কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে, জ্বালানি হিসেবে কয়লার যুগ শেষ হতে চলেছে। সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর কয়লায় চালিত মাতারবাড়ী প্রকল্পও হয়তো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রকল্পটি ইতিমধ্যে কয়লা সরবরাহ না থাকায় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একাধিকবার বন্ধ থেকেছে। চূড়ান্তভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে এই প্রকল্প মাতারবাড়ী প্রাণ-প্রকৃতি, জীবন–জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির যা ক্ষতি করার, তা করে যাবে।

পরিহাস্যকর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির কোনো মজুত না থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হয়েছে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থাকা সত্ত্বেও সেদিকে সরকারের তেমন নজর নেই।

মাতারবাড়ীর বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠছে, অনিরাপদ হয়ে উঠছে খাওয়ার পানি, মিশে যাচ্ছে কয়লা পোড়া ছাই, সিসার মতো প্রাণঘাতী ভারী ধাতু। কোহেলিয়া পাড়ের বৃদ্ধ জেলে মোহাম্মদ আলী (ছদ্ম নাম) বলেন, ‘আমরা আর বেশি দিন এই দ্বীপে থাকতে পারবে না। বাপ-মা, দাদা-দাদির স্মৃতি ফেলে রেখে অচিরেই অজানার উদ্দেশ্যে পালাতে হবে।

  • আবুল কালাম আজাদ পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী

    *মতামত লেখকের নিজস্ব