
ঢাকায় সম্প্রতি জাতীয় এসডিজি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগের এসডিজি সম্মেলনের ধারাবাহিকতা, এবারের সম্মেলনের অর্জন—এ বিষয়গুলো নিয়ে লিখেছেন এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ।
বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ জাতীয় এসডিজি সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য আর মাত্র কয়েক বছর বাকি। সম্মেলনে অর্থায়নের বিশাল ঘাটতি, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সঙ্গে এসডিজির সমন্বয় এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজনীয়তা—এ রকম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। কিন্তু এগুলো কতটা নতুন?
২০২৩ সালের অঙ্গীকার ও নাগরিক-এজেন্ডা নির্মাণের পর ২০২৬ সালের সম্মেলন কি একটি সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন কাঠামোর দিকে এগিয়েছে, নাকি পরিচিত সমস্যাগুলোকে নতুন সময়সীমা ও ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছে? এই লেখায় সম্মেলনের অর্জন, তার ২০২৩ সালের উত্তরাধিকার এবং ২০৩০ পর্যন্ত বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছি।
এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে নতুন নয়। প্রায় দুই দশক ধরে আমার গবেষণায় এমডিজি ও এসডিজির দেশভেদে অসম সাফল্য, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণের প্রকৃত প্রভাব পরীক্ষা করেছি। এই গবেষণাগুলো একটি সাধারণ শিক্ষা সামনে আনে: বৈশ্বিক লক্ষ্য মনোযোগ ও অঙ্গীকার তৈরি করতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য, সক্ষম প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নযোগ্য জাতীয় কৌশল ছাড়া লক্ষ্য নিজে ফল তৈরি করে না।
বাংলাদেশের ২০২৬ সম্মেলন কী অর্জন করল?
এই পটভূমিতে ঢাকায় সদ্য সমাপ্ত জাতীয় এসডিজি সম্মেলন (নেভিগেটিং ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাচিভিং এসডিজিস: পলিসি, পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রায়োরিটিজ) গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনে অন্তত তিনটি বাস্তব সমস্যা স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
প্রথমত, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের আনুমানিক ৪২১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এই হিসাবটি ইকোনমিক রিলেশনস ডিভিশনের হালনাগাদ ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স অ্যাসেসমেন্ট ও এসডিজি ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি থেকে এসেছে। ‘বাংলাদেশ আপডেটস ফাইন্যান্সিং রোডম্যাপ টু অ্যাডভান্স এসডিজিস’ শীর্ষক জাতিসংঘের বিবরণে অর্থসংস্থানের পাশাপাশি সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার, সমন্বিত পদক্ষেপ, উন্নত শাসন ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনও স্বীকার করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এসডিজির শেষ পর্বকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সঙ্গে সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। দক্ষতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজস্ব, সামাজিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এই দুই এজেন্ডার সুস্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে।
তৃতীয়ত, সরকারি তথ্যের নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। ভুল বা প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য নীতি প্রণয়নকে বিকৃত করে, অগ্রগতি যাচাই কঠিন করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমায়। তথ্যকে কৌশলগত জনসম্পদ হিসেবে দেখা, মাইক্রোডেটা ব্যবহারের নীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রকাশের আগাম ক্যালেন্ডার—এসব প্রস্তাব ইতিবাচক।
২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের আনুমানিক ৪২১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এই হিসাবটি এসডিজি ফাইন্যান্সিং স্ট্র্যাটেজি থেকে এসেছে।
এসডিজির প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শেখার ঘাটতি, লিঙ্গবৈষম্য, অপুষ্টি, অনিরাপদ কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি ও অসম জীবন-সম্ভাবনা—এসব সমস্যা বাস্তব এবং জরুরি।
২০২৩ থেকে ২০২৬: নতুন কী?
এই স্বীকৃতিগুলোকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। তবে ২০২৬ সালের সম্মেলন শূন্য থেকে শুরু করেনি। এটি ২০২৩ সালের সরকারি অঙ্গীকার, নাগরিক সংলাপ ও এজেন্ডা নির্মাণের ওপর দাঁড়িয়েছে। সরকারের ‘এসডিজি সামিট টুয়েন্টি টুয়েন্টি থ্রি: বাংলাদেশ কান্ট্রি কমিটমেন্টস’ নথিতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ১০৪টি পরিবীক্ষণ সূচকের মধ্যে ৬৬টি এসডিজির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। একই সময়ে নাগরিক প্ল্যাটফর্মও শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সংলাপ করেনি।
সিটিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ইন টুয়েন্টি টুয়েন্টি থ্রি: আ ইয়ার অব এজেন্ডা বিল্ডিং’ অনুযায়ী, তখন প্ল্যাটফর্মের ১৩৪টি অংশীদার সংগঠন ছিল; বিভিন্ন সংলাপ ও সম্মেলনে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ সরাসরি অংশ নেন, যাঁদের ৭০০-এর বেশি ছিলেন পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। ১১টি নীতি-সংক্ষিপ্তপত্র, ৫ হাজার ৭৫ তরুণের জরিপ, ২০টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা এবং তিন উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সামাজিক নিরীক্ষাও হয়েছিল।
অতএব, সদ্য সম্পন্ন ২০২৬ সম্মেলনের প্রধান নতুনত্বকে শুধু বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বে খোঁজা ঠিক হবে না—সেটি ২০২৩ সালেই প্ল্যাটফর্মের একটি শক্তি ছিল এবং ১৬০টির বেশি অংশীদার ও সহযোগী সংগঠনের বর্তমান নেটওয়ার্ক সেই ভিত্তিকে আরও বড় করেছে। ২০২৬-এর প্রকৃত সংযোজন হলো শেষ পাঁচ বছরের জরুরি সময়সীমা, ৪২১ বিলিয়ন ডলারের হালনাগাদ অর্থায়ন-চাহিদা, এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সমন্বয় এবং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে অগ্রাধিকারে আনা।
কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত উপকরণ ও সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে এখনো পরিষ্কার নয়, এই অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন কাঠামোয় রূপ নেবে। কোন এসডিজি বা উপ-লক্ষ্য কতটা পিছিয়ে, ২০৩০ পর্যন্ত তার বার্ষিক মাইলফলক কী, কোন প্রতিষ্ঠান দায়ী, কত অর্থ প্রয়োজন, কোন স্বাধীন তথ্য দিয়ে ফল যাচাই হবে এবং অগ্রগতি না হলে কখন ও কীভাবে পথ সংশোধন করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ম্যাট্রিকসই ২০২৩-এর ‘এজেন্ডা নির্মাণ’ থেকে ২০২৬-এর ‘বাস্তবায়ন ও ফল প্রদানে’ উত্তরণের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ হতে পারত। সম্মেলন সঠিক প্রশ্ন তুলেছে; এখন পরীক্ষা হলো, সেগুলোর উত্তর দেওয়ার প্রতিষ্ঠান ও অনুসরণব্যবস্থা তৈরি হয় কি না।
নাগরিকের কণ্ঠ থেকে প্রমাণ ও জবাবদিহি
বিশ্বব্যাপী সব রাষ্ট্র একইভাবে এসডিজির সঙ্গে যুক্ত হয় না। কোনো সরকার বৈশ্বিক লক্ষ্যকে নীতি সমন্বয়, অবহেলিত সমস্যা শনাক্ত এবং প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। অন্য ক্ষেত্রে এসডিজি আন্তর্জাতিক সংহতি ও আধুনিকতার স্বীকৃত ভাষা হয়ে ওঠে—যার মাধ্যমে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ছাড়াই অঙ্গীকার প্রদর্শন করা যায়। তখন লক্ষ্য অনুমোদিত হয়, রঙিন প্রতীক প্রদর্শিত হয়, প্রতিবেদন জমা পড়ে এবং মডেল প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়; কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা, সেবা প্রদানের সক্ষমতা ও মানুষের অভিজ্ঞতা খুব বেশি বদলায় না।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিকের ভূমিকা অপরিহার্য। গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অব হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাবিলিটিজ-এ প্রকাশিত ‘হাফ ওয়ে দেয়ার, লং ওয়ে টু গো: দ্য রোল অব পিপলস এজেন্সি ইন দ্য ফাইনাল ইয়ার্স অব দ্য সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ নিবন্ধে আমরা যুক্তি দিয়েছি, এসডিজির অবশিষ্ট সময়ে মানুষের এজেন্সি অর্থাৎ নিজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, মতপ্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করানোর ক্ষমতাকে কেন্দ্রে আনতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিষ্ক্রিয় সুবিধাভোগীদের কাছে ওপর থেকে পৌঁছে দেওয়ার কোনো প্যাকেজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন তৃণমূল অংশগ্রহণ, প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যবস্থা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং সক্ষম রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ বা ভিএনআর এই অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। জাতিসংঘের হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরামে সদস্যরাষ্ট্রগুলো ভিএনআরের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, বাধা ও শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশ ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ ২০২৫’ প্রমাণভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। কিন্তু ভিএনআর কেবল আন্তর্জাতিক সভায় প্রদর্শনের জন্য সরকারের তৈরি সুসজ্জিত প্রতিবেদন নয়; এটি নিয়মিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণভিত্তিক পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
একটি মানসম্মত ভিএনআর দেখাবে কোথায় অগ্রগতি থেমেছে বা পেছনে গেছে, কারা বাদ পড়েছে, অর্থায়ন ও প্রতিষ্ঠানের বাধা কোথায়, এবং সরকারি দাবি ও নাগরিকের অভিজ্ঞতার মধ্যে অমিল আছে কি না। নাগরিক সমাজকে প্রতিবেদন তৈরির শেষ পর্যায়ে শুধু অনুমোদন দেওয়ার জন্য ডাকা যথেষ্ট নয়। অগ্রাধিকার নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল ব্যাখ্যা এবং নীতিগত সংশোধনের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রয়োজনে স্বাধীন বা ছায়া প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগও থাকতে হবে।
এই জায়গায় সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি স্বীকার করা প্রয়োজন। সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ ১৬০টির বেশি অংশীদার ও সহযোগী সংগঠনের একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক। সম্মেলনে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ নাগরিক সমাজের বিস্তৃত অংশের উপস্থিতি ছিল। ফলে সমালোচনাটি কারা আমন্ত্রণ পেয়েছেন বা নাগরিকের কণ্ঠ একেবারেই অনুপস্থিত ছিল—এমন হওয়া উচিত নয়, বরং প্রশ্নটি এখন অংশগ্রহণের পরবর্তী ধাপ নিয়ে।
২০২৩-এর অভিজ্ঞতা দেখায়, প্ল্যাটফর্ম নাগরিকের আকাঙ্ক্ষা, বঞ্চনা ও অগ্রাধিকার দৃশ্যমান করতে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। ২০৩০ পর্যন্ত অল্প সময়ে শুধু আরও কণ্ঠ সংগ্রহ যথেষ্ট নয়; সেই কণ্ঠকে লক্ষ্যভিত্তিক তথ্য, কারণ নির্ণয়, ব্যয় ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নাগরিকের অভিজ্ঞতা তখনই নীতিগত শক্তি পায়, যখন তা সরকারি সূচককে যাচাই বা প্রশ্ন করতে পারে, নির্দিষ্ট সেবা-ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে সময়বদ্ধ সংশোধনের মুখোমুখি করে।
এখানে সংলাপ ও গবেষণা পরস্পরের বিকল্প নয়। সংলাপ বলে দেয় কোন সমস্যা মানুষের কাছে জরুরি এবং সরকারি গড়ের আড়ালে কারা বাদ পড়ছেন। পদ্ধতিগত, নিচ থেকে উঠে আসা গবেষণা যাচাই করে সমস্যার ব্যাপ্তি কত, কোন গোষ্ঠী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, কোন নীতিগত বাধা দায়ী এবং কোন হস্তক্ষেপ ফল দিচ্ছে। শেষ পাঁচ বছরে সম্মেলনের মূল্য তাই শুধু কত বৈচিত্র্যময় কণ্ঠ শোনা গেল, তা দিয়ে নয়; সেসব কণ্ঠের ভিত্তিতে কোন যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব, বাজেট ও অনুসরণব্যবস্থা তৈরি হলো, তা দিয়েও মাপতে হবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে সম্মেলনটি বাংলাদেশের পরবর্তী ভিএনআর ও ২০৩০ পর্যন্ত বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গবেষকদের সমন্বয়ে একটি প্রমাণভিত্তিক পর্যালোচনা কাঠামো প্রস্তাব করতে পারত: পিছিয়ে থাকা প্রতিটি অগ্রাধিকার সূচকে স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক তথ্য পাশাপাশি রাখা; স্বাধীন গবেষক ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী দিয়ে ফল ব্যাখ্যা করা; মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংশোধনী পদক্ষেপ, ব্যয় ও সময়সীমা প্রকাশ করা এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অগ্রগতি আবার যাচাই করা। স্বাধীন বা ছায়া প্রতিবেদন এই প্রক্রিয়ার পরিপূরক হতে পারে। এতে ঐকমত্যের প্রদর্শন হয়তো কিছুটা কম হবে, কিন্তু অংশগ্রহণ পরিণত হবে প্রমাণ, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতে।
এই তুলনা থেকে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ থেকে ২০২৬-এর মধ্যে অংশীদার নেটওয়ার্ক বড় হয়েছে, অর্থায়ন ও তথ্যের ঘাটতি আরও স্পষ্টভাবে স্বীকৃত হয়েছে এবং আলোচনা শেষ পাঁচ বছরের কৌশলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এগুলো বাস্তব অগ্রগতি। কিন্তু সম্মেলন ও প্রতিবেদন থেকে এখনো এমন কোনো প্রকাশ্য, লক্ষ্যভিত্তিক ফলাফল-শৃঙ্খল দেখা যায় না, যার মাধ্যমে নাগরিকের কণ্ঠ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেখান থেকে বাস্তবায়ন, এবং বাস্তবায়ন থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা ফল পর্যন্ত সংযোগটি নিয়মিত অনুসরণ করা যাবে। ২০২৬-পরবর্তী কাজের সবচেয়ে জরুরি ক্ষেত্র সম্ভবত এটিই।
শেষ পাঁচ বছরের পরীক্ষা
এসডিজির প্রয়োজনীয়তা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শেখার ঘাটতি, লিঙ্গবৈষম্য, অপুষ্টি, অনিরাপদ কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি ও অসম জীবন-সম্ভাবনা—এসব সমস্যা বাস্তব এবং জরুরি। কিন্তু অঙ্গীকারের গভীরতা কোন সম্মেলনের পটভূমিতে কতটি এসডিজি প্রতীক ছিল, কতজন অংশ নিয়েছেন বা কতটি প্রকল্পে এসডিজির নাম যুক্ত হয়েছে—এসব দিয়ে একা মাপা যাবে না।
২০২৩ সালের প্রধান অবদান ছিল সমস্যা, বঞ্চনা ও নাগরিক অগ্রাধিকারকে দৃশ্যমান করা। ২০২৬ সালের পরীক্ষা ভিন্ন: সেই এজেন্ডাকে এখন লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন কাঠামোয় রূপ দিতে হবে। প্রতিটি পিছিয়ে থাকা সূচকের জন্য বর্তমান অবস্থা, ২০৩০-এর লক্ষ্য, বার্ষিক মাইলফলক, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজনীয় অর্থ, তথ্যের উৎস এবং স্বাধীন যাচাইয়ের পদ্ধতি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সিটিজেনস প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন আরেক দফা সংলাপ আয়োজনের পাশাপাশি এটি নির্বাচিত এসডিজিতে নাগরিকের অভিজ্ঞতা ও সরকারি তথ্য পাশাপাশি রেখে অগ্রগতি যাচাই, বাস্তবায়ন-ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংশোধনী পদক্ষেপ অনুসরণ করতে পারে। এতে নাগরিক অংশগ্রহণ শুধু মতামত জানানোর সুযোগে সীমিত থাকবে না; তা নীতিগত জবাবদিহির স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হবে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সম্মেলনের মূল্য তার ঘোষণায় নয়, পরবর্তী পদক্ষেপে নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশ কি নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করবে, অগ্রাধিকারগুলোকে অর্থায়িত ও বাস্তবায়নযোগ্য নীতিতে রূপ দেবে, ব্যর্থতা স্বীকার করে পথ সংশোধন করবে এবং নাগরিকের কণ্ঠকে স্বাধীন প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করবে? ২০৩০ পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ে এ প্রশ্নগুলোর দৃশ্যমান উত্তরই দেখাবে—আমরা সংলাপ থেকে বাস্তবায়নে সত্যিই কতটা এগিয়েছি।
● এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব