সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা প্রশাসনিক ভবন। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া করা প্রশাসনিক ভবন। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে

মতামত

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কেমন ভিসি নিয়োগ

সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের আইনের বিধান মোতাবেক এবং রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমোদনক্রমে তাঁকে এই উচ্চপদে আসীন করা হয়েছে। অধ্যাপক জাকির হুসাইন এর আগে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক পদে কর্মরত ছিলেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। যদিও এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়। বর্তমানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আগে বাণিজ্য বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি একজন অবৈজ্ঞানিক ডিসিপ্লিন থেকে আগত। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য পদে দায়িত্ব পেয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য পদে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন নিয়ে হামেশা আমরা আলোচনা করি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের জন্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞতার তারিফ আমরা করি।

যে কারণে পৃথিবীর সব উন্নত দেশ হোক; কিংবা উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট সেই সব বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদেরই নিয়োগ করা হয়। সাধারণ জ্ঞান বা কাণ্ডজ্ঞানেও বিষয়টি সহজে বোঝা যায়, কিন্তু সেটিরই বড্ড অভাব আমাদের। যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় বিগত সময়ে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈজ্ঞানিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে লোক নিয়োগ করতে দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণ তো শুরুতেই আলোচনা করা হলো। আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, এক সময় ‘বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)’–এর চেয়ারম্যান করা হয়েছিল কৃষিতে পড়াশোনা করা একজন আমলাকে। অনেক আলোচনা–সমালোচনার মুখে পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু এ ধরনের নিয়োগের সংস্কৃতি দুঃখজনকভাবে এখনো চলমান।

বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল সার্টিফিকেট প্রদান, তবে যেকোনো বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া চলে; কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় জ্ঞান সৃজন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব প্রদান, তবে বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদগুলো সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ। তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয় যদি হয় বিশেষায়িত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, তাহলে স্বভাবত সেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ উপাচার্য ও সহ–উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু তা না করে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বাইরে গিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজকল্যাণ, বাণিজ্য, দর্শনসহ নানা কলা ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে মোটাদাগে প্রশ্ন ওঠে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত প্রতিষ্ঠিত হয় গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের জন্য। এই ক্ষেত্রে একজন উপাচার্যের কাজ কেবল রুটিনমাফিক ফাইল সই করা নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার গতিপথ নির্ধারণ করা, আন্তর্জাতিক ল্যাবগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা এবং বৈজ্ঞানিক কারিকুলাম উন্নয়ন করা। তা ছাড়া উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাধারণত ‘স্পেশালাইজড’ বা বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্বে রাখা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যেমন একজন চিকিৎসক হওয়া বাঞ্ছনীয়, তেমনি একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একজন বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী থাকলে তার পক্ষে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ (শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয়) বোঝা সহজ হয়; কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। ইসলামিক স্টাডিজ, সমাজকল্যাণ, বাণিজ্যসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামুখী বিষয়; কিন্তু একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে এ রকম একটি বিভাগের অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া যোগ্যতার প্রশ্নের থেকেও সামঞ্জস্যতার প্রশ্ন আকারে বেশি দৃশ্যমান হয়।

উচ্চমানের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা সাধারণত এমন পরিবেশে কাজ করতে পছন্দ করেন, যেখানে তাঁদের কাজের মূল্যায়ন করার মতো যোগ্য নেতৃত্ব থাকে। যখন একজন গবেষক দেখেন যে তাঁর ল্যাবরেটরির প্রয়োজনীয়তা বা গবেষণার গুরুত্ব তার প্রশাসনিক প্রধান বুঝতে পারছেন না, তখন তাঁরা হতাশ হয়ে দেশ ত্যাগ করেন। বিশ্বজুড়ে দেখা গেছে, যেসব প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা ছিলেন না, সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে মেধাবী ফ্যাকাল্টিরা দ্রুত অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেছেন। সারা বিশ্বে এসটিইএম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্স) শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসটিইএম এডুকেশনের জন্য বিশেষ লিডারশিপ স্কিল প্রয়োজন।

মানবিক বা সামাজিক বিজ্ঞানের অধ্যাপকেরা তাঁদের নিজস্ব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন; কিন্তু এসটিইএম-এর লিডারশিপ ডিএনএ সম্পূর্ণ আলাদা। এটি পরিচালনার জন্য ‘সায়েন্টিফিক টেম্পারামেন্ট’ বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নেতৃত্ব অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলো যখন বড় অঙ্কের ফান্ড দেয়, তখন তারা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের ট্র্যাক রেকর্ড দেখে। একজন বিজ্ঞানী উপাচার্য তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং গবেষণার প্রোফাইল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ফান্ড আকর্ষণ করতে পারেন, যা একজন অবৈজ্ঞানিক ব্যক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে ল্যাবরেটরি স্থাপন করা, কারিগরি জনবল নিয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম কেনাকাটার ক্ষেত্রে উপাচার্যের সরাসরি কারিগরি জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। ল্যাবরেটরির মান যাচাই বা বিশেষায়িত সফটওয়্যার ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয়তা একজন মানবিক শাখার শিক্ষকের পক্ষে অনুধাবন করা কঠিন, যা দীর্ঘ মেয়াদে অপচয় বা ভুল ক্রয়ের ঝুঁকি তৈরি করে। ।

একটি নতুন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি অবকাঠামো নির্মাণ ও বৈশ্বিক মান অর্জনে যেখানে একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানীর নেতৃত্ব প্রয়োজন ছিল, সেখানে এ ধরনের নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড ইমেজ ও আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়, বরং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ভবিষ্যতের ওপর একধরনের উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য কিংবা অন্যান্য উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলোতে সাধারণত জ্যেষ্ঠতা ও অনেকটা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে নিয়োগ হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় মেধা, অভিজ্ঞতা, উপযুক্ত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এই নিয়োগ যদি সেরকম কোনো রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে এটির নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ রকম বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এটি খুবই বাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তা ছাড়া বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য যদি হয় কেবল সার্টিফিকেট প্রদান, তবে যেকোনো বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া চলে; কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় জ্ঞান সৃজন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব প্রদান, তবে বিশেষজ্ঞ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

  • মিনহাজুল ইসলাম লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব