লাইলি–মজনু মঞ্চনাটকের একটি দৃশ্য
লাইলি–মজনু মঞ্চনাটকের একটি দৃশ্য

মতামত

আরব্য লোককাহিনি ‘লাইলি-মজনু’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যচর্চা

সম্প্রতি গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে। থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ প্রযোজিত সুফি সাহিত্যের চিরায়ত প্রণয়োপাখ্যান লাইলি-মজনু দেখতে। সীমিত আসনের নাটমণ্ডল কানায় কানায় পূর্ণ।

গীতিনাট্যের আদলে চলতে থাকা সেই আয়োজনে শিক্ষার্থীরা তুলে এনেছেন জীবনের পরতে পরতে জুড়ে থাকা মমতা আর সমাজবাস্তবতার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা নির্মমতাকে। শুধু অভিনয় নয়, পোশাক থেকে শুরু করে পরিকল্পনা, বাদ্যযন্ত্র থেকে শুরু করে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা, মনে হলো পরিচিত জগতের বাইরে কোথাও চলে গেছেন দর্শকেরা।

লায়লি-মজনু কাব্যের কাহিনির মূল উৎস আরবি লোকগাথা। নজদি বেদুইন কবি কায়েস ইবনে মুলাওয়া ও তাঁর প্রেমিকা লায়লা আল-আমিরিয়ার প্রেমকাহিনিনির্ভর প্রাচীন এই আরব্য লোকগাথা সারা বিশ্বে সুপরিচিত। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এটিকে সত্য বিবেচনা করা হয়। ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন একে মধ্যপ্রাচ্যের ‘রোমিও-জুলিয়েট’ বলে আখ্যায়িত করেন।

কৌতূহলবশত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে জানতে চেষ্টা করলাম, এ ধরনের আয়োজনে কী ধরনের পরিশ্রম আর খরচ হয়। এ ছাড়া আলোকসজ্জা বা সাউন্ড ইফেক্ট—এ জায়গাগুলোতে আরও ভালো কাজ করা যেত কি না? প্রযুক্তির ব্যবহার কি আরেকটু ভিন্ন মাত্রা যোগ করত কি না? যদিও নাট্যকলা বিষয়ে আমার ধারণা খুবই সীমিত, কিন্তু একজন সাধারণ দর্শকের অবস্থান থেকে উত্তরগুলো খুঁজতে চেষ্টা করছিলাম।

জানা গেল, নাটমণ্ডলে লাইট ডিজাইনের জন্য যে আলোর সোর্স বা লাইট আছে, তা খুবই অপর্যাপ্ত। বহুকালের ব্যবহৃত লেন্স কেটে যাওয়া কিংবা সেগুলোর প্রতিস্থাপন ব্যয়বহুল হওয়ায় বাইরে থেকে লাইট ভাড়া করে আনতে হয়। সেট ডিজাইনের ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী কাঠের মূল্য, সংকুচিত হয়ে আসে সৃষ্টিশীলতার জায়গা। ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে, নান্দনিকতা বিসর্জন দিয়ে, একই শিল্পীকে দিয়ে হয়তো বাজানো হয় একাধিক বাদ্যযন্ত্র।

নাটমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল, মজবুত পিলারের অবকাঠামোয় ভর করে, মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে চলে গেল মেট্রোরেল। কী জানি, হয়তো সেটির একটি পিলারের বাজেটেই অনেকটুকু মজবুত হয়ে যেতে পারে আমাদের নাট্যচর্চার ভিত্তি। কয়েক লাখ কোটি টাকার বাজেটের একটি দেশে বাজেট মূল চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা নয়, চ্যালেঞ্জ হয়তো মনোযোগের।

এ ছাড়া আধুনিক অডিটোরিয়াম সুবিধা, যেমন বিভিন্ন দিক থেকে মঞ্চ ঘোরানো, আকার পরিবর্তন করা, মানসম্পন্ন সাউন্ড সিস্টেম—সেসবও অনুপস্থিত এখানে। তিন দিনের হাউসফুল শোর টিকিট বিক্রির টাকা দিয়ে শুধু এক লাইটিংয়ের খরচ জোগাড় করাটাই মুশকিল হয়ে যায়। তার ওপর কয়েক ডজন শিল্পী, কলাকুশলীর পোশাক তৈরির খরচ তো আছেই। বলতে গেলে, এক-তৃতীয়াংশ বাজেট দিয়ে টেনেটুনে, যার আবার বড় অংশ ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত উদ্যোগে সংগ্রহ করা, এই নাটকগুলো চালাতে হয়।

বাংলাদেশে ছয়টি পাবলিক ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র নাট্যকলা বিভাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রায় প্রতি সেমিস্টারে ইউরোপিয়ান, উপমহাদেশীয়, লোকজ, প্রিকলোনিয়াল, পোস্ট কলোনিয়াল ইত্যাদি ঘরানার কোনো না কোনো নাটক নিয়ে শিখতে হয়। ক্লাসরুমে বসে পারফর্ম করা আর সত্যিকারের মঞ্চে গিয়ে পারফর্ম করার পার্থক্য অনেক। হলভর্তি দর্শকের সামনে অভিনয় করে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, সেটি শ্রেণিকক্ষে তৈরি হওয়ার কথা নয়। অথচ শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সুযোগ পায় মাত্র একবার।

বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এ রকম একটি উপস্থাপনায় দেখেছি, মঞ্চের পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে কীভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেছনের স্ক্রিনে দৃশ্য বা রং পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। বোধ করি, কিছু লাইট ও সাউন্ডের পরিবর্তনও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ঘটেছে। যেটি পুরো উপস্থাপনাকে আরও হৃদয়গ্রাহ্য করে তুলেছিল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে, প্রযুক্তির এই ব্যবহারগুলো করতেই হবে—এমন কোনো কথা হয়তো নেই, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তো এই বিষয়গুলো জানতে হবে, শিখতে হবে। আর সেই আয়োজনের যে বড় খরচ, সেটি তো রাষ্ট্র বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় আনতে হবে।

নাটমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল, মজবুত পিলারের অবকাঠামোয় ভর করে, মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে চলে গেল মেট্রোরেল। কী জানি, হয়তো সেটির একটি পিলারের বাজেটেই অনেকটুকু মজবুত হয়ে যেতে পারে আমাদের নাট্যচর্চার ভিত্তি। কয়েক লাখ কোটি টাকার বাজেটের একটি দেশে বাজেট মূল চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা নয়, চ্যালেঞ্জ হয়তো মনোযোগের।

দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যচর্চায় যদি এ পর্যায়ের প্রতিবন্ধকতা থাকে, সেখানে বলা যেতেই পারে, শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আধুনিক মানের থিয়েটার কি খুব বেশি কিছু?

  • ড. বি এম মইনুল হোসেন অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    ই–মেইল: bmmainul@du.ac.bd