
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সম্প্রতি ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যে হামলা চালিয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চালানো এই আঘাত শুধু বেসামরিক বিমান চলাচল কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ওই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
১২ অক্টোবর রয়টার্স ও আল–জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত শনিবারের হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এরপর রোববারের হামলায় আরও ১ জন মারা যান এবং ১১ জন আহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং অন্য আঞ্চলিক দেশগুলো এ ঘটনার জন্য ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। এ ঘটনা সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে এক নতুন ধরনের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সূচনা করেছে।
এ লেখার মূল বক্তব্য হলো রিয়াদের এই হামলাকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার শুরু হতে পারে। এ ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে পাল্টা আক্রমণের মাত্রা, কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংযমের ওপর। সৌদি আরব ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িত থাকা, হুতিদের আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিলে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এতে একটি স্থানীয় সংঘাত খুব সহজেই সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলতে পারছে। ৭ অক্টোবর রয়টার্স জানিয়েছিল, লোহিত সাগর উপকূলের কাছে হুতিরা এগিয়ে এলে সৌদি আরব আবারও ইয়েমেনে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। এর ফলে সৌদি শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আবারও বড় হুমকি তৈরি হয়।
নিরাপত্তার দিক থেকে তিনটি বিষয় এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সৌদি আরবের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র, বন্দর ও পরিবহনকেন্দ্র। এসব জায়গায় আঘাত এলে পুরো যাতায়াত ও বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা দেশটির বিশাল ক্ষতি করে। দ্বিতীয়ত, এ হামলার কারণে সৌদি আরবের ওপর পাল্টা হামলার চাপ বাড়বে। তারা নিজেদের জনগণকে রক্ষা করতে চায়।
শুধু রিয়াদ বিমানবন্দরে আঘাতের মধ্যেই ক্ষতির ভয় সীমাবদ্ধ নয়। তেলক্ষেত্র, শোধনাগার বা রপ্তানি রুটে হামলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যেই তেলের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
কিন্তু তারা যদি বেশি মাত্রায় প্রতিশোধ নিতে যায়, তবে হুতিরাও আরও হামলা চালাবে। এতে যুদ্ধের পরিধি বাড়বে এবং ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও গভীর হবে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১২ অক্টোবর সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর যৌথভাবে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। তারা সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, এই তিন দেশ সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। তবে এই কূটনৈতিক সমর্থনের মানেই যে সবাই সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়বে, তা নয়। গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া কিংবা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মতো কাজে সহায়তার সীমা কতটুকু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এ হামলাকে বিশ্বরাজনীতির বড় প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সৌদি আরব খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অংশীদার। বারবার হামলা হওয়ায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে, যেন তারা সৌদি আরবকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা বাড়িয়ে দেয়। এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ না করেও হুতিদের থামাতে পারবে কি না। ১১ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, মার্কিন সরকার এ বিষয়ে নিজেদের পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তা করছে।
এদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুতিদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই যে সরাসরি তেহরান নিয়ন্ত্রণ করে, তা বলা যায় না। হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কৌশল রয়েছে। ইরানের জন্য সৌদি আরবের তেলব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরে বিঘ্ন ঘটাতে পারা একটি রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে। কিন্তু এর ফলে যদি পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধ বেধে যায়, তবে ইরানকেও তার মাশুল দিতে হবে। তাই ইরান কতটুকু সাহায্য করছে, তাদের প্রভাব কতটুকু এবং হুতিরা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—এই তিন বিষয় আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।
রিয়াদ, ইসলামাবাদ, আঙ্কারা ও কায়রোর এই যৌথ পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পাকিস্তানের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। কারণ, তাদের একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে নতুন কোনো বড় যুদ্ধে জড়ানো থেকে দূরে থাকতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা, তেল আমদানির খরচ এবং নিজস্ব অর্থনীতির কথা চিন্তা করেই পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবার তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা এবং লোহিত সাগরে মিসরের স্বার্থ এই জোটকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আকাশ প্রতিরক্ষা এবং জলসীমার নিরাপত্তা বাড়বে। কিন্তু সীমা নির্ধারণ না করলে হুট করে একটি ছোট ঘটনা থেকে বড় যুদ্ধের সৃষ্টি হতে পারে।
শুধু রিয়াদ বিমানবন্দরে আঘাতের মধ্যেই ক্ষতির ভয় সীমাবদ্ধ নয়। তেলক্ষেত্র, শোধনাগার বা রপ্তানি রুটে হামলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে ইতিমধ্যেই তেলের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ড. ইসমাইল আদারামোলা বৈশ্বিক রাজনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক গবেষক ও লেখক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত